৩. আচ্ছা, বাংলাদেশের নব্বই বা নিরানব্বই ভাগ লোক তো মুসলমান। তারা তো কোরান-হাদিসে, আল্লাহ মোহাম্মদে একশ ভাগ বিশ্বাস করে। তারা নামাজ পড়ে, রোজা করে, শবেবরাত করে, শবেকদর করে, মিলাদুন্নবি করে, ইদুল ফেতর করে, ইদুল আজহা করে। ঠিক কি না? আল্লাহ নিয়ে কেউ কোনওরকম সন্দেহ প্রকাশ করলে তাকে জবাই করতে প্রায় কারওরই আপত্তি নেই, মোহাম্মদের কার্টুনিস্টদের বেঁচে থাকার অধিকার আছে বলে প্রায় কেউই মনে করে না। বোরখা আর হিজাবের হিড়িক পড়েছে। টুপিদাড়ির সংখ্যা হাউমাউ করে বাড়ছে। এই সময়, আমার একটিই জরুরি প্রশ্ন, এত কিছু আনা হচ্ছে দেশে, গার্মেন্টসের সুতো, ইংলিশ এডুকেশন, মধ্যপ্রাচ্যের টাকা– শরিয়া আইন কেন আনা হচ্ছে না। আল্লাহ বিশ্বাসী লোকদের তো আল্লাহর আইন ছাড়া অন্য কোনও আইন মানা উচিত নয়। আল্লাহ বলেই দিয়েছেন কোরানে, আল্লাহর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অক্ষর কোনও রকম প্রশ্ন, সংকোচ ও দ্বিধা ছাড়া বিশ্বাস করতে হবে।
জারি হয়ে যাক না কোরান হাদিসের আইন আই মীন শরিয়া আইন! চুরি করলে হাত কাটা যাবে। ইসলাম নিয়ে কটাক্ষ করো তো জনসমক্ষে মুণ্ডু উড়িয়ে দেওয়া হবে। স্বামী শারীরিক নির্যাতন করবে। তালাক তালাক তালাক বললেই তালাক হয়ে যাবে। স্বামী চার বিয়ে করবে। ধর্ষিতারা চাবুকের মার খাবে। প্রেম করার অপরাধে মেয়েদের পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলা হবে। এই ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা আর নির্যাতন কিন্তু শরিয়া আইনের চোখে বৈধ।
আল্লাহকে মানবো, আল্লাহর কোরান মানবো, কিন্তু আল্লাহর আইন মানবো না– এ আবার কেমন দাবি? এ ধরনের হিপোক্রেট-বান্দাদের আল্লাহ দোযখের আগুনে নিক্ষেপ করবেন।
দেশে অতি শীঘ্র শরিয়া আইন আনুন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। যে রাষ্ট্রের ধর্ম ইসলাম, যে রাষ্ট্রের মানুষ খাঁটি মুসলমান, সে রাষ্ট্রের আইন ইসলাম ছাড়া অর্থাৎ শরিয়া ছাড়া অন্য কিছু হয় না, হতে পারে না।
৪. শামিমা বেগম আর খাদিজা সুলতানা, দুজনারই ১৫ বছর বয়স, লগুন থেকে ইস্তানবুল হয়ে সিরিয়া গিয়েছে ইসলামিক স্টেট বা আইসিসে যোগ দিতে। এদের দেশ বাংলাদেশ। থাকছিল লন্ডনে। কিন্তু পাশ্চাত্যের শিক্ষা, সচেতনতা, সমতা, সমানাধিকার তাদের পছন্দ হয় না। তারা দূরের এক মরুভূমিতে ইসলামের নামে বর্বরতা চালাচ্ছে যে আইসিস নামের দল, সেই দলের প্রতি আকৃষ্ট। আইসিসের জঙ্গিরা ধরে ধরে মানুষ জবাই করছে, মানুষের মাথা লক্ষ্য করে গুলি করছে–এসব বর্বরতা মেয়েদুটোকে ভীষণই উত্তেজিত করেছে। তারা বাড়ি ঘর আত্মীয় স্বজন শহর বন্দর বন্ধু বান্ধব ছেড়ে দিয়ে আইসিসে যোগ দেওয়ার পণ করে বেরিয়ে পড়েছে। আইসিসের জঙ্গীদের কাছে যাওয়া মানে ধর্ষিতা হওয়া। জেনেবুঝেই মেয়েদুটো ধর্ষিতা হতে গেছে। জেহাদি পুরুষের যৌনইচ্ছে মেটানোই হয়তো জেহাদি নারীর কাজ। এই মেয়েদুটোকে নিয়ে কী করবে আইসিসের জঙ্গীরা, আমরা অনুমান করতে পারি। এদের ধর্ষণ করে, টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলে রাখবে। নয়তো এদের বিক্রি করে দেবে, বা এদের সেবাদাসী বানাবে।
এতে নিশ্চয়ই শামিমা বেগম বা খাদিজা সুলতানার আপত্তি নেই। নিশ্চয়ই বাংলাদেশের আরও অনেক ছেলে মেয়েই আইসিসে যোগ দিতে আগ্রহী। আইসিসের সেবা করলে তাদের বিশ্বাস, তারা আল্লাহকে খুশি করতে পারবে। আল্লাহ তাদের বেহেস্ত নসিব করবেন।
জরিপে দেখা গেছে, পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি ধর্মবিশ্বাসী। কোনও ধর্ম কি সত্যিকার অর্থে নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান আর সমানাধিকার দিয়েছে? নারীর এই ধর্মে সমর্পণটা তবে ঠিক কেন? কেবল নরক থেকে বাঁচার জন্য? বেহেসতে পুরুষকে যে আরাম আয়েশে রাখবেন আল্লাহ তায়ালা, একই আরাম আয়েশ নারীর জন্য নেই কেন? এই প্রশ্নটি নারীরা করে না, অথবা করতে ভয় পায়। পুরুষ ধর্মান্ধ হলে বা ধর্মপ্রাণ হলে মানায়। নারীকে ধর্মপ্রাণ হওয়া ঠিক মানায় না। নারীর জন্য ইহজীবন যেমন দুর্বিষহ, পরজীবনও তেমন দুর্বিষহ। এত বড় বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা কি নারী পুরুষের মধ্যে এত বড় বৈষম্য করতে পারে? আমার তো মনে হয় না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, হয় সৃষ্টিকর্তা নেই, নয় বৈষম্য নেই।
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রকে নিষিদ্ধ করার পাঁয়তারা
আমার মনে হয় আমার ওপর যা ঘটছে তা বর্ণনা করলেই অনুমান করা যায় বাক স্বাধীনতার হাল এখন কী। যেদিন বাক স্বাধীনতার পক্ষে সুপ্রীম কোর্টের রায় ঘোষিত হল, বলা হলো বাক স্বাধীনতা বিরোধী আইন ৬৬এ আইটি অ্যাক্ট এখন থেকে বাতিল, সেদিনই ঘোষণা করা হলো নির্বাসিত ছবিটিকে দেওয়া হচ্ছে সেরা বাংলা ছবির সম্মান। নির্বাসিত ছবিটি বাক স্বাধীনতা নিয়ে। বাক স্বাধীনতার জয় হলো সেদিন। ধীরে ধীরে ঘনিয়ে এলো পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের দিন। একখানা আমন্ত্রণপত্র চূর্ণী আমার জন্য ব্যবস্থা করেছিল বলেই যেতে পেরেছিলাম। সে এক অভিজ্ঞতা বটে। বিজ্ঞান ভবনের বিশাল অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠান হলো। রাষ্ট্রপতির হাত থেকেই পুরস্কার নিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক এবং কলা কুশলী। এই ছবিটি কখনও যে সত্যি সত্যি আলোর মুখ দেখবে, ভাবিনি। কয়েক বছর আগে বাংলার স্বনামধন্য চিত্রপরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলীই আমাকে বলেছিল আমার বেড়ালকে নিয়ে ও একটা কমেডি বানাতে চায়। মাঝখানে চুক্তিপত্রে সই করার পরও দেখেছি সব থেমে আছে। আমি অবাক হইনি। কারণ আমার গল্প নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি বানাতে চেয়েছে অনেকেই। চলচ্চিত্র-স্বত্ব কিনে নিয়ে যাওয়ার পরও কলকাতায় গিয়ে জানি না কোন অন্ধকারে তলিয়ে যায় সবাই। আসলে সরকার কাউকে আমার জীবন নিয়ে বা আমার লেখা কোনও গল্প নিয়ে ছবি করতে দিতে চায় না। আমার নামটা খুব ভয়ংকর। লেখকের নামের জায়গায় আমার নামটার বদলে অন্য নাম থাকলেই কোনও সমস্যা হতো না।
