যাহা হউক, মাথার হেড আফিস্ ছোট ছোট আফিস্গুলিতে হুকুম চালায় এবং ছোট আফিস্ সেই হুকুম সর্ব্বত্র প্রচার করে। কিন্তু তাই বলিয়া ছোট আফিস্গুলি একেবারে পরাধীন নয়। দরকার হইলে হেড আফিসের হুকুম না লইয়াই তাহারা স্নায়ুর উপরে নিজেদের হুকুম চালায়। ছুরি দিয়া যদি জোঁকের দেহ দুই ভাগে ভাগ করা যায়, তবে লেজের অংশ মাথার অংশ হইতে পৃথক হইয়াও কিছুক্ষণ নড়চড়া করে। লেজের অংশে জায়গায় জায়গায় যে স্নায়ুর গাঁট আছে, তাহাই হুকুম চালাইয়া লেজ নাড়ায়। এই জন্য মস্তিষ্কশূন্য হইয়াও জোঁকেরা কিছুক্ষণ জীবিত থাকে।
স্নায়ুর গাঁটের এই কাজটা কেঁচো হইতে আরম্ভ করিয়া উই, পিঁপ্ড়ে, মশা, মাছি প্রভৃতি অনেক প্রাণীতেই দেখা যায়। কেঁচো ও জোঁকের শরীরে ইহার আরম্ভ-মাত্র হইয়াছে। প্রাণীরা যেমন ধাপে ধাপে উন্নত হইয়া পড়িয়াছে, ইহাদের শরীরের স্নায়ুর কাজও তেমনি সুন্দর হইয়াছে।
জোঁকের স্নায়ুর কথা বলিতেই অনেক সময় কাটিয়া গেল। এখন ইহাদের অন্য কথা বলিব। ছবিতে দেখ,—জোঁকের মুখ ও পিছন দুই দিকেই দু’টা মোটা ফাঁক আছে। কিন্তু পিছন দিক্ দিয়া ইহারা রক্ত চুষিয়া খাইতে পারে না। জোঁকের পিছন দিক্টা দেখিতে একটি বাটির মতো, ভিতরের সঙ্গে তাহার যোগ নাই। ইহা দিয়া মাটি আট্কাইয়া তাহারা চলিয়া বেড়ায়। মুখের চোয়ালে তিন সারি করাতের মত ধারালো দাঁত আছে; তাহা দিয়া ইহারা শিকারের গায়ের চামড়া কাটিয়া ছিদ্র করে। তার পরে শরীটাকে এমন করিয়া বাঁকায় যে, তাহা আংটির মত গোলাকার হইয়া পড়ে। ইহার পরে মুখ দিয়া সেই কাটা ঘা হইতে জোরে রক্ত চুষিতে আরম্ভ করে। রক্ত খাইলে তাহাদের দেহটা রবারের মত ফাঁপিয়া মোটা হইয়া পড়ে। কেঁচোর চোখ নাই, ইহা তোমরা আগে শুনিয়াছ; ইহারা মাটির তলায় অন্ধকারে থাকে, কাজেই চোখের দরকারও হয় না। কিন্তু জোঁকের মাথার উপরে দশবারোটা করিয়া ছোট চোখ আছে।
ডিম হইতে জোঁকের বাচ্চা হয়। শরীর হইতে আঠার মত এক রকম লালা বাহির করিয়া ইহারা তাহারি মধ্যে ডিম পাড়ে। ইহাতে ডিমে ও গায়ের রসে জড়ানো এক রকম গুটি তৈয়ার হয়। এইগুলি জোঁকেরা বিল বা পুকুরের কাদার মধ্যে ফেলিয়া রাখে। কিছুদিন পরে ডিম ফুটিলে তাহা হইতে জোঁকের ছোট বাচ্চা বাহির হয়।
ছিনে জোঁক তোমরা দেখিয়াছ কি? আমাদের দেশের যে-সব জায়গা নীচু ও জলা, সেখানে ডাঙায় এই জোঁক দেখা যায়। ইহারা এক ইঞ্চি বা দেড় ইঞ্চির বেশি লম্বা হয় না। ছোট গাছপালা বা ঘাসের উপরে ইহারা শিকারের জন্য প্রতীক্ষা করিয়া বসিয়া থাকে; শিকার দেখিলেই দৌড়িয়া তাহার গায়ের রক্ত চুষিতে আরম্ভ করে। ইহাদের পা নাই তাহা তোমরা জান,—অথচ দৌড়ানো চাই। ইহাদের দৌড়ানোর উপায় বড় মজার। কেঁচো যেমন দেহকে সঙ্কুচিত ও প্রসারিত করিয়া ছুট্ দেয়, ইহারা তাহা পারে না। প্রথমে মুখ দিয়া ইহারা জোরে মাটি চাপিয়া ধরে। তার পরে লেজটা মুখের কাছে আনিয়া শরীরটাা ধনুকের মত বাঁকাইয়া ফেলে। ইহার পর লেজের সেই বাটির মতো মুখ দিয়া মাটি চাপিয়া আসল মুখটা আগাইয়া দেয়। এই রকমে শরীরটাকে একবার বাঁকা এবং একবার সোজা করিতে করিতে যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাইতে পারে।
৫.৪ ক্রিমি – গোল ক্রিমি
ক্রিমি
ক্রিমিরা জোঁক ও কেঁচোর জাত-ভাই। কিন্তু ইহারা নিতান্ত অধম শ্রেণীর প্রাণী এইং সম্পূর্ণ পরাশ্রিত। মানুষ বা জন্তুদের দেহের ভিতরেই ইহাদের বাস। যাহাদের দেহে আশ্রয় লয় ইহারা তাহাদেরি শরীরের রস চুষিয়া খাইয়া বড় হয়। তোমরা হয় ত ক্রিমি দেখিয়াছ; দেখিলেই ঘৃণা হয়। এমন কদর্য্য প্রাণী বোধ হয় আর নাই। ইহাদের জীবনের কথা শুনিলে তোমাদের আরো ঘৃণা হইবে।
ক্রিমি নানা রকমের আছে। সচরাচর আমরা যে, সকল ক্রিমি দেখিতে পাই,—তাহা কেঁচোর মত, কিন্তু সাদা। আবার ছোট সাদা ক্রিমি আছে, সেগুলি কেঁচোর বাচ্চার চেয়ে বড় হয় না। দেখিলে মনে হয়, সেগুলি যেন, এক একটি আলপিন্। ক্রিমিদের মধ্যে যেগুলি অতি ভয়ানক তাহাদিগকে পাটা-ক্রিমি বলে। আমরা প্রথমে পাটা-ক্রিমিদের কথা বলিব।
মানুষের অন্ত্রে অর্থাৎ পাকযন্ত্রে ইহাদের বাস। যখন বড় হয়, তখন ইহাদিগকে সাদা ফিতের মত দেখায়। এক একটা পাটা-ক্রিমি দুই হাত হইতে ছয় সাত হাত পর্য্যন্ত লম্বা হয়। কেঁচোর শরীরে যেমন আংটির মত অংশ জোড়া থাকে, ইহাদের দেহেও ঠিক্ সে রকম ছোট ছোট অংশ জোড়া আছে। কতকগুলি টুক্রা ফিতা জুড়িয়া একটা ছয় হাত লম্বা ফিতা তৈয়ার করিলে যে রকম হয়, ইহাদের শরীরটা সেই রকমের। কিন্তু টুক্রাগুলি পরস্পর খুব শক্ত করিয়া জোড়া থাকে না।
এখানে একটা বড় পাটা-ক্রিমির ছবি দিলাম। দেখ, ইহার দেহে কত টুক্রা টুকরা অংশ আছে। ইহার সম্মুখের দিক্টা কত সরু হইয়া আসিয়াছে, তাহাও ছবিতে দেখিতে পাইবে। এই দিক্টায় একটি মাথা আছে। মাথা অত্যন্ত ছোট, কিন্তু গায়ের রস চুষিয়া খাইবার জন্য ছোট মাথায় যে ব্যবস্থা আছে, তাহা অতি ভয়ানক!
পাটা-ক্রিমির মাথা অতি বিশ্রী। এই মাথা এবং সর্ব্বাঙ্গ দিয়া ক্রিমিরা মানুষ ও পশুর পেটের ভিতরকার সার অংশ চুষিয়া খায়। তা ছাড়া মাথায় বড়শির মত অস্ত্র আছে এবং মাথাকে এক স্থানে আটকাইয়া রাখিবার যন্ত্র আছে। সেগুলি পেটের নাড়ীভুঁড়ির গায়ে এমন করিয়া লাগিয়া যায় যে, ক্রিমিদিগকে কোনক্রমে পেট হইতে বাহির করা যায় না।
