বিনয়ের কাছে একদিন ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে সুশান্তর কথা পাড়ি। সুশান্ত আমার সাক্ষাৎকার নিতে চাইছেন কিন্তু আমি রাজি নই। এও বলি, সুশান্ত দেখতে ভালো, ওঁকে বলবো আমার ছবির জন্য মডেল হতে।
বিনয় জিজ্ঞেস করলো, কেন সাক্ষাৎকার চায় লোকটা?
–চায়, যে কারণে অন্যরা চায়। বোধহয় এক্সাইটিং কোনও খবর পাচ্ছে না আজকাল। তাই দুযুগ আগের ঘটনা নিয়ে পড়েছে। চুম্বন কত বড় হলো, কোথায় কী পড়ছে, এসব জানতে চাইছে। একেবারে হাঁড়ির খবর নিতে হবে এদের। এদের জ্বালায়ই তো চুম্বনকে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছি।
–ভালো ডিসিশান নিয়েছিলে।
বিনয়ের বাবা ছিলেন চুম্বনের ত্বকের ডাক্তার। ছোটবেলায় চুম্বনের ত্বকে একটা অসুখ হতো, সেই অসুখের চিকিৎসা বিনয়ের বাবাই করতেন। ধীরে ধীরে ডাক্তার পরিবারের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কই গড়ে উঠেছে, আমার বাড়িতে ওঁদের যাওয়া আসাও ছিল। বিনয়ের বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়ে হায়দারাবাদে চলে যাওয়ার পর বিনয়ের আর থাকার জায়গা ছিল না শহরে। শহরে বাড়ি ভাড়া করার ঝামেলাটা হয়নি, আমার বাড়িতেই উঠেছে সে। বাবা মা তার বিয়ের জন্য পাত্রী দেখেন, বিনয় জানিয়ে দেয়, বিয়ে সে এখন করছে না।
হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করে, লোকটার বয়স কীরকম?
–কার?
–সুশান্তর।
–ও। মনে হয় পঞ্চাশ টাশ হবে।
শুনে বিনয় চোখ কপালে তুলে বললো, ওরে বাবা, অনেক বয়স।
–হ্যাঁ অনেক বয়স।
সুশান্তর অনেক বয়স বলেই হয়তো সুশান্তকে নিয়ে আমার আগ্রহের দিকে বিনয় নজর দেয় না। আমার চেয়ে বেশি বয়সের কোনও লোকের জন্য আমার কোনওরকম আগ্রহ জন্মাতে পারে না, এ ব্যাপারে বিনয় যেন নিশ্চিত।
২.
প্রচণ্ড ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও সুশান্ত সিনহাআমাকে সময় দিচ্ছেন। আমি তাঁকে ঠিকঠিকই বসিয়ে ছবি আঁকছি। আমি ল্যান্ডস্কেপ আঁকি, পোরট্রেট খুব কম আঁকি। জানি না সুশান্তর পোরট্রেট আঁকার জন্য হাত কেন নিশপিশ করছিল। কিছু কিছু সময় এমন হয়, কী করি, কেন করি, বুঝতে পারি না। সুশান্তকে কিছুদিন কাছে পাওয়ার জন্য কী? বিনয়কে কাছে পাওয়ার জন্য তো এত আকুল হই না। বিনয়ের কিছু ন্যুড় এঁকেছিলাম। আমার আঁকা ছবিগুলো দেখতে গিয়ে সেই নডগুলোও দেখেছেন সুশান্ত। জিজ্ঞেস করেছেন, কে, বয়ফ্রেন্ড বুঝি? আমি মাথা নেড়েছি। হ্যাঁ, বয়ফ্রেণ্ড।
সুশান্তর ছবিটা ন্যুড নয়। একগাদা কাপড়চোপড় পরেই সুশান্ত বসেছিলেন। ছবিটা সাতদিনে শেষ হয়ে যায়। শেষ হওয়ার পর জিজ্ঞেস করেছেন, এ ছবি তো বিক্রি হবে না, শুধুশুধু আঁকলেন কেন?
বলেছি, আমি টাকার জন্য সব কিছু করি না। এ আমার নিজের সংগ্রহের জন্য। আপনাকে মনে রাখার জন্য। দেখা কখনও আর নাও হতে পারে আমাদের।
সুশান্ত বললেন, দেখা না হলেই বা কী! কত কত লোকের সঙ্গে কখনও হয়তো আর দেখা হবে না আপনার। আপনি কি সবার ছবি এঁকে রাখেন মনে রাখার জন্য?
–না। তা আঁকি না।
তবে আমারটা কেন আঁকলেন?
–ইচ্ছে হয়েছে তাই। সবারটা ইচ্ছে হয় না।
–ও। ভুলেই গিয়েছিলাম। আপনি তো আবার যা ইচ্ছে হয় তা করেন।
–বলুন। বলুন। বলুন নারীবাদী তো আমি, সে কারণেই যা ইচ্ছে হয় তা করি। পুরুষবাদীরাও কিন্তু যা তাদের ইচ্ছে হয়, তা করে। কিন্তু সে কথা চারদিকে কেউ এভাবে বলে বেড়ায় না।
ছবিটা দেয়ালে টাঙিয়ে রেখেছি। কোথায় সুশান্ত চেয়েছিলেন আমার সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকার দেওয়া হলো না। বরং একটি ছবি উঠলো দেয়ালে। আমারই অর্জন হয়। অন্যের বিসর্জনে। সুশান্ত বিস্মিত এবং অভিভূত, আমার মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন যখন ছবিটা আমি ড্রইং রুমের দেয়ালে টাঙাচ্ছিলাম। বিশ্বাস করতে পারছিলেন না ঘটনাটি ঘটছে।
যখন আঁকছিলাম, সুশান্ত নড়াচড়া করেননি, কিন্তু অনর্গল কথা বলেছেন। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আর বিবর্তন দিয়ে শুরু করে থেমেছেন নিজের জীবনে এসে। আমার জীবনের কিছু শুনতেও তাঁর আর বাকি নেই। আমার সব কথা জানার জন্যও হয়তো উনি মডেল হতে রাজি হয়েছেন। সাংবাদিকরা কী না পারেন! ছোট্ট কোনও নিউজ আইটেমের জন্য বরফ ঠাণ্ডা নদীও সাঁতরাতে পারেন। অবশ্য আমি তাঁর নিউজ আইটেম নই। সাক্ষাৎকার যে দেবো না তিনি জানেন। মেনেও নিয়েছেন।
বিনয়কে আমি ভালোবাসি কিনা সুশান্ত জিজ্ঞেস করেছেন। বলেছি, মাঝে মাঝে বুঝতে পারি না, কিন্তু মনে হয়, শুধু মনে হয় না, বিশ্বাসও হয় যে, ভালোবাসি।
৩.
ছবি আঁকার মাস খানিক পর হঠাৎ এক বিকেলে কলিং বেল বাজলো। সুশান্ত ঢুকলেন। হেসে বললেন, দার্জিলিং চা খেতে এলাম। বিনা নোটিশেই চলে এলাম।
চা বানিয়ে দুজন খেলাম। সুশান্ত বললেন তিনি সাংবাদিক হিসেবে আমার কাছে আসেননি। জিজ্ঞেস করেছি, তবে কী হিসেবে এসেছেন। বললেন, বন্ধু হিসেবে। কিছুক্ষণ দেশের রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে করে সুশান্ত উঠলেন। দরজার কাছে। গিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, চুম্বন মিস করেন?
চুম্বনকে মিস করি কি না? মিস তো করিই। তবে ও ভালো কলেজে পড়ছে আমেরিকায়। সেটাই শান্তি। বছরে একবার অবশ্য আমার যাওয়া হয়, তবে..
–আহ, প্রিয়াংকা, চুম্বন মিস করেন? আমি হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকি সুশান্তর দিকে। দরজার কাছে আমিও এসেছিলাম সুশান্ত যাওয়ার পর দরজা বন্ধ করবো বলে। ঠিক বুঝে পাই না সুশান্ত কী বলছেন, কেন বলছেন। কোনও কথা না বলে সুশান্ত আমার হাত ধরে কাছে টেনে আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলেন আমার ঠোঁটে, জিভে, অনেকক্ষণ। আমার সারা শরীর তিরতির করে কাঁপছিল তখন।
চূর্ণী গাঙ্গুলী
চূর্ণী গাঙ্গুলীর নির্বাসিত আমার জীবনের কোনও এক সময়ের কোনও এক ঘটনা অবলম্বনে তৈরি। চূর্ণীর প্রথম ছবি এটি। চূর্ণী মূলত অভিনেত্রী। অসাধারণ অভিনয় করেন। কৌশিক গাঙ্গুলীর ছবিতে প্রচুর করেছেন অভিনয়। এমন প্রতিভাময়ী ব্যক্তিত্ব ঠিক ঠিকই আমার ওপর একটা ছবি বানিয়ে ফেললেন, যখন অন্য অনেকে বানাচ্ছি বানাচ্ছি করেও আজ অবধি কিছুই বানাতে পারেননি। এ অবধি কম লোকতো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য অনুমতিপত্রে সই নিয়ে যান নি! কিন্তু কেউ এখনও শুরুই করতে পারেননি কোনও ছবি। না আমাকে নিয়ে, না আমার গল্প নিয়ে।
