মাল-পোকার নাম বোধ হয় তোমরা শুনিয়াছ। ইহারা দেখিতে ঠিক্ বড় গোবরে পোকারই মত, কিন্তু ইহাদের মাথায় এক-একটা বাঁকানো শিং থাকে। গণ্ডারের মাথায় যেমন খড়্গ, ইহা যেন সেই রকমই খড়্গ। মাল-পোকা নারিকেল গাছের পরম শত্রু। নারিকেল গাছ হইতে কচি পাতা বাহির হইলে তাহার গোড়ায় গর্ত্ত করিয়া ইহারা একবারে গাছের ভিতরে আড্ডা করে এবং গাছ মারিয়া ফেলে।
৬.৪.২ কঠিন-পক্ষ পতঙ্গ : ধামসা পোকা
ধাম্সা পোকা
ধাম্সা-পোকা কঠিনপক্ষ পতঙ্গ। ইহাদের দলে ছোট বড় অনেক পোকা আছে। আমরা যাহাকে ধাম্সা-পোকা বলিতেছি, ইংরাজিতে তাহাকে Tiger Beetle অর্থাৎ বাঘা-পোকা বলে। ইহারা বাঘের মতই বটে। ইহাদিগকে অনেকে “সাপের মাসী-পিসি”ও বলে। যে দুইটা শক্ত ডানায় ধাম্সা-পোকাদের শরীর ঢাকা থাকে, তাহা প্রায়ই কালো, সবুজ বা বাদামী রঙের হয়। বাঘের গায়ে যেমন গোল গোল দাগ থাকে, ইহাদের কঠিন ডানার উপরে সেই রকম ফোঁটা ফোঁটা দাগ আছে। এই দলের অনেকের আবার এই ডানা দুটা জোড়া থাকে। তাহারা উড়িতে পারে না। অন্য পতঙ্গদের চেয়ে ইহাদের পা কয়েকখানি খুব লম্বা,—সেই লম্বা পা ফেলিয়া ধাম্সা-পোকারা ছুটিয়া বেড়ায়। চোখ দুটি চিংড়ি-মাছের চোখের মত মাথার দুই পাশে উঁচু হইয়া থাকে। ইহাদের মুখের বাঁকানো দাঁত জোড়াটি দেখিলে বাস্তবিকই ভয় হয়। ছোট পোকা-মাকড় ও ফড়িং ভিন্ন অন্য কিছু ইহারা খায় না। একটা ধাম্সা-পোকা ধরিয়া যদি গোটা কুড়ি-পঁচিশ ফড়িং তাহার সম্মুখে ধরা যায় তবে একটাও পড়িয়া থাকে না। বাঘ যেমন কুকুরের বাচ্চাকে চিবাইয়া খায়, উহারা ঠিক্ সেই রকমে ফড়িংগুলিকে কড়মড় করিয়া চিবাইয়া খাইয়া ফেলে।
জলা-জায়গায় মাটির তলায় ধাম্সা-পোকারা ডিম পাড়ে। ডিম ফুটিলে যে শুঁয়ো-পোকার আকারে বাচ্চা বাহির হয়, তাহারা গর্ত্তের বাহিরে চলা-ফেরা করে। ইহাদেরও প্রধান খাদ্য ছোট পোকা-মাকড়। এক বছর না হইলে এই পোকারা সম্পূর্ণ পতঙ্গ হয় না। কিন্তু সম্পূর্ণ আকার পাইলে ইহারা বেশি দিন বাঁচে না; মাসখানেক পোকা-মাকড় খাইয়া ও ডিম পাড়িয়া মরিয়া যায়।
গান্ধী-পোকাদের গা হইতে কি-রকম খারাপ গন্ধ বাহির হয়, তোমরা তাহা জান। ধাম্সা-পোকারা গান্ধী-পোকার জাতীয় পতঙ্গ নয়, কিন্তু তথাপি ইহারা লেজের দিক্ হইতে এক রকম গন্ধ-ওয়ালা রস বাহির করিতে পারে। বোধ হয় এই গন্ধে অন্য পোকা-মাকড় বা বড় প্রাণী ইহাদের কাছে আসিয়া অনিষ্ট করিতে পারে না।
৬.৪.৩ কঠিন-পক্ষ পতঙ্গ : জোনাক পোকা
জোনাক পোকা
জোনাক পোকা তোমরা সকলেই দেখিয়াছ। খুব শুক্নো জায়গায় ইহাদিগকে বেশি দেখা যায় না। বর্ষার শেষে জলা জায়গায় ইহারা এক-এক সময়ে গাছপালায় এত বেশি জমা হয় যে, অন্ধকার রাত্রিতে দেখিলে মনে হয়, যেন গাছে আগুন লাগিয়াছে।
জোনাক পোকার চেহারা কি-রকম, তাহা বোধ হয় তোমরা সকলে ভালো করিয়া দেখ নাই। রাত্রিতে একটা পোকা ধরিয়া গ্লাস্ বা বাটি চাপা দিয়া রাখিয়ো এবং প্রাতে তাহার চেহারাটা দেখিয়ো।
জোনাক পোকা নানা রকমের দেখা যায় এবং প্রত্যেক রকম পোকার গায়ের রঙ্ পৃথক্। হল্দে, বাদামী, লাল প্রভৃতি নানা রঙের জোনাক পোকা আছে। আকারেও এগুলির মধ্যে কেহ বড় এবং কেহ বা ছোট। আমরা যে সব জোনাক পোকাকে বাগানের গাছে বা ঘরের ভিতরে ঘুরিয়া বেড়াইতে দেখি, এখানে তাহার একটা ছবি দিলাম।
ইহাদের শরীর কতকটা লম্বা ধরণের। ছবি দেখিলেই তাহা বুঝিতে পারিবে। কঠিন-পক্ষ পতঙ্গদের শরীর যেমন হাড়ের মত শক্ত, ইহাদের দেহ কিন্তু সে-রকম নয়; দেহের আবরণ কতকটা নরম। দিনের বেলায় জোনাক পোকারা লুকাইয়া থাকে এবং সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনাইয়া আসিলে আনন্দে চারিদিকে ঘুরিয়া বেড়াইতে আরম্ভ করে। গাছের নরম পাতা, ডাল ইত্যাদিই অধিকাংশ জোনাক পোকার প্রধান খাদ্য। আবার ছোট পোকা-মাকড় ধরিয়া খায়, এমন জোনাক পোকাও আছে।
জোনাক পোকাদের আলো তোমরা নিশ্চয়ই দেখিয়াছ। ইহা বাতির আলো, উনুনের আলো বা সূর্য্যের আলোর মত নয়। এই আলোতে যেন একটু নীল রঙ্ থাকে। আমরা বাতি জ্বালিয়া যে আলো পাই, তাহা কেবলি আলো নয়, উহার সঙ্গে তাপও মিশানো থাকে। সূর্য্যের আলো ও বিদ্যুতের আলোতেও তাপ থাকে। কিন্তু জোনাক পোকারা যে আলো দেয়, তাহা কেবলি আলো, তাহাতে একটুও তাপ মিশানো থাকে না। লেজের যে-অংশটা দপ্ দপ্ করিয়া আলো দেয়, তোমরা নির্ভয়ে তাহাতে হাত দিয়া দেখিয়ো—একটুও গরম বোধ করিতে পারিবে না।
লাল দিয়াশলাইয়ের কাঠিতে এক রকম জিনিস মাখানো থাকে, তাহাকে ফস্ফরস্ বলে। ফস্ফরসের গায়ে বাতাস লাগিলেই উহা জ্বলিয়া উঠে। দেওয়ালের গায়ে লাল দিয়াশলাইয়ের কাঠি ঘসিলে দেওয়াল কি-রকম উজ্জ্বল হয়, তোমাদের মধ্যে কেহ কেহ হয় ত তাহা দেখিয়াছ। জোনাক পোকার আলো কতকটা ফস্ফরসের আলোরি মত। তফাতের মধ্যে ফস্ফরসের আলোতে তাপ থাকে, জোনাকের আলোতে মোটেই তাপ থাকে না। অনেকে বলেন, জোনাক পোকার গায়ে ফস্ফরস্ আছে, তাহাই আলো দেয়। কিন্তু এই কথাটা সম্পূর্ণ ভুল। ফস্ফরসের সঙ্গে জোনাক পোকার আলোর একটুও সম্বন্ধ নাই। তাপ না জন্মাইয়া ইহারা কি রকমে ঠাণ্ডা আলো জন্মায় তাহা আজো ঠিক করা যায় নাই। আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদ্পিণ্ডের উঠা-নামা যেমন তালে তালে চলে, জোনাক পোকার আলোও ঠিক সেই রকমে তালে তালে দপ্ দপ্ করিয়া জ্বলিতে থাকে। ইহা দেখিয়া মনে হয়, আমরা যেমন শরীরের শক্তি ক্ষয় করিয়া শ্বাস-প্রশ্বাস ও চলা-ফেরার কাজ চালাই, জোনাক পোকারা ঠিক সেই রকমেই আলো উৎপন্ন করে। কিন্তু কোন্ প্রণালীতে দেহের শক্তি দিয়া আলো উৎপন্ন হয়, তাহা আজও জানা যায় নাই।
