সুশান্ত দুহাত জড়ো করে বললেন, আমাকে ক্ষমা করুন। আমি সেরকম লোক নই। আসলে আমি চাইছিলাম, যারা আপনাকে ভুল বোঝে, তারা আপনার মুখ থেকেই শুনুক আপনার ব্যাখ্যাটা, তাদের ভুলটা ভাঙুক।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি, দেখুন সুশান্তবাবু, ভুল বোঝাবোঝির ব্যাপার নয়। এখানে দুটো মত। এক মত হচ্ছে, নারীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস করা। আরেক মত হচ্ছে, বিশ্বাস না করা। যারা আমার কাজকে মানে না, তারা সচেতন ভাবেই মানে না। তাদের মত বদলানোর জন্য চেষ্টা করার কোনও দরকার আমার নেই। বদলালে নিজেরাই বদলাবে। আমার জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। নিজেকে ডিফেন্ড করা আমার কাজ নয়। কারণ আমি মনে করি না..
–আপনি মনে করেন না আপনি কোনও ভুল করেছেন।
–হ্যাঁ,তাই।
সুশান্ত হাতে করে এত তোড়া ফুল এনেছিলেন। ফুলগুলো টেবিলে ওভাবেই পড়েছিল। হঠাৎ উঠে বললেন, ফুলদানি কোথায় বলুন তো, ফুলগুলোকে জলে না রাখলে মরে যাবে।
সোফায় যেভাবে বসে ছিলাম আমি, সেভাবেই বসে থাকি। সুশান্ত রান্নাঘর থেকে নিজেই একটা ফুলদানি যোগাড় করে নিয়ে ওতে ফুলের তোড়া রাখলেন। ঘরের ভেতর সুশান্তর এই হাঁটাচলা আমাকে, আমি জানি না কেন, ভালো লাগা দেয়। এভাবে তো বিনয়ও হাঁটে। কিন্তু দেখতে তো এত ভালো লাগে না। সুশান্তর এই ফুল হাতে নিয়ে বাড়ি আসা, ক্ষমা চাওয়া– আমার রাগটাকে অনেকটা কমায়। সুশান্ত আর সব লোকের মতোই। তারপরও সুশান্ত একটু আলাদা। হঠাৎ বললেন, চলুন দার্জিলিং চা পান করি। করবেন তো? চা আজ আমি বানাবো? আমি মাথা নেড়ে সায় দিই। সোফায় পা উঠিয়ে চুপচাপ বসে বসে দেখি। আমি যেখানে বসে আছি, সেখান থেকে সুশান্তকে রান্নাঘরে দেখা যায়। দেখি তিনি কেটলি খুঁজছেন, চায়ের পাতা খুঁজছেন, কাপ খুঁজছেন। মনে মনে বলি, খুঁজুন। মেয়েরা তো যে কোনও রান্নাঘরে গিয়ে খুঁজে সব পেয়ে যায়। একবার ছেলেরা পাক। জন্ম থেকে তো এদের মাথাটা বিগড়ে দেয় পরিবারের লোকেরা, এরপর সমাজ বিগড়ায়। এসব কাজ নাকি মেয়েদের কাজ। এসব যে ছেলেদেরও কাজ, তা এরা মৃত্যু অবধি জানে না। মৃত্যুর পর অবশ্য জানার প্রশ্ন ওঠে না। মৃত্যুই তো সব শেষ। সুশান্তও বিশ্বাস করেন মৃত্যুর পর আর কোনও জীবন নেই। শুধু বিনয়টাই মানলো না।
অনেকদিন আমি ছবি আঁকি না। ইচ্ছে করছে, সুশান্ত আজ বসে থাকুন, ওঁকে আমি আঁকবো। মনের খাঁচায় ইচ্ছেটাকে বন্দি করে রাখি। সুশান্তর বানিয়ে আনা চা খেতে খেতে লক্ষ্য করি সুশান্ত অপলক তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। ফুলপাতাগুলোর আড়ালে তাঁর মুখটার অনেকটাই ঢাকা। কিন্তু চোখদুটো দেখা যাচ্ছে। আমিও যখন চোখদুটো দেখতে থাকলাম, সুশান্ত সরিয়ে নিলেন চোখ।
–মেয়ের নাম তো চুম্বন। তাই না?
সুশান্ত হঠাৎ প্রশ্ন করেন।
–হ্যাঁ। চুম্বন।
–এখন আছে কোথায়? নিউ ইয়র্কেই?
মাথা নাড়ি।
চুম্বন কার মতো দেখতে হয়েছে? আপনার মতো নাকি ওর বাবার মতো?
–এই প্রশ্ন কেন সুশান্তবাবু, আপনি এত কিছু জানেন আমার সম্পর্কে, আপনি নিশ্চয়ই জানেন ওর বাবা বলতে কেউ নেই। অথবা ওর বাবা কে আমি জানি না, কোনওদিন দেখিনি।
হ্যাঁ তা জানি। ইচ্ছে করে অচেনা কোনও জায়গা থেকে অচেনা লোকের স্পার্ম নিলে বাবা কে জানার তো প্রশ্ন ওঠে না। ইচ্ছে করলে জানতে পারতেন কে, কিন্তু জানতে তো চাননি।
–সবই তো জানেন। এও জানেন আমি নিজের সন্তান চেয়েছিলাম। অন্যের সন্তান নয়। চুম্বন আমার সন্তান। ওর কোনও বাবা নেই। ওর আছে শুধু মা। বাই দ্য ওয়ে, চুম্বন দেখতে আমার মতো।
–ওর ছোটবেলার ছবিগুলো দেখেছি, তখন তো পেপারে বেশ ছাপা হতো। বড় হয়ে ঠিক কেমন দেখতে হলো..
–তা দেখেননি তো! ওর এখনও বেবি ফেস। খুব একটা চেঞ্জ হয়নি।
–আপনার মতো?
–মানে?
–ওই বেবি ফেস-এর কথা বললেন তো, তাই।
এত অল্প চেনা মানুষটি আমার ত্বক ট্বক নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে, বেশ অস্বস্তি হয়।
–ওকে মিস করেন? সুশান্ত জিজ্ঞেস করেন।
–কাকে? চুম্বনকে?
–হ্যাঁ। নিশ্চয়ই করি।
সুশান্ত বেরিয়ে যান। মানুষটা ভীষণ ব্যস্ত, বুঝি। আমার আর বলা হয় না, ওঁকে যে আমার আঁকতে ইচ্ছে হয়েছিল। ইচ্ছেগুলো পুষে রাখি। ব্যস্ত মানুষ কি স্থির হয়ে বসবেন আমার ইজেলের সামনে কিছুদিন?
আমার এই ইচ্ছেগুলোর কথা বিনয় জানে না। বিনয় সকালে উঠে ইওগা করবে, স্নান করবে, পুজো করবে, ওটমিল খাবে, বেরিয়ে যাবে। ক্লিনিকে যাবে। রোগি দেখবে। দুপুরে ক্লিনিকের রেস্তোরাঁতেই লাঞ্চ সেরে নেবে। ফিরবে সন্ধ্যেয়। রাতে ঘরে বা বাইরে আমরা একসঙ্গে খাবে। আমার বিছানায় শোবে। শোওয়াটা অবশ্য ঘুম আসা পর্যন্ত। ঘুম পেলে বিনয় তার নিজের ঘরে চলে যাবে। আমিই বলেছি চলে যেতে। বিছানায়। একা না হলে আমি ঘুমোতে পারি না। গেস্টরুমকেই বিনয়ের ঘর বানিয়ে দিয়েছি। আমার চেয়ে প্রায় পনেরো বছরের ছোট। নিশ্চয়ই একদিন বিয়ে করার জন্য পাত্রী পেয়ে যাবে। আমি বিনয়কে বলে দিয়েছি, যখন ওর বিয়ে টিয়ে করে সংসার করতে ইচ্ছে করবে, যেন চলে যায়, আমি মন খারাপ করবো না, বাধাও দেবো না। পাঁচ বছর পার হয়ে গেলো, বিনয়ের যাওয়ার কোনও লক্ষণ আমি দেখি না। গত পাঁচ বছর, প্রতি রাতে ও আমার শরীর নিয়ে উন্মাদের মতো করে, এই শরীর ছাড়া, ও বলে, যে, অন্য কোনও শরীর ও চায় না। প্রতি রাতে ও দীর্ঘ দীর্ঘক্ষণ আমার পুরো শরীর সুখের জলে। ডুবিয়ে রাখে। সুখে নিজেও ডুবে থাকে। বিনয়ের সঙ্গে সম্পর্কটা এমনই। শরীরের। মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করি আমাকে ভালোবাসে কি না, বিনয় বলে, হ্যাঁ বাসে। আমাকে কখনও কিন্তু, লক্ষ করেছি, বিনয় জিজ্ঞেস করে না, আমি বাসি কিনা। ও নিশ্চয়ই ভাবে আমি বাসি না। নিশ্চয়ই ভাবে আমি শুধু সেক্সের জন্য ওকে এ বাড়িতে রেখেছি। আমি যে বিনয়কে ভালোবাসি, সামান্য হলেও বাসি, সেটা বোঝাতে পারি না। আসলে পঁচিশ বছর বয়সে ওই কাণ্ডটি ঘটানোর পর জীবনটাই বদলে গেছে। আমার সম্পর্কে আমার আর বলতে হয় না, আমার সম্পর্কে লোকে বলে। আমি কী ভাবছি কী করছি, তা আমি নই, অন্যরা ব্যাখ্যা করে। অবিবাহিত মেয়ে স্পার্ম কালেক্ট করে দুনিয়াকে জানিয়ে গর্ভবতী হয়েছে, সন্তান প্রসব করে, সগর্বে ঘোষণা করে দিয়েছে যে এ তার সন্তান, তার একার সন্তান, জানিয়েছে সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য কোনও স্বামীর প্রয়োজন হয় না, তার ইচ্ছে হয়েছে মা হওয়ার, সে হয়েছে– এ কি সহজ কথা? লোকে তখনই আমার গায়ে নারীবাদী তকমা ঝুলিয়ে দিয়েছে। নারীবাদীদের নিয়ে যে উদ্ভট কিছু ধারণা আছে মানুষের, সেসব দ্বারা আক্রান্ত হই অহরহ। যেমন আমার চেয়ে বয়সে ছোট ছেলের সঙ্গে সেক্স করছি, নারীবাদী বলেই করছি। যে কারও সঙ্গে যখন খুশি শুতে পারি, নারীবাদী বলেই পারি। কোনও পুরুষের সঙ্গে যখন বছরের পর বছর আমার কোনও সম্পর্ক ছিল না, তখন কিন্তু দুমুখগুলো বলেছে, পুরুষকে ঘৃণা করে প্রিয়াংকা, তাই কোনও পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে না। কী ভয়ংকর পুরুষবিদ্বেষী! বাচ্চা নিলো, কিন্তু বাচ্চার বাবাকে স্বীকৃতি দিলো না। নারীবাদী তো, সে কারণেই।
