একদিন পত্রিকায় দেখলাম কৌশিক তাঁর নতুন ছবি শব্দর শুটিং করছেন। কৌশিক বলেছিলেন তাঁর প্রযোজক শব্দ আর নির্বাসিতর গল্প শুনে নির্বাসিতকেই বেছে নিয়েছেন। বুঝি যে সেই বেছে নেওয়াটা শেষ বেছে নেওয়া নয়। শেষ পর্যন্ত নির্বাসিতকে ছুঁড়ে ফেলে শব্দকেই নির্বাচন করেছেন প্রযোজক। গণ্ডগোলটা তাহলে আমাকে নিয়েই।
কৌশিকের কাছে আমি আর জানতে চাইনি কী ঘটেছে। মনে মনে তো জানিই কী ঘটতে পারে। মাসের পর মাস চলে গেলো। কৌশিক এক ছবি করে আরেক ছবিতে হাত দিচ্ছেন, নির্বাসিত ওদিকে কবরে, অন্ধকারে, একা। অনুমান করি, অন্য পরিচালকেরা যেমন কোনও ছবি, শেষ করা তো দূরের কথা, শুরুই করতে পারেননি। কৌশিকও পারবেন না। কৌশিকের সঙ্গে মাঝে মাঝে তাঁর অন্য ছবি টবি নিয়ে কথা হয়। নির্বাসিতর কথা তুলি না। তুলে ওকে অপ্রস্তুত করি না।
এমন সময় হঠাৎ একদিন অভিনেত্রী চূর্ণী গাঙ্গুলী, কৌশিকেরই স্ত্রী, আমাকে জানালেন নির্বাসিতটা কৌশিক নয়, উনি করবেন। চূর্ণী নতুন করে স্ক্রিপ্ট লিখছেন। প্রযোজক পেয়ে গেছেন। চূর্ণী আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন দিল্লিতে। কয়েকদিন কাটালেন আমার আর আমার বেড়ালের সঙ্গে। কলকাতায় ফিরে গিয়ে শুটিং শুরু করলেন। সবকিছুই অপ্রত্যাশিত। তবে ছবিটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি নিশ্চিত নই ছবিটা শেষ হতে আদৌ পারবে কিনা। শত সহস্র উপদ্রব ওত পেতে আছে। সে কী এতদিনেও বুঝিনি!
ছবিতে আমার জীবন সংগ্রাম, আমার ওপর রাজনৈতিক অত্যাচার, আমার লেখালেখি, আমার আদর্শ বিশ্বাস, খুব স্পষ্ট করে দেখানো হয়নি, যা হয়েছে দেখানো তা হলো আমার সঙ্গে আমার বেড়ালের বিচ্ছেদ। মায়ের সঙ্গে কন্যার বিচ্ছেদ। বেড়াল আমাকে চাইছে, আমি বেড়ালকে চাইছি। চূর্ণী এভাবেই প্রতিবাদ করেছেন আমাকে দেশ থেকে, রাজ্য থেকে বিতাড়িত করে যে অন্যায় করা হয়েছে তার। এভাবেই উনি প্রকাশ করেছেন মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে ওর মত। অন্যভাবে হলে, উচ্চকণ্ঠ হলে হয়তো ছবিটা ছাড়পত্রই পেতো না। তাই খুব বেশি ঝুঁকি না নিয়ে তৈরি করেছেন ছবি।
ছবিটি শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ হয়েছে বলে, সেন্সরবোর্ডের অনুমতি পেয়েছে বলে আমি খুশি। চূর্ণী হয়তো আশংকা করছিলেন সেন্সর বোর্ড ছবিটাকে আটকে দেবে। মমতার পুলিশ বাহিনী কলকাতার টিভি চ্যানেলে গিয়ে সিরিয়াল প্রচার বন্ধ করতে পারে, সেন্সর বোর্ডকে হুমকি দিয়ে ছবি বন্ধ করার কৌশল এখনও বোধহয় রপ্ত করেনি। আমি খুশি ছবিটি বোম্বে, গোয়া আর দিল্লির ফিল্ম ফেস্টিভেলে দেখানো হয়েছে বলে, আমি খুশি দিল্লির ফিল্ম ফেস্টিভেল থেকে ছবিটি বেস্ট ফিল্ম এর পুরস্কার পেয়েছে বলে। আমি খুশি ছবিটি কলকাতায় নির্বিঘ্নে মুক্তি পেয়েছে বলে। আমি খুশি দিল্লি বোম্বে ব্যাঙালোর পুনে এসব বড় বড় শহরে নির্বাসিত দেখানো হয়েছে বলে। বাক স্বাধীনতা লংঘনের বিরুদ্ধে সামান্য হলেও, খুব শান্তকণ্ঠে হলেও, নির্বাসিত নামের একটি প্রতিবাদ হয়েছে বলে, আমি খুশি নিষিদ্ধ একটি মানুষের কথা ছবিটিতে বলা হয়েছে বলে। বাক স্বাধীনতার পক্ষে তিন যুগ লড়ছি। নির্বাসিতর গল্প আমার গল্প না হয়ে অন্য কারো গল্প হলেও আমি একইরকম পাশে দাঁড়াতাম। একইরকম বাহবা দিতাম। নির্বাসিত সম্ভবত এ বছরের মে মাসের দিকে ভারতবর্ষে মুক্তি পাবে। এ ছবি কেউ দেখুক না দেখুক, এ ছবি ফ্লপ হোক, এ ছবি এই সময়ের মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী এক লেখকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নির্যাতনের প্রতিবাদ। মুখ বুজে থাকা আপোসকামী মানুষের ভিড়ে চূর্ণী অনেকটা দেবীর মতো। আহ দেবীতে তো আমার বিশ্বাস নেই। তবে কি সুপারহিরোর মতো? সুপারহিরোতেও তো বিশ্বাস নেই। তাহলে কী? সত্যিকার মানুষের মতো! মনে হয় মহিয়ষীর মতো।
ছিঃ!
১৭ই ফেব্রুয়ারির ‘দেশ’এ শ্ৰী বাদল বসু তাঁর ধারাবাহিক রচনা পিওন থেকে প্রকাশকএ আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়েছেন, যার প্রতিবাদ করতেই এই চিঠি। যাঁরা আমাকে চেনেন-জানেন বলে বিশ্বাস করি, তাঁরা যখন মিথ্যে বলেন আমার সম্পর্কে, তখন বিস্মিত হই, ব্যথিত হই। আমার সম্পর্কে মিথ্যে বলার লোকের অভাব নেই, সম্ভবত এই কারণে যে, আমিই একমাত্র একজন, যার দিকে ঢিল ছুড়লে, কাদা ছুড়লে, যার চরিত্র হনন করলে, জবাবদিহি করতে হয় না, সমালোচিত হতে হয় না, নিন্দা শুনতে হয় না, মামলায় ফাঁসতে হয় না, মার খেতে হয় না।
তিনি লিখেছেন, সুনীলের চিঠি পেয়ে বুদ্ধবাবু সেই ফ্ল্যাটের ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন তসলিমাকে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটটা নেয়নি তসলিমা। মিথ্যে কথা লিখেছেন বাদল বসু। আমার জন্য কোনও ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা বৃদ্ধবাবু কখনও করেননি। আর, এ কথা বাদল বসুই সবচেয়ে ভালো জানতেন। পত্রিকায় বাড়ি ভাড়ার বিজ্ঞাপন দেখে আর রাস্তায় ঘুরে ঘুরে টু লেট লেখা দেখে ফ্ল্যাট খুঁজেছি, ভাড়া নিয়েছি। বুদ্ধবাবু তখন আমার দ্বিখণ্ডিত বইটি নিষিদ্ধ করতে ব্যস্ত।
একবার শান্তিনিকেতনে দোলের দিন অনেকের সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়িতে। সেটি ছিল ১৯৯২ সাল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দোল খেলে বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ লোক সৌমিত্র মিত্র বাংলাদেশ থেকে শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব দেখতে আসা আমাদের কয়েকজনকে বললেন, সুনীলদা বলেছেন আমাদের নিয়ে যেন তিনি তাঁর বাড়িতে যান। সে কারণেই যাওয়া। বাদল। বসু লিখেছেন, আমার সারা গায়ে রং মাখা, বোঝা যায় দোল খেলেছে। সেটিই শান্তিনিকেতনে আমার প্রথম দোল। দোল খেলায় মোটেই আমি অভ্যস্ত নই। চেনা পরিচিত কেউ কেউ জোর করে আবীর মাখিয়ে দিয়েছিল। যতটুকু ঝেড়ে ফেলা সম্ভব, ফেলেছিলাম। বাদল বসু লিখেছেন আমি নাকি নেশায় চুর ছিলাম। আমি মদ্যপান করি না, মাদকদ্রব্য সেবনও করি না। নেশায় চুর থাকার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। বরং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়িতে পৌঁছে দেখলাম বাদল বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং আরও যাঁরা ছিলেন, মদ্যপান করছেন। নেশায় চুর যদি কেউ হয়ে থাকেন সেদিন, সে বাদল বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং সে বাড়িতে মদ্যপানরত লোকেরা।
