রাজা-রাণীর জন্ম
উইয়েরা সাধারণত আকারে খুবই ছোট, কিন্তু তাহাদের রাজা ও রাণী কিপ্রকারে হঠাৎ বড় আকার লইয়া জন্মে, এখন তোমাদিগকে তাহারি কথা বলিব। রাণী সমস্ত জীবন ধরিয়া যে গাদা গাদা ডিম পাড়ে, তাহার সকলগুলি হইতে ছোট কর্ম্মী উই জন্মে না। কতক ডিম হইতে পুরুষ এবং স্ত্রী বাচ্চাও বাহির হয়। কর্ম্মীরা নির্দ্দিষ্ট আকারের বেশি বড় হয় ন। কিন্তু পুরুষ ও স্ত্রীর দল শীঘ্র শীঘ্র পুত্তলি-অবস্থা হইতে সম্পূর্ণ উই হইয়া দাঁড়াইলে, তাহাদের প্রত্যেকের দুইটি করিয়া চোখ এবং চারিখানা ডানা গজাইয়া উঠে। ডানা বাহির হইলে পুরুষ ও স্ত্রী উইয়েরা আর ঘরে থাকিতে চায় না। তখন তাহারা দল বাঁধিয়া বাসার বাহিরে আসে এবং উড়িতে আরম্ভ করে। কোনো কোনো দিন বৃষ্টির পরে যে বাদল-পোকা আকাশে উড়িতে দেখা যায়, তাহারাই সেই ডানাওয়ালা স্ত্রী ও পুরুষ উই।
দেহে চারিখানা করিয়া ডানা থাকিলেও, ভারি শরীর লইয়া পুরুষ ও স্ত্রী উইয়েরা বেশিক্ষণ আকাশে উড়িতে পারে না। কাজেই তাহাদিগকে মাটিতে নামিতে হয় এবং নামিলেই ডানা ছিঁড়িয়া যায়। পাখী, পিঁপ্ড়ে, টিক্টিকি ও ব্যাঙেরা এই সকল উইয়ের পরম শত্রু। মাটিতে পড়িবামাত্র তাহাদের অনেকে ঐ-সকল শত্রুর হাতে মারা যায়; আবার কতক আগুনে পুড়িয়া বা জলে ডুবিয়া মারা পড়ে। এই রকমে ডানাওয়ালা স্ত্রী ও পুরুষ-উইদের অনেকেরই জীবন শেষ হইয়া যায়। কেবল যেগুলি দৈবাৎ কর্ম্মী উইদের সম্মুখে পড়ে, তাহাদের মধ্যে দুই চারিটি বাঁচিয়া থাকে। কর্ম্মীরা একটি পুরুষ এবং একটি স্ত্রী-উইকে মুখে করিয়া মাটির তলার বাসায় লইয়া যায় এবং শেষে সেই দুটির একটিকে রাণী এবং অপরটিকে রাজা বলিয়া মানিয়া, তাহাদিগকে পৃথক্ ঘরে আট্কাইয়া রাখে। এই রাণীই পরে বড় হইয়া রাশি রাশি ডিম পাড়ে।
তোমরা উইয়ের ডানা পরীক্ষা করিয়া দেখিয়ো। গাছের পাতার শিরা-উপশিরার মত ইহাদের ডানাতে শিরা দেখিতে পাইবে। এই জন্য উইকে শিরা-পক্ষ পতঙ্গ বলা হয়।
৬.৩.২ শিরা-পক্ষ পতঙ্গ : জল-ফড়িং
জল-ফড়িং
তোমরা এই পোকা নিশ্চয়ই দেখিয়াছ। পুষ্করিণী বা অন্য জলাশয়ের ধারে ইহাদিগকে অনেক দেখা যায়। জলে যদি বাঁশ বা কাঠ পোঁতা থাকে, তবে ইহারা ডানা মেলিয়া সেগুলির উপরে চুপ করিয়া বসিয়া থাকে। কখনো কখনো জলাশয় হইতে দূরেও জল-ফড়িংকে উড়িতে দেখা যায়। চিল শকুনি আকাশে ডানা মেলিয়া ঘুরিয়া বেড়ায়, ইহাদিগকেও সেই রকমে অবিরাম উড়িয়া বেড়াইতে দেখা যায়। ইহারা মৌমাছির মত কখনই ডানা গুটাইতে পারে না।
এখানে জল-ফড়িঙের একটা ছবি দিলাম। আমরা কোন্ পোকাকে জল-ফড়িং বলিতেছি, ছবি দেখিলেই তোমরা বুঝিতে পারিবে। অনেক জায়গায় ইহাদিগকে জলঝিঁঝি বা ঝিঁজি বলে। সত্যই ইহারা ঝিঁজি নয়। পুরুষ ও স্ত্রী-উইয়ের ডানায় যেমন শিরার মত দাগ কাটা থাকে, ইহাদের ডানাতেও সেই রকম দাগ থাকে। ডানাগুলি খুব পাত্লা ও স্বচ্ছ। এইজন্য জল-ফড়িংকে উইয়ের দলের শিরা-পক্ষ পতঙ্গ বলা হয়। কিন্তু উইয়ের মত ইহারা দলবদ্ধ হইয়া কখনই বাস করে না।
জল-ফড়িং আকারেও নিতান্ত ছোট হয় না। একএকটি দুই ইঞ্চি পর্য্যন্ত লম্বা হয়। ইহাদের গায়ের রঙ্ লাল হল্দে সবুজ নানা রকম দেখা যায়। মাথাটা প্রায়ই শরীরের তুলনায় বড় এবং চোখ দুটাও প্রকাণ্ড হয়। একএকটা চোখ প্রায় বারো চৌদ্ধ হাজার ছোট চোখ লইয়া প্রস্তুত। সুতরাং বলিতে হয়, ইহাদের আটাশ হাজার চোখ আছে। অনেক পতঙ্গেরই এই রকম হাজার হাজার চোখ আছে, কিন্তু জল ফড়িঙের চোখ অন্যদের চোখের চেয়ে অনেক উন্নত। আমাদের মাথায় দুটা বড় বড় চোখ আছে, কিন্তু এই চোখের গঠন এমন খারাপ যে, তাহা দিয়া খুব কাছের বা খুব দূরের জিনিস দেখিতে গেলে মুস্কিলে পড়িতে হয়। আমরা চোখের খুব কাছে বই রাখিয়া পড়িতে পারি না, আবার দশ হাত দূরে বই রাখিয়াও অক্ষর চিনিতে পারি না। জল-ফড়িঙের মাথার দুই ধারে যে দুই-গাদা চোখ বসানো আছে, তাহার মধ্যে কতকগুলি দিয়া উহারা কাছের জিনিস দেখে এবং আর কতকগুলিকে দূরের জিনিস দেখিবার সময়ে কাজে লাগায়। কাজেই অন্য পোকাদের চেয়ে ইহাদের দৃষ্টি-শক্তি অনেক বেশি।
উইয়েরা গাছ-পালা ও বাঁশ-খড় খায়। জল-ফড়িং উহাদের মত প্রাণী হইয়াও কিন্তু নিরামিষ খাবার ছোঁয় না। ছোট ছোট পোকা ও মশা-মাছি ইহাদের প্রধান খাদ্য। উড়িবার সময়ে ইহারা কেবল ছোট পোকারই সন্ধান করে। কাছে কোনো পোকাকে উড়িতে দেখিলে জল-ফড়িংরা তাহার উপরে চিলের মত ছোঁ মারে এবং ছয়খানা পা দিয়া তাহাকে আট্কাইয়া ফেলে। তার পর উড়িতে উড়িতেই শিকারটিকে দাঁত দিয়া পিষিয়া ফেলে। ইহাদের পা-গুলি মুখের খুব কাছে সাজানো থাকে, এজন্য শিকার ধরিয়া মুখে গুঁজিয়া দিবার খুব সুবিধা হয়। কিন্তু এই পায়ে হাঁটিয়া বেড়াইবার কাজ চলে না। জল-ফড়িং কখনই পিঁপ্ড়ে, বোল্তা বা উইয়ের মত হাঁটিতে পারে না। গোরুর গাড়ীর পিছনটা যদি সাম্নের চেয়ে ভারি হয়, তবে গাড়ী ওলা হইয়া যায়। তখন গাড়ী আর চালানো যায় না। জল-ফড়িঙের মাথা ও বুকের চেয়ে লেজের অংশটা বেশি ভারি। এইজন্য হাঁটিয়া বেড়াইতে গেলে, তাহাদের লেজ মাটিতে লুটাইতে থাকে। কাজেই তাহাদের হাঁটিয়া চলা একেবারে অসম্ভব। তোমরা এইবার যখন জল-ফড়িং দেখিবে, তখন উহাদের উঠা-বসা চলা-ফেরা সকলি পরীক্ষা করিয়া দেখিয়ো।
