দেহে স্নায়ু না থাকিলে প্রাণীরা জড়ের মত হয়। স্নায়ু আছে বলিয়াই তাহারা বাহিরের অবস্থা জানিতে পারে, কিছু গায়ে ঠেকিলে তাহা বুঝিতে পারে, শত্রুরা আক্রমণ করিলে তাহা জানিয়া নিজেদের রক্ষা করিতে পারে। প্রাণীর দেহের স্নায়ু-মণ্ডলী আরো যে সকল কাজ করে, তাহা তোমাদিগকে আগেই বলিয়াছি। কেঁচোর দেহে অনেক স্নায়ু আছে; এই জন্যই গায়ে হাত দিলে ইহারা পলাইতে চেষ্টা করে এবং ব্যাঙ্ বা অপর প্রাণীরা চাপিয়া ধরিলে বেদনায় ঝট্ফট্ করে।
কেঁচোর দেহে কি রকমে স্নায়ু সাজানো থাকে, এখানে তাহার একটি ছবি দিলাম। দেখ,—পেটের তলা দিয়া কেমন মোটা স্নায়ু মুখ হইতে লেজের দিকে চলিয়া গিয়াছে। কিন্তু এই স্নায়ুর সূতা একটি নয়, যদি ছবিখানি ভালো করিয়া পরীক্ষা কর, তবে জানিতে পারিবে, ছুইটি স্নায়ু পাশাপাশি সাজানো আছে, তাই উহাকে মোটা দেখাইতেছে। এই জোড়া স্নায়ু মুখের ঠিক্ নীচে তফাৎ হইয়া মুখের উপরে আসিয়া আবার একত্র হইয়াছে। বড় প্রাণীদের মস্তিষ্কে যেমন দেহের সমস্ত স্নায়ু নানা দিক্ হইতে আসিয়া জড় হয়, এখানে যেন তাহাই হইয়াছে।
কিন্তু এই স্নায়ু দুইটিতেই কেঁচোর স্নায়ুমণ্ডলী শেষ হয় নাই। ঐ দুইটির প্রত্যেকটি হইতে অনেক ছোট স্নায়ু ডালপালার মত বাহির হইয়া দেহ আচ্ছন্ন করিয়া রাখে। বাম দিকের স্নায়ুগুলি যে-রকমে সাজানো থাকে ডাইনের স্নায়ু সেই রকমেই সাজানো দেখা যায়; কিন্তু দুই দিকের স্নায়ুর মধ্যে কোনো যোগ থাকে না। শরীরের ডাইনে এবং বামে এই রকম সম্পূর্ণ পৃথক্ স্নায়ু অনেক প্রাণীর দেহেই দেখা যায়। কেঁচো, ফড়িং, প্রজাপতি প্রভৃতি পোকা-মাকড়দের দেহেও ইহা আছে। এই রকম স্নায়ু-ওয়ালা প্রাণীদের দ্বিপার্শ্বিক (Bilateral) বলা হয়। চক্ষুহীন হইয়াও কেঁচোরা এই স্নায়ু দিয়া আলো-আঁধার বুঝিতে পারে এবং একটু জোরে বাতাস বহিয়া গায়ে ঠেকিলে তাহা জানিতে পারে।
যে-রকমে কেঁচোদের বাচ্চা হয়, তাহা বড়ই আশ্চর্য্য রকমের। প্রত্যেক লাউ, কুমড়া ও শশা গাছে যেমন স্ত্রী-ফুল ও পুরুষ-ফুল ফোটে এবং তার পরে যেমন পুরুষ-ফুলের রেণু স্ত্রী-ফুলে ঠেকিলে তাহাতে ফল ধরে—কেঁচোর বাচ্চা হওয়াতেও অবিকল তাহাই দেখা যায়। প্রত্যেক কেঁচোর দেহেই এক অংশে খুব ছোট ডিম হয় এবং আর এক অংশে পুরুষ-ফুলের রেণুর মত আর একটা জিনিস জমা হয়। ডিমের গায়ে এই জিনিসটা লাগিলেই ডিম বড় হইতে আরম্ভ করে।
আমি অনেক কেঁচো পরীক্ষা করিয়া উহা দেখিয়াছি, তোমরাও একটি মোটা কেঁচো পরীক্ষা করিয়া দেখিয়ো। পরীক্ষায় দেখিতে পাইবে, তাহার মুখের দিকে একটা জায়গায় যেন আংটির মত একটি সাদা অংশ রহিয়াছে। তোমাদের পোষা কুকুরের গলায় যেমন গলাবন্ধ অর্থাৎ ‘কলার’ পরাইয়া থাক,—ইহা যেন ঠিক্ সেই রকমের ‘কলার’। ইহারি ভিতরে কেঁচোদের অনেক ডিম হয়। যখন ডিম ছোট থাকে, তখন ঐ ‘কলার’ কেঁচোর গায়ে খুব শক্ত করিয়া আঁটা থাকে। কিন্তু ডিম বড় হইলে ‘কলার’ আর সে-রকম গায়ে-গায়ে লাগিয়া থাকে না, তাহা আপনা হইতেই ঢিলা হইয়া যায়। এই অবস্থায় কেঁচোরা তাহা আর শরীরে আট্কাইয়া রাখিতে চায় না; ধীরে ধীরে ডিমে-ভরা ‘কলার’টিকে মাথার উপর দিয়া গলাইয়া মাটিতে ফেলিয়া দেয়। তোমরা হয় ত ভাবিতেছ এই ডিম মাটিতে পড়িলেই ফুটিয়া গিয়া বাচ্চা উৎপন্ন করিবে। কিন্তু তাহা করে না। স্ত্রী-ফুলের গায়ে যেমন পুরুষ-ফুলের রেণু লাগা দরকার, তেমনি এই সব ডিমের গায়ে কেঁচোর দেহের সেই রকমের পদার্থটি লাগা প্রয়োজন। নচেৎ ডিমে বাচ্চা হয় না। যে উপায়ে কেঁচোর ডিমে পুরুষ-পদার্থ লাগে সে বড় মজার। এই জিনিসটা প্রায়ই কেঁচোদের গলার কাছে জন্মে। ডিমে-ভরা ‘কলার’টি শরীর হইতে খসাইয়া ফেলিবার সময়ে যখন তাহা গলার ঐ জায়গায় আসে, তখন পুরুষ-পদার্থের সঙ্গে ডিমের যোগ হইয়া যায়। ইহা হইলে ডিম ফুটিয়া বাচ্চা বাহির হইবার আর কোনো বাধা থাকে না।
ডিমে-ভরা ‘কলার’ অর্থাৎ গলাবন্ধ শরীর হইতে খসিয়া পড়িলে কেঁচোরা আর তাহা যত্ন করে না এবং একবারও তাহার খোঁজ লয় না,—কাদা বা ভিজে মাটির সঙ্গে মিশিয়া তাহা পড়িয়া থাকে! তার পরে ডিমগুলি বেশ পুষ্ট হইলে, তাহা হইতে কেঁচোর বাচ্চা বাহির হয়।
আগে যে-সব প্রাণীর কথা বলিয়াছি, তাহাদের অনেকেই নিজের দেহ খণ্ড খণ্ড করিয়া সন্তান উৎপন্ন করে। জবা-গাছের ডাল পুঁতিলে যেমন নূতন জবা-গাছ জন্মে, ইহা যেন সেই রকমের। কেঁচোরা সাধারণত সে-রকমে সন্তান উৎপন্ন করে না বটে, কিন্তু যদি কোনো রকমে ইহাদের দেহ খণ্ডিত হইয়া পড়ে, তবে সম্মুখের খণ্ড হইতে লেজ বাহির হইয়া এক-একটা নূতন কেঁচো জন্মে। যদি তোমরা পরীক্ষা করিতে চাও, তবে একটা বাচ্চা কেঁচোকে টুক্রা করিয়া কাটিয়া ভিজে মাটির মধ্যে রাখিয়া দিয়ো। কিছু দিন পরে হয় ত দেখিবে, উহার শরীরের সম্মুখের টুক্রা হইতে এক একটি নূতন কেঁচো হইয়া দাঁড়াইয়াছে। এই পরীক্ষা অতি সাবধানে করিতে হয়। বেশি গরম বা বেশি ঠাণ্ডায় কেঁচোদের ঐ রকম পরিবর্ত্তন দেখা যায় না।
৫.২ পরাশ্রিত অকেজো প্রাণী
পরাশ্রিত অকেজো প্রাণী
তোমরা ‘কুঁড়ের রাজা’ দেখিয়াছ কি? মানুষের মধ্যে খোঁজ করিলে কুঁড়ের রাজা অনেক দেখা যায়। ইহারা সংসারের একটুও ভালো কাজ করে না; খায়-দায় ঘুমায়, তার পরে বুড়া হইয়া মরিয়া যায়। ইহাদের কিছুরই অভাব হয় না। অন্য কেহ উপার্জ্জন করিয়া খাওয়ায় বা বাপ পিতামহেরা যে টাকা জড় করিয়া রাখিয়াছেন, তাহা খরচ করিয়া জীবনটা বেশ কাটাইয়া দেয়। এই সব লোক এমন অকেজো যে, যদি তাহাদিগকে খাটিয়া খাইতে বলা যায়, তবে তাহারা একটুও নড়াচড়া করে না। শেষে হয় ত অনাহারে মরিয়া যায়। কুঁড়ের রাজারা জীবনে কখনো পরিশ্রম করে না, অথচ পরের ঘাড় ভাঙিয়া খায় এবং বাবুগিরি করে। এই জন্য সমস্ত লোকে তাহাদের ঘৃণা করে; মনে করে, এমন লোক মরিয়া গেলে সংসারের একটুও ক্ষতি নাই।
