যুদ্ধক্ষেত্রে যে-সব সৈনিক মারা পড়ে, আমরা তাহাদের দেহ আনিয়া গোর দিই বা পুড়াইয়া ফেলি। পিঁপ্ড়েরা মৃত সৈনিকের দেহ টানিয়া গর্ত্তে লইয়া যায়। কিন্তু গোর দেয় না। পিঁপ্ড়েরা মৃত দেহ পাইলে খুব আনন্দ করে এবং সকলে মিলিয়া ভাগ করিয়া খাইয়া ফেলে। কাণা খোঁড়া স্বজাতীয়দের উপরেও তাহাদের দয়ামমতা নাই,—কোনো নিষ্কর্ম্মা লোককে তাহারা দলে থাকিতে দেয় না। কোনো রকমে দলের পিঁপ্ড়ে আহত হইলে, সকলে মিলিয়া তাহাকে বাসায় টানিয়া লইয়া খাইয়া ফেলে।
তোমরা হয় ত ইতিহাসে পড়িয়াছ, অতি প্রাচীনকালে পৃথিবীর সকল দেশেই মানুষ কেনা-বেচা চলিত। লোকে যাহাকে টাকা দিয়া কিনিত, তাহাকে পশুর মত খাটাইত। এক দল লোক এক দেশ হইতে মানুষ ধরিয়া আনিয়া আর এক দেশে বিক্রয় করিত। এখন পৃথিবীর কোনো দেশে মানুষ-ধরার ব্যবসায় নাই। কিন্তু পিঁপ্ড়েদের মধ্যে এই চুরি-বিদ্যা খুব আছে। পিঁপ্ড়েরা অনেক সৈন্য সংগ্রহ করিয়া হঠাৎ আর এক দলের গর্ত্তে প্রবেশ করে এবং তাহাদের ডিম ও পুত্তলি চুরি করিয়া নিজেদের গর্ত্তে আনিয়া ফেলে। এই চুরি লইয়াও দুই দলে কখনো কখনো লড়াই বাধে। চুরি-করা ডিম হইতে যে পিঁপ্ড়ে জন্মে, সেগুলি চোর পিঁপ্ড়েদেরই দলভুক্ত হয়।
পিঁপ্ড়ের বাসা চেনা
গর্ত্ত ছাড়িয়া পিঁপ্ড়েরা কত দূরে দূরে বেড়ায়, তাহা তোমরা নিশ্চয়ই দেখিয়াছ। আমরা এক রকম পিঁপ্ড়েকে চারি শত বা পাঁচ শত গজ দূরে বেড়াইতে দেখিয়াছি। পিঁপ্ড়েরের দৃষ্টি শক্তি খুব ভালো নয়, কিন্তু তথাপি তাহারা কখনো পথ ভুলে না। এত দূরে গিয়াও তাহারা কি রকমে নিজের গর্ত্তে আসিয়া পৌঁছায়, তাহা বড় আশ্চর্য্যজনক মনে হয়। এ-সম্বন্ধে বড় বড় পণ্ডিতেরা অনেক খোঁজ খবর লইতেছেন, কিন্তু আজও ঠিক কথাটি জানা যায় নাই। অনেকে বলেন, পিঁপ্ড়ের ঘ্রাণশক্তি খুব প্রবল, তাই গন্ধ শুঁকিয়া শুঁকিয়া ইহারা নিজেদের বাসা বাহির করিতে পারে। হাজার হাজার পিঁপ্ড়ে একত্র থাকিলে, তাহাদের মধ্যে কোন্গুলি নিজের দলের ইহাও পিঁপ্ড়েরা অনায়াসে চিনিয়া লইতে পারে। সম্ভবত, এখানেও গন্ধ শুঁকিয়া পিঁপ্ড়েরা আপন ও পর ঠিক করিতে পারে।
ইংলণ্ডের একজন প্রধান পণ্ডিত লর্ড আভারির নাম বোধ হয় তোমরা শুন নাই। তিনি সমস্ত জীবনই কেবল পোকা-মাকড় লইয়া পরীক্ষা করিয়াছিলেন। তাঁহার চেষ্টায় পোকা-মাকড়ের জীবনের অনেক নূতন কথা জানা গিয়াছে। তিনি একবার একটি পিঁপ্ড়েকে দল হইতে ছাড়াইয়া লইয়া বহুকাল পৃথক রাখিয়াছিলেন। এত দিনেও সে নিজের দলের কথা ভুলে নাই, ছাড়িয়া দিবামাত্র সে দলে মিশিয়া গিয়াছিল। ইহাতে মনে হয়, কেবল গন্ধ শুঁকিয়াই পিঁপ্ড়েরা দল চিনিয়া লয় না। কোনো পিঁপ্ড়ে হঠাৎ পরের দলে প্রবেশ করিলে সেখানে জায়গা পায় না। দলের পিঁপ্ড়েরা দুই চারিবার গায়ে শুঁয়ো বুলাইয়াই তাহাকে অন্য দলের পিঁপ্ড়ে বলিয়া চিনিতে পারে এবং শেষে তাহাকে জোর করিয়া দল হইতে তাড়াইয়া দেয়।
পিঁপ্ড়ের আয়ু
লর্ড আভারি একটি পিঁপ্ড়েকে বিশেষ যত্ন করিয়া প্রায় ছয় বৎসর বাঁচাইয়া রাখিয়াছিলেন। সুতরাং পিঁপ্ড়েরা বেশি দিন বাঁচে না বলিয়া আমাদের যে ধারণা আছে, তাহা ভুল। নিজের ইচ্ছায় চলা-ফেরা করার সুবিধা পাইলে, ইহারা সাত বৎসর পর্য্যন্ত বাঁচিয়া থাকে।
৬.৩.১ শিরা-পক্ষ পতঙ্গ : উই
শিরা-পক্ষ পতঙ্গ
(Neuroptera)
উই
তোমরা সকলেই উই দেখিয়াছ। ইহারা শুক্নো জায়গায় বাস করিতে ভালবাসে। বাঁশ কাঠ শুক্নো লতা-পাতা ইহাদের খাদ্য। কিন্তু যেখানে উই বেশি থাকে, সেখানে খাতা-পত্র মোজা-কাপড় এমন কি জুতা পর্য্যন্ত তাহাদের গ্রাস হইতে রক্ষা করা যায় না। শুক্নো কাঠ বা বাঁশ মাটিতে পোঁতা থাকিলে, সেগুলির ভিতরে উইয়ে বাসা করে। যদি একখানা উই-ধরা বাঁশ পরীক্ষা করিবার সুবিধা পাও, তবে দেখিবে, বাঁশের ভিতরে উইরা মাটি দিয়া সরু পথ ও সুড়ঙ্গ তৈয়ার করিয়াছে।
যেখানে বাঁশ বা কাঠ নাই, সেখানে উই পোকারা মাটির তলায় ঘর প্রস্তুত করে। তোমরা মাঠে নিশ্চয়ই উইদের ঢিবি দেখিয়াছ। এ-সকল ঢিবির নীচে মাটির মধ্যে উহাদের ঘরবাড়ী থাকে। বৃষ্টির জল বা রৌদ্রের তাপ যাহাতে বাসায় না লাগে, তাহারি জন্য উহারা বাসার উপরে চিবি করিয়া রাখে। আমাদের দেশে সাধারণ উইয়ের ঢিবি এক হাত বা দেড় হাতের বেশি উঁচু হয় না, কিন্তু আাফ্রিকায় এক জাতি উইকে বারো চৌদ্দ হাত উঁচু ঢিবি বানাইয়া তাহার নীচে নিশ্চিন্ত হইয়া বাস করিতে দেখা যায়।
উই পতঙ্গজাতীয় প্রাণী, কিন্তু বোল্তা বা পিঁপ্ড়ের জাতীয় নয়। সাধারণ পতঙ্গদেরই মত ইহাদের ছয়খানা পা আছে এবং খাদ্য কাটিয়া খাইবার জন্য এবং ঘরের মাল-মসলা জোগাড় করিবার জন্য সাঁড়াশির মত দুইটা দাঁতও আছে। তা’ ছাড়া এক জোড়া শুঁয়ো আছে। উইয়ের শুঁয়ো খুব লম্বা হয় না। কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয় উহাদের চোখ নাই। ইহারা অন্ধ প্রাণী। যে-সব পোকা-মাকড়ের চোখ নাই, তাহারা আলোতে থাকিতে চায় না। উই-পোকাও আলো ভালবাসে না। যখন দেওয়াল বা মাটির উপর দিয়া যাওয়া-আসার দরকার হয়, তখন উহারা মাটি দিয়া সুড়ঙ্গ বনায় এবং সুড়ঙ্গের পথে যাওয়া-আসা করে। সুড়ঙ্গের জন্য যে মাটির দরকার হয়, তাহা উহারা দাঁত দিয়া কাটিয়া আনে এবং তাহার সহিত মুখের লালা মিশাইয়া কাদা তৈয়ারি করে। ইহা দিয়াই উইদের সুড়ঙ্গ ও বাসা তৈয়ারি হয়।
