স্ত্রী, পুরুষ ও কর্ম্মী-উই
পিঁপ্ড়ে ও মৌমাছিদের দলে যেমন স্ত্রী, পুরুষ ও কর্ম্মী আছে, উইদের মধ্যেও ঠিক তাহাই দেখা যায়। যদি কখনো উইয়ের ঢিবি পরীক্ষা করিবার সুযোগ পাও, তবে তোমরা সেখানে ছোট ও বড় দুই রকম উই দেখিতে পাইবে। ইহারা সকলেই কর্ম্মী। ছোট উইগুলিরই সংখ্যা বেশি। ইহারা ঘর-দুয়ার তৈয়ারি প্রভৃতি পরিশ্রমের কাজ করে। বড় উইগুলি সৈনিক ও পাহারা-ওয়ালা। দেহের তুলনায় ইহাদের মাথা যেন একটু বড় এবং সম্মুখের দাঁতগুলি লম্বা। ছোট কর্ম্মী-উইদের মধ্যে পাহারা দেওয়াই ইহাদের কাজ। বাহির হইতে কোনো শত্রু আসিয়া পড়িলে, ছোট কর্ম্মীর দল নিরাপদ জায়গায় লুকাইয়া পড়ে। তখন কেবল সৈনিকেরাই তাহাদের সেই ধারালো দাঁত দিয়া শত্রুকে তাড়া করে। ইহাদেরও চোখ নাই। কোথায় শত্রু আছে, তাহা বোধ হয় শুঁয়ো দিয়াই উহারা জানিতে পারে। কে শত্রু এবং কে মিত্র, তাহা বুঝিয়া লইতে ইহারা কখনই ভুল করে না।
স্ত্রী ও পুরুষ-উই বোধ হয় তোমরা দেখ নাই। একএকটি ঢিবিতে কেবল একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী-উই থাকে। ইহাদিগকে উইদের রাজা ও রাণী বলা যাইতে পারে। মাটির ভিতরকার বাসার সকলের নীচের ঘরে রাজা ও রাণী বাস করে। রাণী-উইকে দেখিতে অতি বিশ্রী। সাধারণ উই কত বড় তাহা তোমরা দেখিয়াছ। রাণীর আকার তাহারি ত্রিশ হাজার গুণ বড়। দেহে পা শুঁয়ো প্রভৃতি সকল অঙ্গই থাকে। কিন্তু সেগুলি দেহের তুলনায় এত ছোট যে দেখাই যায় না। এক-একটা প্রকাণ্ড উদর লইয়াই ইহাদের দেহ। এই পেটে অসংখ্য ডিম থাকে এবং প্রতি মিনিটে ইহারা ষাট্ বা সত্তরটা ডিম পাড়ে।
রাজা অর্থাৎ পুরুষ-উইদের শরীর রাণীর মত বড় না হইলেও, সাধারণ উইয়ের চেয়ে অনেক বড়। এখানে রাজা, রাণী ও কর্ম্মী উইদের ছবি দিলাম। সাধারণ উইয়ের চেয়ে রাজা ও রাণী কত বড়, তাহা ছবিটি দেখিলেই তোমরা বুঝিতে পারিবে। আকারে বড় হইলেও, রাজা ও রাণীর মত অক্ষম প্রাণী পৃথিবীতে দেখা যায় না। তাহাদিগকে একই ঘরে মড়ার মত যাবজ্জীবন পড়িয়া থাকিতে হয়। মোটা দেহ লইয়া তাহারা একটুও নড়াচড়া করিতে পারে না। এজন্য অনেক কর্ম্মী ও সৈনিক উই দিবারাত্রি রাজা-রাণীকে যত্ন করে এবং ডিম পাড়া হইলে সেগুলিকে মুখে করিয়া অন্য ঘরে লইয়া যায়। ক্ষুধার সময়ে কর্ম্মীরাই রাজারাণীর মুখে খাবার তুলিয়া দেয়।
পাছে রাজা বা রাণী পলাইয়া যায়, এই ভয়ে কর্ম্মী উইরা রাজার ঘরের দরজা কাদা দিয়া এমন ছোট করিয়া তৈয়ারি করে যে, রাজারাণী ইচ্ছা করিলে কখনই ঘরের বাহিরে আসিতে পারে না। পাখী, ব্যাঙ্, টিক্টিকি ও ইঁদুর উইয়ের পরম শত্রু। ইহাদের অত্যাচারে প্রতিদিনই হাজার হাজার উই মারা যায়। উইদের রাণী ক্রমাগত ডিম পাড়িয়া এই ক্ষয়ের পূরণ করে। এই জন্যই বাসার সকল উই রাজারাণীকে খুব যত্নে রাখে এবং কোনোখানে পলাইতে দেয় না।
উইয়ের ঘরকন্না
বোল্তা, মৌমাছি ও পিঁপ্ড়েরা কেমন দল বাঁধিয়া বাস করে এবং বাসার কাজকর্ম্ম কেমন ভাগ করিয়া চালায়, তাহা তোমরা আগেই শুনিয়াছ। উইদের মধ্যে ঠিক সেই রকম কর্ম্ম-বিভাগ আছে। বাসার সমস্ত উই দলে দলে বিভক্ত হইয়া, কেহ খাবার আনিতে যায়, কেহ ঘর প্রস্তুত করে এবং কেহ ডিম ও বাচ্চাদের যত্ন লয়। কর্ম্মীরা সঙীন্ওয়ালা সিপাহীর মত বাসার ভিতরে এবং বাহিরে পাহারা দেয়। ইহারা পাহারার কাজে এমন মজবুত যে, বাহির হইতে কোনো শত্রু ভিতরে আসিয়া হঠাৎ কোনো ক্ষতি করিতে পারে না। পিঁপ্ড়ে বা অন্য পোকামাকড় বাসার কাছে আসিলেই, সৈনিকদের সহিত তাহাদের লড়াই বাধিয়া যায়। ইহাতে উইয়েরাই জয়লাভ করে।
উইয়ের বাসা
উইয়েরা মাটির তলায় যে বাসা তৈয়ারি করে, তোমরা যদি সুবিধা পাও তবে তাহা পরীক্ষা করিয়ো। পিঁপ্ড়েদের বাসার মত ইহা কেবল মাটি দিয়া প্রস্তুত নয়। নরম বা পচা কাঠ দাঁতে কুরিয়া এবং তাহার সহিত মুখের লালা ও মাটি মিশাইয়া ইহারা এক রকম কাদার মত জিনিস প্রস্তুত করে। ইহাই উইদের বাসা প্রস্তুতের মসলা। পিঁপ্ড়ের বাসা মাটি খুঁড়িয়া পরীক্ষা করিতে গেলে, তাহা ভাঙিয়া-চুরিয়া নষ্ট হয়। উইয়ের বাসার মাল-মসলা শক্ত বলিয়া, তাহা ঐ রকমে সহজে ভাঙে না। স্পঞ্জের গায়ে কত ছোট ছিদ্র থাকে, তাহা তোমরা দেখিয়াছ। উইয়ের বাসা কতকটা স্পঞ্জের মত ছিদ্রযুক্ত, কিন্তু ছিদ্রগুলি কিছু বড়। এইগুলিই উইদের ঘর ও বাসায় যাইবার পথ।
উইয়ের বাসাগুলি এক একটা নগরের মত,—তাহাতে যে কত বড় বড় রাস্তা আঁকিয়া বাঁকিয়া চলিয়াছে, তাহার হিসাবই হয় না। ঘরের সংখ্যাও অনেক। কোনো ঘরে ডিম বোঝাই থাকে, কোনো ঘরে বাচ্চাদের লালন-পালন করা হয়। আবার কতকগুলি ঘরের দেওয়ালে ও সুড়ঙ্গের গায়ে চাষ-আবাদের কাজ চলে। এক রকম ছোট ব্যাঙের ছাতা উইয়েরা খাইতে বড় ভালবাসে। আমরা যেমন জমিতে সার দিয়া ধান, গম, ছোলা, মটর প্রভৃতি আবাদ করি, উহারা সেই রকমে ঘরের ও সুড়ঙ্গের দেওয়ালে ব্যাঙের ছাতার বীজ বুনিয়া চাষ করে। উইয়ের বাসা খুঁড়িয়া বাহির করিলে, সেখানে ঐ-রকম ব্যাঙের ছাতা অনেক দেখা যায়। যে ছোট প্রাণী মানুষের মত চাষ-আবাদ করিতেও জানে, তাহারা কত বুদ্ধিমান্ একবার ভাবিয়া দেখ।
