কেবল মানুষের মধ্যেই যে কুঁড়ের রাজা আছে, তাহা নয়। অন্য ছোট প্রাণীদের মধ্যেও এই রকম অকোজো জানোয়ার অনেক দেখা যায়। মানুষের মধ্যে অকেজোর ছেলে কেজো হয়; কিন্তু ছোট প্রাণীদের মধ্যে তাহা দেখা যায় না। অকেজো প্রাণীদের পুত্র পৌত্র জ্ঞাতি গোষ্ঠী সকলেই অকেজো,—ইহারা যেন, অকেজোর ঝাড়! পরের ঘাড়ে চাপিয়া আরামে জীবন কাটানো ইহাদের স্বভাব।
এই রকম প্রাণী কি তোমরা দেখ নাই? কুকুরের গায়ে যে আঁটুলি থাকে, তাহা এই রকম প্রাণী। ইহারা আহারের চেষ্টায় সহজে চলা-ফেরা করিতে চায় না। কুকুরের গা কাম্ড়াইয়া রক্ত চুষিয়া খাওয়াই ইহাদের কাজ। কিন্তু ইহাদের পুরুষরা নিরীহ প্রাণী। তাহারা রক্ত খায় না,—রক্ত খায় স্ত্রীরাই। যদি কুকুরের গা হইতে আঁটুলি ধরিয়া তোমরা বাগানের ঘাসের মধ্যে ছাড়িয়া দাও, তবে তোমরা দেখিবে সে অন্য এক প্রাণীর গায়ে উঠিবার চেষ্টা করিতেছে। তাহারা ফড়িং, প্রজাপতি বা ব্যাঙের মত তাড়াতাড়ি চলা-ফেরা করিতে জানে না। পরের ঘাড়ে চাপিয়া নিজেরা আহার করে বলিয়াই, আমরা এই সব প্রাণীকে পরাশ্রিত নাম দিলাম!
কেবল আঁটুলিই পরাশ্রিত প্রাণী নয়। মাথার চুলের মধ্যে যে উকুন থাকে, তাহাও এই দলের প্রাণী। ইহারা মাথার চাম্ড়া কাটিয়া রক্ত খায়, মাথার চুলেই শত শত ডিম পাড়ে এবং সেগুলি হইতে যে বাচ্চা বাহির হয় তাহারাও মাথার রক্ত খাইতে শুরু করে। যে-সব লোক কোনো ব্যবসায় বা লেখাপড়া শিক্ষা করে না, তাহারা যেমন পেটের দায়ে শেষে চুরি-ডাকাতি পর্য্যন্ত করে এবং পরের সর্ব্বস্ব লুটিয়া খায়, ইহারাও যেন সেই রকম অকেজোর দল।
গাছপালার মধ্যেও অনেক পরভোজী আছে। যাহারা কেজো গাছ তাহার মাটির ভিতর শিকড় চালাইয়া খাদ্য জোগাড় করে এবং হাজার হাজার সবুজ পাতা দিয়া বাতাস হইতে অনেক খাদ্য দেহে টানিয়া লইয়া বেশ সুখে স্বচ্ছন্দে জীবন কাটায়। কিন্তু পরাশ্রিত গাছপালারা তাহা করে না। ইহারা অন্য গাছের ঘাড়ে চাপিয়া বসে এবং এই আশ্রয়-গাছেরই রস নিজের শিকড় দিয়া টানিয়া আহার করে। এই রকম গাছকে পরগাছা বলে। আম গাছে প্রায়ই পরগাছা দেখা যায়। ইহারা এমন নিষ্ঠুরভাবে রস চুষিয়া খাইতে আরম্ভ করে যে, অনেক সময়ে আশ্রয়-গাছ ইহাদের উৎপাতে মরিয়া যায়। পরাশ্রিত গাছকে বাগানের সার-দেওয়া মাটিতে পুঁতিলে বাঁচে না। ইহারা এমন অকেজো যে, মাটি হইতে একটু রসও চুষিয়া লইতে পারে না। টাট্কা তৈয়ারি রস অন্য গাছের শরীর হইতে চুষিয়া না খাইলে ইহারা বাঁচে না। এমন অকেজো জীব আর কোথাও দেখিয়াছ কি?
কেঁচো খুবই ইতর প্রাণী, ইহাদের স্ত্রী-পুরুষ ভেদ নাই, চোখ কান নাক কিছুই নাই। কিন্তু তথাপি ইহারা নিজেদের খাবার নিজেরাই খুঁজিয়া পাতিয়া লয়। সুতরাং আঁটুলি বা উকুনের চেয়ে কেঁচো উৎকৃষ্ট বলিতে হয়। কিন্তু কেঁচোদের জাত-ভাই দুই একটি প্রাণী এমন অকেজো হইয়া পড়িয়াছে যে, তাহাদের কথা শুনিলে তোমরা অবাক্ হইয়া যাইবে। একটু চেষ্টা করিলেই কত ভালো খাবার পাওয়া যায়, কিন্তু তাহার কিছুই ইহাদের মুখে রুচে না। পরের ঘাড়ে চাপিয়া জীবন কাটানো ইহাদের স্বভাব।
৫.৩ জোঁক
জোঁক
জোঁক হয় ত তোমরা অনেকেই দেখিয়াছ। জলে কখনো কখনো ভিজে মাটিতে ও গাছপালায় ইহারা থাকে। কি বিশ্রী প্রাণী! ইহাদের দেখিলেই লোকে দূরে পালাইয়া যায়। গরু-বাছুর কুকুর-শিয়ালেরাও ইহাদের ভয় করে। বড় বড় প্রাণীর গরম রক্ত জোঁকের প্রিয় খাদ্য। কিন্তু এ-রকম খাবার সকল সময়ে জোটে না, কাজেই অন্য জিনিস খাইয়া তাহাদের বাঁচিয়া থাকিতে হয়। ছোট মাছ, গুগ্লি, এবং শামুক ছোট পোকা জোঁকের প্রধান খাদ্য। শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য ইহাদের দেহে বিশেষ যন্ত্র নাই। কেঁচোরা যেমন গায়ের চামড়া দিয়া বাতাসের অক্সিজেন চুষিয়া লয়, ইহারাও তাহাই করে এবং শরীর হইতে লালার মত জিনিস বাহির করিয়া চামড়া ভিজে রাখে। কিন্তু কেবল লালায় গা ভিজে থাকে না; এজন্য ডাঙার জলা জায়গায় জোঁক থাকে। খট্খটে শুক্নো ডাঙায় রাখিলে জোঁক বাঁচে না।
এখানে জোঁকের একটা ছবি দিলাম। চিৎ করিয়া ফেলিয়া শরীরটাকে লম্বালম্বি চিরিলে, জোঁককে যে-রকম দেখায়, ছবিটি সেই রকম করিয়া আঁকা আছে। ইহাদের দেহে স্নায়ুগুলি কি-রকমে সাজানো আছে, ছবি দেখিলেই তাহা বুঝিতে পারিবে। দেহে এক জোড়া স্নায়ু মাঝামাঝি দিয়া লেজ হইতে মাথা পর্য্যন্ত উঠিয়াছে। তা ছাড়া প্রত্যেক স্নায়ু হইতে ছোট ছোট শাখা স্নায়ু বাহির হইয়া সমস্ত শরীরকে আচ্ছন্ন রাখিয়াছে। ডাইনে স্নায়ুর সজ্জা যে রকম, বাম দিকে অবিকল সেই রকম।
প্রত্যেক শাখায় যে এক একটা মোটা রকমের অংশ দেখিতেছ,—উহাকে স্নায়ু-গ্রন্থী অর্থাৎ স্নায়ুর গাঁট বলে। কেঁচোর দেহেও এই রকম গ্রন্থী আছে। স্নায়ুর কাজ কি, তাহা তোমরা আগে শুনিয়াছ,—ইহা টেলিগ্রাফের তারের মত খবর বহিয়া লইয়া যায়। গাঁটগুলি যেন সেই টেলিগ্রাফের ছোট আফিস্। এই সব আফিস্ হইতে ছোট ছোট সূতা দিয়া সর্ব্বাঙ্গের মাংসপেশীতে খবর পাঠানো হয় এবং সেই খবর জানিয়া জোঁকেরা নড়াচড়া করে। দেশে অনেক টেলিগ্রাফ আফিস্ থাকিলে সকলের উপরে একটা হেড আফিস্ রাখা হয়। জোঁকের শরীরের স্নায়ু দিয়া যে টেলিগ্রাফ চলে তাহারো একটা হেড-আফিস্ আছে। জোঁকেরা মাথায় কতকগুলি স্নায়ুর সূতা তাল পাকাইয়া হেড্ আফিসের সৃষ্টি করিয়াছে। বড় বড় প্রাণীদের মাথায় যে মস্তিষ্ক আছে ইহা তাহারি অঙ্কুর।
