আমরা যখন কেরোসিন বা অন্য কোনো তেল পুড়াইয়া আলো উৎপন্ন করি, তখন তেলের সকল শক্তিই আলোর আকার পায় না; ঐ শক্তির বেশির ভাগই অনাবশ্যক তাপ জন্মাইয়া নষ্ট হইয়া যায়। জোনাক পোকারা কি-রকমে তাপ উৎপন্ন না করিয়া কেবলমাত্র আলো উৎপন্ন করে, তাহা জানা গেলে আমাদের অনেক লাভ হইবে। তখন আমরা ল্যাম্প হইতে কেবল তাপহীন আলো পাইব। কাজেই আলোর সঙ্গে সঙ্গে তাপ জন্মিয়া এখন তেলের যে বাজে খরচ করে, তখন তাহা বন্ধ হইয়া যাইবে।
জোনাক পোকা কেন শরীর হইতে আলো বাহির করে, তাহা লইয়া বড় বড় পণ্ডিতদের মধ্যে অনেক তর্ক-বিতর্ক হইয়া গিয়াছে, কিন্তু আজও সকলে এ-সম্বন্ধে একমত হইতে পারেন নাই। আগুনকে ভয় করে। কেহ কেহ বলেন, আগুনের মত আলো বাহির করিয়া জোনাক পোকারা নিশাচর পাখী প্রভৃতি শত্রুদের ভয় দেখায়। শত্রুরা জোনাক পোকাকে আগুন মনে করিয়া কাছে ঘেঁসে না। আবার কেহ কেহ বলেন, জোনাক পোকার আলো শিকার ধরিবার ফাঁদ ভিন্ন আর কিছুই নয়। আলো দেখিলেই ছোট পোকা-মাকড় তাহা লক্ষ্য করিয়া ছুটিয়া আসে। ঘরের দরজা জানালা খুলিয়া আলো জ্বালিলে, কত পোকা আলোর কাছে জড় হয়, তোমরা তাহা দেখ নাই কি? জোনাক পোকার আলো যখন আগুনের মত দপ্ দপ্ করিয়া জ্বলিতে থাকে, তখন ছোট পোকারা আগুন মনে করিয়া কাছে ছুটিয়া আসে। জোনাক পোকারা এই সুযোগে গণ্ডায় গণ্ডায় ছোট পোকা ধরিয়া আহার করিয়া লয়। আবার এক দল লোক বলেন, এই সব কথার কোনোটাই ঠিক্ নয়। দিনের বেলায় জোনাক পোকারা যে যেখানে পারে দূরে দূরে লুকাইয়া থাকে এবং রাত্রিকালেই তাহারা এক সঙ্গে বাস করিবার সুযোগ পায়। তাই রাত্রি আসিলেই তাহারা শরীর হইতে আলো বাহির করিয়া সঙ্গীদিগকে কাছে আসিবার জন্য সঙ্কেত করে।
যাহা হউক, জোনাক পোকা বড়ই অদ্ভুত পতঙ্গ, ইহাদের জীবনের কাজ ও চলা-ফেরা বড়ই আশ্চর্য্যজনক।
৬.৫.০ শল্ক-পক্ষ পতঙ্গ
শল্ক-পক্ষ পতঙ্গ
(Lepidoptera)
ইহারা প্রজাপতি ও রাত্রিচর পতঙ্গ। ইহাদিগকে কেন শল্ক-পক্ষ নাম দেওয়া হইল, তাহা বোধ হয় তোমরা জান না। মাছের গায়ে যেমন শল্ক অর্থাৎ আঁইস থাকে, এই পতঙ্গের ডানায় সেই রকম খুব ছোট আঁইস বসানো থাকে। ইহা কেবল প্রজাপতি ও কতকগুলি নিশাচর পতঙ্গের ডানাতেই দেখা যায়। এই জন্যই আমরা ইহাদিগকে শল্ক-পক্ষ পতঙ্গ (Lepidoptera) বলিলাম।
এই পতঙ্গের চারিখানি করিয়া রঙিন্ ডানা থাকে এবং তাহাতেই রঙিন্ আঁইস লাগানো দেখা যায়। প্রজাপতির ডানায় তোমরা আঙ্গুল দিয়া পরীক্ষা করিয়ো, দেখিবে, সেই রঙিন্ আঁইস রঙের গুঁড়ার মত আঙুলে লাগিয়া যাইতেছে। প্রজাপতির ডানায় কত রঙের কত চিত্রই তোমরা দেখিতে পাও। রঙের গুঁড়ার মত আঁইস দিয়াই ঐ-সকল চিত্র আঁকা থাকে। এই গুঁড়াগুলিকে আঁইস বলিয়া হঠাৎ চেনা যায় না, অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখিলে সেগুলি যে আঁইস স্পষ্ট বুঝা যায়।
সাধারণ পতঙ্গদের মত ইহাদের ছয়খানা পা এবং মাথায় দুইটা করিয়া শুঁয়ো থাকে। তা’ ছাড়া দু’টা করিয়া চোখও থাকে। এই চোখ সাধারণ পতঙ্গের চোখের মত হাজার হাজার ছোট চোখ মিলাইয়া প্রস্তুত। ছয়খানা পায়ের মধ্যে সম্মুখের দুখানি পা খুব ছোট থাকে। এই জন্য তাহা দিয়া হাঁটিয়া বেড়াইবার কাজ চলে না।
এই দলের মুখের গড়ন বড় মজার। হাতীর শুঁড় আছে, তোমরা ইহাই জান। কিন্তু ইহাদেরও দুইটি চোখের মাঝে একটা শুঁড়ের মত অংশ জোড়া থাকে। এই শুঁড় দিয়াই এই পতঙ্গেরা ফুলের মধু বা ফলের রস টানিয়া খায়। যদি মধু খুব ঘন হয়, তবে তাহারা সেই শুঁড় হইতে জলের মত এক রকম তরল জিনিস ঢালিয়া তাহা পাত্লা করিয়া লয় এবং পরে সেই পাত্লা রস টানিতে সুরু করে। যখন শুঁড় ব্যবহার করার দরকার থাকে না, তখন ইহারা সেটিকে ঘড়ির স্প্রীঙের মত গুটাইয়া মুখের নীচে লুকাইয়া রাখে। এই জন্য যখন উড়িয়া বেড়ায়, তখন এই পতঙ্গদের মুখের সে লম্বা শুঁড় দেখাই যায় না।
৬.৫.১ শল্ক-পক্ষ পতঙ্গ : প্রজাপতি
প্রজাপতি
প্রজাপতির কথা তোমাদিগকে আগেই কিছু বলিয়াছি এবং তাহার ছবিও দিয়াছি। ইহারা কখনই রাত্রিতে বাহির হয় না; কেবল দিনের বেলাতেই চারিখানি সুন্দর ডানা মেলিয়া ফুলে ফুলে ঘুরিয়া বেড়ায়। ইহাদের শত্রুও বড় অল্প। যে-সকল প্রজাপতির গায়ে নানা প্রকার রঙ্চঙ্ থাকে, তাহাদিগকে পাখী বা অন্য প্রাণীতে খায় না; বোধ হয় ইহাদের মাংস মুখে ভালো লাগে না। প্রজাপতিরা বেশি দিন বাঁচে না, দুই চারি দিন মধু খাইয়া তাহারা মারা যায়।
স্ত্রী-প্রজাতিরা গাছের পাতা বা সরু ডালে ডিম পাড়ে এবং ডিম পাড়িয়াই মরিয়া যায়। এই সকল ডিম ফুটিয়া যে শুঁয়ো-পোকার মত বাচ্চা বাহির হয়, তাহারা জন্মিয়াই ডিমের খোলাগুলি খাইয়া ফেলে এবং তার পরে সেই গাছেরই পাতা খাইয়া বড় হয়। খাবার সন্ধান করিবার জন্য তাহাদিগকে এদিক্ ওদিক্ ঘুরিয়া বেড়াইতে হয় না। ইহাদের শত্রু অনেক,—পাখী টিকটিকি গিরগিটিরা প্রজাপতির বাচ্চা খাইতে বড়ই ভালবাসে। তাই অনেক প্রজাপতির বাচ্চাদেরই গায়ের রঙ্ পাতার রঙের মত সবুজ হয়। পাতার রঙের সঙ্গে ইহাদের গায়ের রঙ্ এমন মিলিয়া যায় যে, পাখীরা উহাদিগকে প্রজাপতির বাচ্চা বলিয়া চিনিতে পারে না। অনেক বাচ্চার গায়ে চুলের মত শুঁয়ো থাকে এবং তাহাদের গায়ের রঙ্ও নানা রকম হয়। গায়ে লাল কালো হল্দে রঙ্ দেখিলে বা শুঁয়ো দেখিলে পাখীরা তাহাদিগকে ধরে না।
