কেঁচোর মুখে দাঁত নাই; খুব শক্ত মাংসপেশী দিয়া তাহাদের মুখ প্রস্তুত। সেই মুখ দিয়া তাহারা খাবার খায় এবং গর্ত্তও খোঁড়ে। মানুষ ও অন্য বড় প্রাণীদের শরীরে উদর ও নাড়ীভুঁড়ি অর্থাৎ পাকাশয় পৃথক্ থাকে। কিছু খাইলে খাবার প্রথমে উদরে (Stomach) যায়; সেখানে একটু হজম হইলে তাহা দড়ার মত মোটা ও লম্বা পাকাশয় অর্থাৎ অন্ত্রে (Intestines) গিয়া পৌঁছে। এখানে খাদ্য ভালো করিয়া হজম হয় এবং তাহাতে যে সারবস্তু থাকে তাহা শরীরে টানিয়া লয়। তেমরা হয় ত ছাগল বা ভেড়ার পেটের ভিতরকার উদর ও পাকাশয় দেখিয়া থাকিবে। দড়াদড়ির মত অংশটাই পাকাশয় এবং তাহারি উপরে যে থলির মত অংশ থাকে, তাহা উদর। কেঁচোদের শরীরে স্পষ্ট উদর বা পাকাশয় নাই। ইহাদের দেহের ভিতরটা দেখিলে মনে হয় যেন একটা নল মাথা হইতে লেজ পর্য্যন্ত চলিয়া গিয়াছে। ইহাই তাহাদের গলার ছিদ্র, উদর, পাকাশয় ইত্যাদি সকলেরি কাজ করে। সুতরাং কেঁচোকে যদি পেট-সর্ব্বস্ব প্রাণী নাম দাও, তাহা হইলে ঠিক্ কথাই বলা হয়।
খাবার হজম করিবার জন্য বড় প্রাণীদের দেহের ভিতর হইতে নানা প্রকার রস বাহির হইয়া উদরে ও পাকাশয়ে আসিয়া পড়ে। খাবারের সঙ্গে যে মাছ মাংস ডিম আমাদের পেটে যায়, তাহা এক রকম রসে হজম হয়। আবার ঘি তেল চর্ব্বি প্রভৃতি জিনিস অন্য কয়েক রকম রসে পরিপাক হয়। কেঁচোরা এই রকম সুখাদ্য জিনিস খায় না, তাহাদের পাক যন্ত্রও জটিল নয়। কেঁচোরা মাটি খায় এবং কখনো রাখে। কখনো দুই একটা টাট্কা পাতা বা ঘাস টানিয়া গর্ত্তের মুখে মাটির সঙ্গে যে পচা লতা-পাতা প্রভৃতি মিশানো থাকে, তাহাই উহাদের দেহগুলিকে পুষ্ট করে। এই রকমে সার ভাগ লইলে খাঁটি মাটি বাকি থাকে, তাহা ইহার লেজের দিকে ছিদ্র দিয়া গর্ত্তের বাহিরে ফেলিয়া দেয়। কেঁচোর গর্ত্তের উপরে জিলাপির মত প্যাঁচ-পয়ালা যে মাটি জমা থাকে তাহা বোধ হয় তোমরা দেখিয়াছ। উহাই সেই পরিত্যক্ত মাটি; ইহাকে কেঁচোর বিষ্ঠাও বলা যাইতে পারে।
যাহা হউক মাটিতে মিশানো পচা লতা-পাতা হজম করার জন্য কেঁচোদের কষ্ট করিতে হয় না। ইহাদের মুখ হইতে একরকম লালা বাহির হয়, তাহ৷ দিয়াই ইহারা খাবারের মাটি ভিজাইয়া ফেলে এবং তাহা দিয়াই খাদ্য হজম করে। চূণ, কাঠের ছাই এবং কষ্টিক্ ইত্যাদি জিনিস হাতে লাগাইলে হাতের চামড়ার ক্ষয় হয় এবং শেষে হাতে ঘা হইয়া পড়ে। এই সকল জিনিসকে ক্ষার বলে। কেঁচোর মুখ হইতে যে লাল বাহির হয়, তাহাতেও ক্ষারের গুণ আছে। এইজন্য তাজা সবুজ পাতায় কেঁচোর লালা লাগিলে, তাহার রঙ্ লাল হইয়া যায়।
এখানে কেঁচোর শরীরের ভিতরকার যন্ত্রের একটা ছবি দিলাম। ভিতরে যে নলটি রহিয়াছে, উহাই কেঁচোর পাকযন্ত্র। ইহার উপরে যে গাঢ় কালো অংশগুলি পাকনালীকে ঘেরিয়া আছে, উহা কেঁচোর রক্তের শিরা। মানুষ ও অন্য মেরুদণ্ডযুক্ত প্রাণীদের দেহের রক্ত লাল,—কেঁচোর রক্তও লাল। তোমাদিগকে আগেই বলিয়াছি, প্রাণীর রক্ত অণুবীক্ষণে পরীক্ষা করিলে, তাহাতে একরকম ছোট লাল-কণা ভাসিতে দেখা যায়, এই লাল-কণাই রক্তকে লাল করে, আসলে রক্ত সাদা। কেঁচোর রক্ত লাল হইলেও তাহাতে লাল-কণা একটিও থাকে না। কাজেই বলিতে হয়, কেঁচোর রক্ত স্বভাবতঃ লাল।
গায়ে রক্ত থাকিলে তাহা যাহাতে শরীরের সকল জায়গায় চলাচল করে তাহার ব্যবস্থা দরকার। মানুষ ও অন্য বড় প্রাণীদের শরীরে হৃদ্পিণ্ড আছে, তাহা দিবারাত্রি দপ্-দপ্ করিয়া শরীরের ভিতরকার শিরায় এবং উপশিরায় রক্তের স্রোত চালায়। কেঁচোর বুকে হৃদ্পিণ্ড নাই; তাহাদের দেহের যে-সকল শিরা রক্তে ভরা থাকে, তাহাই দপ্ দপ্ করে এবং সঙ্গে তাহারি শাখাপ্রশাখা ও সরু শিরা দিয়া সর্ব্বাঙ্গে রক্ত ছড়াইয়া পড়ে।
কিছুক্ষণ শরীরের ভিতরে চলাচল করিলে সকল প্রাণীরই রক্ত খারাপ হইয়া যায়। কাজেই তখন বদ্ রক্তকে তাজা করিয়া না লইলে শরীরের কাজ চলে না। বড় বড় প্রাণীদের দেহে রক্ত নির্ম্মল করিবার খুব ভালো ব্যবস্থা আছে। তাহারা প্রতি নিশ্বাসে বাতাসের অক্সিজেন বাষ্প ফুস্ফুসে প্রবেশ করায় এবং তাহাই রক্ত সাফ্ করে। কোনো মলিন জিনিসকে সাফ্ করিলে অনেক ময়লা জড় হয়। শরীরের রক্ত যখন সাফ্ হয়, তখনো সেই রকমে অনেক ময়লা শরীরে জমা হয়। বড় প্রাণীদের দেহের এই ময়লার অধিকাংশই মূত্রের আকারে শরীর হইতে বাহির হইয়া যায়। যে যন্ত্রে এই ময়লা জমা হয়, তাহাকে ইংরাজিতে Kidney অর্থাৎ মূত্রাশয় বলে। কেঁচোর দেহে রক্ত চলাচল করে, কিন্তু রক্ত সাফ্ করিবার জন্য ফুস্ফুস্ নাই। তোমরা হয় ত দেখিয়াছ, কেঁচোর গায়ের উপরটা সর্ব্বদাই ভিজে ভিজে থাকে এবং পাত্লা চামড়ার নীচের শিরা দিয়া রক্ত চলাচল করে। ইহাতে বাহিরের বাতাসের অক্সিজেন অতি সহজে রক্তের সহিত মিশিয়া যায় এবং অঙ্গারক বাষ্প প্রভৃতি শরীরের পক্ষে খারাপ বাষ্পও পাতলা চাম্ড়া ভেদ করিয়া বাহিরে আসে। সুতরাং বলিতে হয়, কেঁচো তাহার সকল শরীর দিয়া নিশ্বাস লয়। মানুষের মুখ নাক চাপিয়া রাখিলে, শরীরে অক্সিজেন যাইতে পারে না; কিছুক্ষণ এই অবস্থায় থাকিলে তাহার মৃত্যু হয়। কিন্তু কেঁচোদের সে বালাই নাই,—মুখ চাপিয়া ধরিলে কেঁচো মরে না। রক্তের আবর্জ্জনা এক সুন্দর উপায়ে ইহাদের শরীর হইতে বাহির হয়। দেহে যে আংটির মত অনেক অংশ আছে, তাহাদের সহিত এক একটি নল লাগানো থাকে। এই নলের একটা মুখ পেটের ভিতরে থাকে এবং অপর মুখটা দেহের পাশে আসিয়া শেষ হয়। রক্তের ও শরীরের অনেক আবর্জ্জনা ঐ নলের মুখ দিয়া বাহিরে আসিয়া পড়ে।
