ভুঁই-কুমীরের বাচ্চারা পিঁপ্ড়ে বা অপর শিকারগুলিকে চিবাইয়া খায় না; দাঁত দিয়া ধরিয়া শরীরের সার অংশটা শুষিয়া লয় এবং খোলাটি ফেলিয়া দেয়।
যাহারা ফাঁদ পাতিয়া শিকার করে, তাহাদের অদৃষ্টে সকল দিন শিকার জুটে না। ভুঁই-কুমীরদের অদৃষ্টে প্রায়ই তাহা ঘটে; শিকার না পাইলে তাহাদিগকে উপবাসী থাকিতে হয়। সপ্তাহে প্রায়ই দুই-তিন দিন ইহারা কিছু না খাইয়া কাটায়। অন্য পতঙ্গদের বাচ্চার মত ইহারা পেটুক নয়, তাই এত অল্প খাইলেও ইহাদের কোনো ক্ষতি হয় না।
৬.৩.৪ শিরা-পক্ষ পতঙ্গ : পাখীর গায়ের উকুন
পাখীর গায়ের উকুন
তোমাদের মধ্যে যদি কেহ পাখী পুযিয়া থাক, তাহা হইলে নিশ্চয়ই দেখিয়াছ, পাখীরা এক রকম উকুনের উৎপাতে অস্থির হয়। কেবল পোষা পাখী নয়,—সকল পাখীর গায়েই এই উকুন দেখা যায়। উকুন তাড়াইবার জন্য পাখীরা ধূলা গায়ে মাখে; কখনো কখনো আবার জলে স্নান করে। পোষা পাখীর গায়ের উকুন মারিবার জন্য আমরা পাখীকে রসুন খাওয়াই এবং হলুদ দিয়া স্নান করাই।
পাখীর গায়ের উকুন এবং আমাদের মাথার উকুন এক রকমের পতঙ্গ নয়। সাধারণ উকুন আমাদের মাথার রক্ত শুষিয়া খায়। পাখীদের উকুন দাঁত দিয়া গা কাটিয়া আহার করে, ইহাতে গায়ে ঘা হয়। গায়ের পালকের মধ্যে আশ্রয় না লইলে ইহারা বাঁচে না। এইজন্য পাখী মরিয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে উকুনগুলাও মারা যায়।
এই উকুনেরা উইদের মত প্রাণী, কিন্তু ইহাদের ডানা থাকে না; এক জায়গা হইতে অন্য জায়গা যাইবার ক্ষমতা নাই। গায়ের পালকের উপরে তাহারা ছোট ছোট ডিম পাড়ে। পাখীর গায়ের গরমে সেই ডিম ফুটিয়া বাচ্চা বাহির হয়।
তোমাদের পোষা পাখীর গায়ে যদি এই রকম উকুন হয়, তবে অল্প পরিমাণে নারিকেল তেল তাহার পালক ও গায়ে মাখাইয়া দিয়ো। উকুন পতঙ্গজাতীয় প্রাণী। ইহাদের গায়ে নিশ্বাস টানিবার ছিদ্র আছে। তেলে সেই সকল ছিদ্র বন্ধ হইয়া গেলে উকুনরা নিশ্বাস ফেলিতে না পারিয়া মারা যায়।
৬.৪.০ কঠিন-পক্ষ পতঙ্গ
কঠিন-পক্ষ পতঙ্গ
(Coloeptera)
এই দলে এত নানা রকম পতঙ্গ আছে যে, তাহার হিসাব করাই কঠিন। গোবরে-পোকার মত বড় পতঙ্গ হইতে আরম্ভ করিয়া উকুন ও ঘুণের মত ছোট পোকা পর্য্যন্ত সকলেই এই দলে আছে। ইহাদের শরীর কি রকম, তাহা আগেই তোমাদিগকে বলিয়াছি। এই পতঙ্গদের প্রায় সকলেরই চারিখানি করিয়া ডানা থাকে। উপরকার দুখানা ডানা হাড়ের মত শক্ত। তার নীচেই দুখানা পাত্লা ডানা থাকে। উপরকার শক্ত ডানা উড়িবার কাজে লাগে না। ইহা নীচের পাত্লা ডানা এবং শরীরটাকে ঢাকিয়া রাখে।
সাধারণ পতঙ্গদের মতই ইহাদের ডিম হইতে শুঁয়ো-পোকার আকারে বাচ্চা হয় এবং তাহাই পুত্তলি-অবস্থায় থাকিয়া ডানাওয়ালা সম্পূর্ণ পতঙ্গ হইয়া দাঁড়ায়। ইহাদের সকলেই ডাঙায় বাস করে না। কয়েক জাতি কঠিন-পক্ষ পতঙ্গ জলের মধ্যে থাকিয়া বড় হয় এবং মাঝে মাঝে জল হইতে উঠিয়া ডাঙায় চলা-ফেরা করে।
এই পতঙ্গদের ডিম হইতে যে শুঁয়ো-পোকার আকারের বাচ্চা হয়, তাহাদের গায়ে প্রায়ই শুঁয়ো হয় না।
৬.৪.১ কঠিন-পক্ষ পতঙ্গ : গোবরে পোকা
গোবরে পোকা
গোবরে পোকার দল কঠিন-পক্ষ পতঙ্গদের মধ্যে প্রধান। আমাদের দেশে এই জাতের পোকা যে কত রকম আছে তাহার হিসাব হয় না। ইহাদের শরীর জল-ফড়িং প্রভৃতির মত লম্বা হয় না। গোলাকার গোবরে পোকাই বেশি দেখা যায়। ইহাদের মাথার উপরটা হাড়ের মত শক্ত এবং ধারালো আবরণে ঢাকা থাকে। আমরা যেমন খুরপি বা নিড়ানি দিয়া মাটি খুঁড়ি, উহাদের মধ্যে অনেকেই মাথার উপরকার সেই ধারালো আবরণ দিয়া সেই রকমে মাটি কাটিতে পারে।
মাথা, বুক ও লেজ লইয়াই পতঙ্গদের দেহ। গোবরে পোকার শরীরে এই তিনটা ভাগ বেশ স্পষ্ট দেখিতে পাওয়া যায়। লেজটা তাহাদের শক্ত ডানার আবরণে প্রায় সম্পূর্ণ ঢাকা থাকে। তা ছাড়া যে দুখানা পাত্লা ডানায় ভর দিয়া তাহারা রাত্রিতে ভোঁ-ভোঁ করিয়া উড়িয়া বেড়ায়, তাহা ঐ কঠিন ডানা দুখানিরই তলায় লুকানো থাকে। এই রকমে গোবরে পোকার মাথা, বুক ও লেজ সকলি কঠিন আবরণে ঢাকা দেখা যায়। এইজন্যই যখন প্রদীপের কাছে আসিয়া ভয়ানক উৎপাত করে, তখন বিশেষ আঘাত না দিলে ইহারা মরে না।
গোবরে পোকার পা কয়েকটি সাধারণ পতঙ্গদের পায়ের মত দুর্ব্বল নয়। কেবল পায়ে ঠেলিয়া ইহারা গোবরের বড় বড় গোলা কি-রকমে বাসার দিকে লইয়া যায় তাহা তোমরা নিশ্চয়ই দেখিয়াছ। পায়ে বিলক্ষণ জোর না থাকিলে এই রকমে গোবরের গোলা ঠেলিয়া লওয়া তাহাদের পক্ষে অসাধ্য হইত। পরপৃষ্ঠায় একটি গোবরে পোকার ছবি দিলাম। ইহার মাথা বুক এবং লেজ কেমন শক্ত আবরণে ঢাকা থাকে, ছবি দেখিলেই তোমরা তাহা বুঝিবে।
গোবরে পোকাদের অনেকেরই জীবনের কথা প্রায় এক রকম। কোনো জায়গায় গোবর বা অপর ময়লা জিনিস পড়িয়া থাকিলে দুই-এক ঘন্টার মধ্যে ছোট বড় ও মাঝারি আনেক পোকা সেখানে হাজির হয়। ছোট পোকারা প্রথমে সেই ময়লা জিনিস পেট ভরিয়া খায়; একটুও ঘৃণা করে না। পরে মাথায় লাগানো সেই খুরপির মত অস্ত্র দিয়া সেই সব ময়লার নীচে গর্ত্ত করে। শেষে সেগুলি গর্ত্তের ভিতরে বোঝাই দেয়। এই রকমে খাবার সংগ্রহ হইলে, পোকারা গর্ত্ত ছাড়িয়া পলায় না; সেখানে লুকাইয়া ধীরে ধীরে খাবার খাইয়া ফেলে। যে-সকল পোকার ডিম পাড়িবার সময় আসে, তাহারা কিন্তু ঐ রকমে গোবর বা ময়লা খায় না। তাহারা ঐ-সকল খাবার জিনিসের মধ্যে ডিম পাড়িয়া চলিয়া যায়। ইহা হইতে যে-সকল বাচ্চা হয়, তাহারাই ঐ খাবার খাইয়া বড় হয়।
