কাক, শালিক প্রভৃতি পাখীরা যখন উড়িতে উড়িতে বামে, ডাহিনে বা পিছনে যাইতে চায়, তখন আগে মুখটাকে সেই দিকে ফিরায়, তার পরে সেই দিক্ লক্ষ্য করিয়া উড়িয়া চলে। জল-ফড়িং বামে বা ডাইনে যাইবার সময়ে সেই দিকে মুখ ফিরাইয়া উড়ে না,—অনায়াসে পাশা-পাশি উড়িয়া বেড়াইতে পারে। হাল ঘুরাইয়া যেমন নৌকাকে যে-দিকে খুসি চালানো যায়, লম্বা লেজে মোচড় দিয়া উহারা সেই রকমে যে-দিকে-ইচ্ছা যাওয়া-আসা করে।
জল-ফড়িঙের জীবনের কথা বড়ই অদ্ভুত। বাচ্চা অবস্থায় ইহারা খাল, বিল বা পুষ্করিণীর জলে বাস করে, তার পরে ডানাযুক্ত সম্পূর্ণ পতঙ্গ হইয়া দাঁড়াইলে জল ছাড়িয়া আকাশে উড়িয়া বেড়ায়। স্ত্রী-জল-ফড়িং কখনই ডাঙায় ডিম পাড়ে না। প্রসবের সময় হইলে ধীরে ধীরে উড়িয়া পুকুরের ধারে যায় এবং জলে পোঁতা কোনো বাঁশ বা কাঠ বাহিয়া জলে ডুব দেয়। তার পরে জলের তলায় শেওলার গায়ে বা কাদার মধ্যে ডিম পাড়িয়া আবার উপরে উঠিয়া আসে। কখনো কখনো আবার জলের উপরকার লতা-পাতায় বসিয়াই ইহারা ডিম পাড়ে এবং ডিমগুলি আপনা হইতেই জলে পড়িয়া ডুবিয়া যায়।
যাহা হউক, জলে ডিম পাড়ার পর জল-ফড়িং আর ডিমের খবর লয় না। সেগুলি জলের তলায় থাকিয়া আপনা হইতেই ফুটিয়া যায় এবং প্রত্যেক ডিম হইতে একএকটা বাচ্চা বাহির হয়। বাচ্চারা ছয়খানা পা এবং এক কিম্ভুতকিমাকার মুখ লইয়া জন্মে। মুখের নীচেকার ওষ্ঠখানি এত লম্বা থাকে যে, দেখিলেই মনে হয়, যেন সেটা একখানি প্রকাণ্ড হাত। এই ওষ্ঠ সাধারণ অবস্থায় মাথার নীচে গুটানো থাকে। কাছে ছোটখাটো জলের পোকা বা মাছ দেখিলেই উহারা সেই ওষ্ঠ বাড়াইয়া শিকারগুলি ধরিয়া খাইতে আরম্ভ করে।
জল-ফড়িঙের উৎপাতে ডাঙার পোকা-মাকড় যেমন অস্থির থাকে, উহাদের বাচ্চাদের উপদ্রবে জলের পোকা-মাকড়দেরও সেই রকম ভয়ে ভয়ে থাকিতে হয়।
জলে বাস করিতে গেলে জল হইতে অক্সিজেন টানিয়া লওয়া দরকার, নচেৎ জলের প্রাণী বাঁচে না। এই কথাটা তোমাদিগকে বার বার বলিয়াছি। মাছ কাঁকড়া প্রভৃতির শরীরে সেই জন্য কান্কো থাকে। কান্কোর উপর দিয়া জল চলিতে থাকিলে, জলে-মিশানো অক্সিজেন্ রক্তের সহিত মিশিতে পারে। কিন্তু জল-ফড়িংদের বাচ্চার দেহে কান্কো থাকে না। ইহাদের দেহে লেজ হইতে আরম্ভ করিয়া মুখ পর্য্যন্ত একটা নল আছে। লেজের ছিদ্র দিয়া জল টানিয়া তাহারা সেই জল ক্রমাগত মুখ দিয়া বাহির করিতে থাকে। এদিকে আবার এই বড় নলের সঙ্গে অনেক ছোট নলের যোগ থাকে। এই ব্যবস্থায় জলের অক্সিজেন্ ঐ-সকল সরু নলের দ্বারা শরীরের সকল অংশে ছড়াইয়া পড়ে।
জল-ফড়িঙের বাচ্চারা এই রকমে প্রায় এক বৎসর জলের তলায় বাস করে। কিন্তু ইহারা অন্য পতঙ্গের মত পুত্তলি-অবস্থায় মড়ার মত পড়িয়া থাকে না। এক বৎসর উত্তীর্ণ হইলেই ইহাদের গায়ের চামড়ার নীচে ডানা গজাইতে আরম্ভ হয়। তার পরে ধীরে ধীরে ইহারা সম্পূর্ণ জল-ফড়িঙের চেহারা পায়। এই অবস্থায় ইহারা আর জলে ডুব দিয়া থাকিতে চায় না। জলের কোনো গাছ-পালা আঁক্ড়াইয়া আস্তে আস্তে উপরে আসে এবং জোর করিয়া গায়ের ছাল ছিঁড়িয়া সম্পূর্ণ জল-ফড়িঙের আকারে উড়িতে আরম্ভ করে।
যাহারা বাচ্চা অবস্থায় এক বৎসর জলের তলায় বাস করে, তাহারা সম্পূর্ণ পতঙ্গের আকারে পাঁচ সাত বৎসর বাঁচিবে, ইহাই আমাদের মনে হয়। কিন্তু জল-ফড়িং সম্পূর্ণ আকারে বেশি দিন বাঁচে না। সম্ভবত দুই তিন মাসেই উহারা মারা যায়।
৬.৩.৩ শিরা-পক্ষ পতঙ্গ : ভুঁই-কুমীর
ভুঁই-কুমীর
তোমরা এই পোকাদের জীবনের কথা বোধ হয় জান না। ইহাদিগকে তোমরা দেখিয়াছ কি না, তাহাও জানি না। বাংলা দেশের অনেক জায়গাতেই কিন্তু ভুঁই-কুমীর দেখা যায়। এই পোকার ইংরাজি নাম Ant Lion অর্থাৎ পিঁপ্ড়েদের সিংহ। বাংলা দেশের কতক কতক অংশে ইহাদিগকে ভুঁই-কুমীর বলা হয়। তাই আমরা ইহাদিগকে ভুঁই-কুমীর নাম দিলাম।
ভুঁই-কুমীর, জল-ফড়িং পোকাদেরি জ্ঞাতি, অনেক সময়ে ইহাদিগকে জল-ফড়িং বলিয়াই ভুল হয়। কারণ জল-ফড়িঙের মত ইহাদের চারিখানি পাত্লা শিরাযুক্ত ডানা থাকে, শরীরখানাও সেই রকমের লম্বা কিন্তু আকারে ছোট। ইহারা দিনের বেলায় বড় বাহির হয় না। রাত্রিই ইহাদের চরিয়া বেড়াইবার সময়। কখন কখন রাত্রিতে প্রদীপের কাছে আসিয়া ইহারা ডানা ঝট্পট্ করে।
যাহা হউক, ভুঁই-কুমীরের ইতিহাস বড় মজার। ইহার জলে ডিম পাড়ে না; ধূলা বা বালির উপরে ডিম পাড়িয়া উড়িয়া যায়। ডিম হইতে শীঘ্রই বাচ্চা বাহির হয়। এই বাচ্চাদের চেহারা বড় অদ্ভুত। এখানে একটা ভুঁই-কুমীরের বাচ্চার ছবি দিলাম। ছবিতে মুখের সম্মুখে একজোড়া প্রকাণ্ড বাঁকানো দাঁত দেখিতে পাইবে। চেহারাটাও কতকটা কুমীরের মত। বোধ হয় এইজন্যই ইহাদিগকে ভুঁই-কুমীর নাম দেওয়া হয়। ইহারা শুক্নো বালি, মাটি বা ধূলাতে বোতলে তেল ঢালার ফনেলের মত একএকটা গর্ত্ত করিয়া লুকাইয়া থাকে। আমরা বীরভূম জেলার বেলে মাটির ধূলায় এই পোকাদের গর্ত্ত যে কত দেখিয়াছি, তাহা গুণিয়া শেষ করা যায় না। গর্ত্ত খুঁড়িবার সময়ে ইহার নরম বালিতে মাথা ডুবাইয়া সমস্ত দেহটাকে ঘুরাইতে থাকে। ইহাতে গুঁড়ো বালি-মাটি সরিয়া গেলে, ছোট পেয়ালার মত একটি গোলাকার গর্ত্ত হইয়া পড়ে। এই গর্ত্তের সব দিক্ই খুব ঢালু থাকে। ভুঁই-কুমীরের বাচ্চারা ইহারি তলায় সর্ব্বাঙ্গ ধূলায় ঢাকিয়া চুপ্ করিয়া পড়িয়া থাকে। কোনো নূতন জিনিস দেখিলে, তাহা হাতে করিয়া নাড়াচাড়া করা ছোট ছেলেপিলেদের একটা বিশেষ স্বভাব। পিঁপ্ড়েদেরও এই রকম স্বভাব দেখা যায়। কোনো জিনিস সম্মুখে পড়িলে উঁকি মারিয়া বা দুই চারিবার শুঁয়ো বুলাইয়া তাহা না দেখিলে তাহাদের যেন তৃপ্তি হয় না। পথের মাঝে পেয়ালার মত একএকটা গর্ত্ত দেখিলেই, পিঁপ্ড়েরা তাহা উঁকি মারিয়া দেখিতে চায় এবং ইহাতে প্রায়ই পা ফস্কাইয়া গর্ত্তের ভিতরে পড়িয়া যায়। এই রকমে একবার গর্ত্তের ভিতরে পড়িলে, আর রক্ষা থাকে না। গর্ত্তের তলায় বালির মধ্যে ভুঁই-কুমীরের যে বাচ্চা লুকাইয়া থাকে, সে চট্ করিয়া বাহির হইয়া তাহার সাঁড়াসির মত দাঁত দিয়া পিঁপ্ড়েকে ধরিয়া ফেলে। পিঁপ্ড়েরা পলাইবার জন্য খুবই চেষ্টা করে এবং কখনো কখনো শত্রুর হাত হইতে ছাড়াও পায়, কিন্তু তখনি তাহাদিগকে আবার ধরা দিতে হয়। গর্ত্তের চারিদিকে যে ঢালু বালি-মাটি থাকে, তাহার উপর দিয়া উঠিতে গেলেই পিঁপ্ড়েদের পা পিছ্লাইয়া যায়। কাজেই তখন গড়াইতে গড়াইতে তাহারা আবার শত্রুর মুখের গোড়ায় আসিয়া হাজির হয়।
