প্রজাপতিরা যখন গাছের ডালে বসিয়া বিশ্রাম করে, তখন তাহাদের ডানা কয়েকখানি কি-রকম থাকে, তোমরা দেখ নাই কি? মাছিরা যেমন ডানা গুটাইয়া পিঠের উপরে ফেলিয়া রাখে, প্রজাপতিরা তাহা কখনই করে না। বিশ্রামের সময়ে ডানা পিঠের উপরে উঁচু হইয়া দাঁড়াইয়া থাকে। ইহা দেখিয়া প্রজাপতিদিগকে অন্য শল্ক-পক্ষ পতঙ্গঙ্গের মধ্য হইতে চিনিয়া লওয়া যায়।
প্রজাপতির ডিম হইতে যে বাচ্চা হয়, তাহাদের দেহেও একটু বিশেষত্ব আছে। বাচ্চাদের দেহের নীচে তিন জোড়া সাধারণ পা ছাড়া, আরো দশখানা পা থাকে। এই দশখানা পায়ের আকৃতি বড় মজার। সেগুলি যেন রবারের বাটি। রবারের বাটি উপুড় করিয়া মাটিতে চাপিয়া ধরিলে তাহার ভিতরকার বাতাস বাহির হইয়া যায়, ইহাতে বাটি মাটির গায়ে জোরে আট্কাইয়া থাকে। প্রজাপতির বাচ্চারা ঐ দশখানা পা দিয়া ঠিক ঐ রকমেই গাছের ডালপালা আট্কাইতে আট্কাইতে চলা-ফেরা করে। চাপ দিলেই পায়ের তলার বাটি হইতে বাতাস বাহির হইয়া যায়, তার পরে উহা ডালপালায় আট্কাইয়া থাকে। কিন্তু এগুলি বাচ্চাদের স্থায়ী পা নয়। গাছের পাতা খাইয়া বড় হইলে পর ইহারা যখন পুত্তলি-অবস্থায় ঘুমাইতে থাকে, তখন ঐ-সকল পা লোপ পাইয়া যায়,—থাকে কেবল সম্মুখের তিন জোড়া পা। এই তিন জোড়া পায়ে ভর করিয়া সম্পূর্ণ আকারের প্রজাপতিরা ফুলের উপরে বসে।
পতঙ্গেরা পুত্তলি-অবস্থায় যখন মড়ার মত চুপ করিয়া পড়িয়া থাকে, তখন তাহাদের দেহগুলিকে কোনো রকম আবরণে ঢাকিয়া রাখে। দেহের পরিবর্ত্তন সেই ঢাকা অবস্থায় হয়। কিন্তু প্রজাপতির বাচ্চারা ঐ রকমে শরীর ঢাকিয়া রাখে না। কখনো লেজের দিক্টা ডাল বা পাতায় আট্কাইয়া ঝুলিতে ঝুলিতে ঘুমায়, কখনো বা দেহ হইতে সূতা বাহির করিয়া তাহা ডালে আট্কাইয়া ঝুলিতে থাকে। এই রকমে কয়েক দিন কাটিয়া গেলে, তাহারা গায়ের ছাল বদ্লাইয়া প্রজাপতি হইয়া দাঁড়ায়।
রাত্রির প্রজাপতি
আমরা কোন্ পতঙ্গদের রাত্রির প্রজাপতি বলিতেছি, তাহা বোধ হয় তোমরা বুঝিতে পার নাই। ইহারা প্রজাপতি নয়, কিন্তু প্রজাপতিদেরই মত ইহাদের চারিখানি ডানা থাকে এবং ডানার গায়ে রঙের গুঁড়া লাগানো থাকে—কাজেই ইহারাও শল্ক-পক্ষ পতঙ্গ। এই রকম ছোট পোকা রাত্রিতে প্রদীপের কাছে অনেক উড়িয়া বেড়ায়। ইহাদের অনেকেরই ডানার রঙ্ সাদা বা সাদার উপরে লাল বা কালোর ছিটে-ফোঁটা দেওয়া। আবার কোনো কোনোটিকে বাদামী বা মেটে রঙেরও হইতে দেখা যায়। ডানায় হাত দিলে তাহার উপরকার রঙের গুঁড়া খসিয়া হাতে লাগে। কোন্ পতঙ্গদের রাত্রির প্রজাপতি বলিতেছি, তোমরা বোধ হয় এখন তাহা বুঝিতে পারিয়াছ। ইংরাজিতে এই পোকাকে Moth বলে।
দিনের বেলায় এই পোকার দল নানা জায়গায় লুকাইয়া থাকে, রাত্রিই ইহাদের উড়িয়া বেড়াইবার সময়। বাদুড় পেঁচা যেমন নিশাচর প্রাণী, ইহারাও সেই রকম নিশাচর পতঙ্গ। দিনের বেলায় ঝোপে জঙ্গলে অবিরাম ঘুরিয়াও তোমরা এই দলের একটি পোকাও দেখিতে পাইবে না।
প্রজাপতিরা যখন পাতা বা ফুলের উপরে বসিয়া বিশ্রাম করে, তখন ডানাগুলিকে পিঠের উপরে উঁচু করিয়া রাখে। ইহা তোমাদিগকে আগেই বলিয়াছি। কিন্তু রাত্রির প্রজাপতিরা বিশ্রামের সময়ে ডানা চারিটিকে বেশ গুটাইয়া রাখিতে পারে।
প্রজাপতিদের মুখের উপরকার শুঁয়ো দুটির আকৃতি কি রকম তাহা তোমরা দেখিয়াছ কি? বোধ হয় দেখ নাই। একবার পরীক্ষা করিয়ো,—দেখিবে, শুঁয়ো আগাগোড়া এক রকম নয়। ইহার গোড়া অপেক্ষা আগাটা যেন হঠাৎ মোটা হইয়া পড়িয়াছে। কিন্তু রাত্রির প্রজাপতিদের শুঁয়ো সে-রকম নয়, ইহার আগাগোড়া প্রায় সমান মোটা, বরং আগাটাই যেন একটু সরু।
৬.৫.২ শল্ক-পক্ষ পতঙ্গ : গুটিপোকা
গুটিপোকা
তোমরা গুটিপোকা দেখিয়াছ কি? ইহাদের আকৃতি বড় প্রজাপতিদের মত। পুত্তলি-অবস্থায় দেহের চারিদিকে সূতা জড়াইয়া যে আবরণ তৈয়ার করে তাহাই রেশমের গুটি। এই গুটির সূতা লইয়া আমরা রেশমী কাপড় তৈয়ার করি। দেখিতে প্রজাপতি হইলেও গুটিপোকারা সাধারণ প্রজাপতির জাতীয় নয়। ইহারা নিশাচর প্রজাপতিদের দলের পোকা। প্রজাপতিদেরই মত ইহাদের ডানায় রঙের গুঁড়া লাগানো থাকে। ডানায় আঙুল দিলেই গুঁড়া খসিয়া যায়।
গুটিপোকার প্রজাপতিদের মুখে শুঁড় থাকে না। শুঁড়ের দরকারও হয় না। কারণ পুত্তলি-অবস্থার পর প্রজাপতি হইয়া দাঁড়াইলে, ইহারা মোটেই আহার করে না। কয়েক দিন এদিকে ওদিকে ঘুরিয়া সকলেই মরিয়া যায়। ইহারা প্রাণান্তে দিনে উড়িয়া বেড়ায় না। কাক চিল প্রভৃতি অনেক পাখীই ইহাদের পরম শত্রু।
আমাদের দেশে ছোট বড় নানা জাতীয় গুটিপোকা দেখিতে পাওয়া যায়। ইহারা সাদা হল্দে লাল্চে প্রভৃতি নানা রঙের রেশমী সূতা দিয়া গুটি বাঁধে। তসরের কাপড় তোমরা নিশ্চয়ই দেখিয়াছ, লাল্চে রেশমের সূতা দিয়া ইহা প্রস্তুত। এই সূতা এক রকম গুটিপোকা প্রস্তুত করে।
তসরের গুটিপোকা
তসরের পোকা আমাদের দেশের বনে জঙ্গলে শাল কুল প্রভৃতি গাছে জন্মে এবং সেই সকল গাছে আমড়ার আঁটির মত গুটি বাঁধে।
তসর-পোকার প্রজাপতি সাধারণত প্রজাপতির চেয়ে বোধ হয় আট-দশ গুণ বড়। ডানা মেলিয়া থাকিলে লম্বায় ও চওড়ায় ইহাদিগকে এক একটা পাখী বলিয়া মনে হয়। এই পোকারা শাল, কুল প্রভৃতি গাছে মসূর ডালের মত চেপ্টা থোকে। থোকো ডিম পাড়ে। মসূর ডালের রঙ্ লাল, গুটি পোকার ডিম সাদা। যাহাতে বাতাসে পাতা হইতে পড়িয়া না যায়, সেই জন্য ডিমের গায়ে এক রকম আঠা লাগানো থাকে। ইহা শুকাইয়া শক্ত হইলে পাতায় আট্কাইয়া যায়। এক-একটি পোকা প্রায় দুইশত ডিম পাড়িতে পারে।
