বড় ও মাঝারি গোবরে পোকাকে কিন্তু ঐ-রকমে গোবর পুঁতিয়া রাখিতে দেখা যায় না। তাহারা মাথা ও সম্মুখের পা দু’খানা দিয়া গোবরের ছোট তাল পাকায় এবং তার পরে পিছনের চারিখানি লম্বা পা দিয়া ঠেলিতে ঠেলিতে সেগুলিকে মাটির তলাকার বাসায় জমা করে।
তোমরা হয় ত পাড়াগাঁয়ের পথে ঘাটে গোবরে পোকাদিগকে ঐ-রকমে গোবরের গুলি লইয়া যাইতে দেখিয়াছ। বাঁটুলের মত গোবরের দলাকে ইহারা এমন উৎসাহের সঙ্গে গড়াইয়া লইয়া যায় যে, দেখিলে অবাক্ হইতে হয়। পথ উঁচু-নীচু হইলেও তাহারা ছাড়ে না; যে-রকমে হউক গোবরের দলাগুলিকে বাসায় আনিয়া হাজির করে। উঁচু পথ দিয়া যাইতে হইলে গোবরের গোলা প্রায়ই গড়াইয়া বার বার নীচে পড়িয়া যায়। কিন্তু ইহাতে পোকারা একটুও বিরক্ত হয় না। খুব ধৈর্য্যের সঙ্গে পাঁচ-ছয় বার, কখনো আট-দশ বার পর্য্যন্ত সেগুলিকে নীচু জমি হইতে সমতল জায়গায় উঠাইবার চেষ্টা করে।
কোনো মূল্যবান্ জিনিস বা টাকাকড়ি নির্জ্জন পথের মধ্য দিয়া লইয়া যাইবার সময়ে, চোর-ডাকাতের হাতে পড়িতে হয়। ডাকাতেরা ঐ সকল মূল্যবান্ জিনিস কাড়িয়া পলাইয়া যায়। গোবরের গোলা গোবরে পোকাদের অতি আদরের দ্রব্য। ইহারা যখন গোবরের গোলা গড়াইতে গড়াইতে বাসায় লইয়া যায়, তখন তাহাদের উপরে প্রায়ই ডাকাতি হয়। হঠাৎ একটি নূতন গোবরে পোকা আসিয়া গোলার উপরে চাপিয়া বসে এবং মালিককে তাড়াইয়া গোলাটিকে নিজের দখলে আনিতে চায়। কিন্তু মালিক নিজের সম্পত্তি ছাড়িতে চায় না। কাজেই দুই পোকায় খুব ঝগড়া-ঝাঁটি ও মারামারি হয়। ইহাতে যে জিতে, সে গোবরের গোলা লইয়া পলাইয়া যায়।
কখনো কখনো একটি গোলাতে দুইটি পোকা দেখিলে হঠাৎ মনে হয়, যেন দুইটির মধ্যে খুব বন্ধুত্ব আছে, তাই বুঝি দুটিতে মিলিয়া গোলা বাসায় লইয়া যাইতেছে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার তাহা নয়। এই রকম দুইটি পোকার মধ্যে একটি ডাকাত পোকা থাকে। সে গোলা ঠেলিয়া লইয়া যাইতে যাইতে অন্য পোকাটিকে ফাঁকি দিবার জন্যই কেবল সুবিধা খোঁজ করে। নিরীহ পোকাটি যে-ই একটু অন্যমনস্ক হয়, অমনি ডাকাত পোকা গোলাটিকে ঠেলিয়া নিজের গর্ত্তের দিকে ছুট দেয়। ডাকাতের এই অত্যাচারে ভালোমানুষ পোকাটি খুবই আপত্তি করে এবং কখনো কখনো লড়াই বাধায়, কিন্তু ডাকাতের হাত হইতে সম্পত্তি রক্ষা পায় না। অগত্যা হতাশ হইয়া সে আবার নূতন গোবরের সন্ধানে বাহির হইয়া পড়ে।
গোবরের গোলা কোনো গতিকে বাসায় পৌঁছিলে, গোবরে পোকাদের খুব আনন্দ হয়। তখন তাড়াতাড়ি মাটি দিয়া গর্ত্তের মুখ বন্ধ করিয়া তাহারা সেই উপাদেয় সামগ্রী খাইতে লাগিয়া যায়। একবার খাওয়া আরম্ভ করিলে, তাহাদের আর জ্ঞান থাকে না। যতক্ষণ এক কণা গোবর বাকি থাকে, ততক্ষণ পর্য্যন্ত খাওয়া চলে। এই রকমে দশ বারো ঘন্টায় এক-একটি সাধারণ পোকা একটি বড় গোবরের গোলা খাইয়া ফেলিতে পারে। তোমার শরীরের ওজন কত জানি না। হয় ত পঁয়ত্রিশ সের, না হয় এক মণ। তুমি একদিনে নিজের ওজনের সমান খাবার খাইতে পার কি? কখনই পার না। হয় ত আধ সের ওজনের খাবার খাইলেই তোমার পেট ভরিয়া যায়। গোবরে পোকারা নিজের দেহের ওজনের সমান গোবর বারো ঘণ্টার মধ্যে খাইয়া শেষ করিতে পারে। একবার ভাবিয়া দেখ, ইহারা কত পেটুক এবং ইহাদের হজম করিবার শক্তিই বা কত!
ডিম পাড়িবার সময় হইলে বড় বড় স্ত্রী-গোবরে পোকা যে-সব গোলা গর্ত্তে লইয়া যায়, তাহা খায় না। ভাঙিয়া চুরিয়া সেগুলিকে বড় এবং লম্বা করে। লাউয়ের আকৃতি যেমন বোঁটার দিকে সরু ও তলার দিকে চওড়া হয়, স্ত্রী-পোকারা গোবরের গোলা ভাঙিয়া ঠিক সেই রকম আকারে গড়িয়া তোলে। ডিম পাড়িবার সময় হইলে উহারা এ-সকল গোবরের তালের সরু দিক্টায় ডিম পাড়িয়া রাখে।
বর্ষাকালে যে বড় বড় গোবরে পোকা উড়িয়া প্রদীপের আলোর কাছে আসে, তাহাদের ডিম শীঘ্র ফুটিয়া যায় এবং তাহা হইতে শুঁয়ো-পোকার আকারে ছোট বাচ্চা বাহির হয়। খাবারের গাদার মধ্যে ইহাদের জন্ম। কাজেই খাবারের অভাব হয় না। প্রায় এক মাস ধরিয়া বাচ্চারা অবিরাম আহার করে এবং শীঘ্রই বেশ মোটা হইয়া দাঁড়ায়। গোবরের পচা সার বা পচা খড়ের গাদা খুঁড়িতে গেলে সেখানে প্রায়ই সাদা রঙের মোটা শুঁয়ো-পোকা দেখা যায়। সেইগুলিই বড় গোবরে পোকার বাচ্চা।
এই দলের সকল পোকাকেই গোবরে পোকা নাম দিয়াছি। কিন্তু তাই বলিয়া ইহাদের সকলেই যে গোবর বা ময়লা জিনিস খাইয়া বাঁচে ইহা মনে করিয়ো না। অনেক গোবরে পোকা ভয়ানক মাংসভক্ত। মাঠে-ঘাটে ইঁদুর, পাখী বা অন্য কোনো ছোট জানোয়ার মরিয়া পড়িয়া থাকিলে, নানা রকম গোবরে পোকা মরা জন্তুদের কাছে আসে এবং পা ও মাথা দিয়া চারি পাশের মাটি খুঁড়িয়া সমস্ত জন্তুটাকে মাটি চাপা দেয়। তার পরে যেমন দরকার হয় তেমনি তাহারা সেই মরা জন্তুর পচা মাংস খাইতে আরম্ভ করে।
খুব বিশ্রী প্রাণী হইলেও গোবরে পোকারা মানুষের খুব উপকার করে। ইহারা গোবর ইত্যাদি ময়লা তাড়াতাড়ি মাটির তলায় পুঁতিয়া না ফেলিলে, আমাদের রাস্তা ঘাট এই সব নোংরা জিনিসে নিশ্চয়ই অস্বাস্থ্যকর হইয়া দাঁড়াইত। চীন দেশের কাছে হাওয়াই দ্বীপে এক সময়ে গোবরে পোকা ছিল না। গোরু ঘোড়া ও মানুষের ময়লা পথে ঘাটে পড়িয়া পচিত এবং তাহাতে অসংখ্য মাছি জন্মিয়া ভয়ানক উৎপাত করিত। এই সকল ময়লা পরিষ্কার করিবার অন্য উপায় না পাইয়া, সেই দ্বীপে নানা জাতীয় গোবরে পোকা ছাড়িয়া দেওয়া হইয়াছিল। এখন সেই পোকায় হাওয়াই দ্বীপ ছাইয়া পড়িয়াছে। আগেকার মত এখন সেখানকার পথে-ঘাটে গোবর ইত্যাদি পচিতে পায় না এবং তাহাতে মাছি জন্মিয়া উৎপাতও করে না।
