কেঁচো
তোমরা সকলেই কেঁচো দেখিয়াছ। কি বিশ্রী প্রাণী! হাত, পা, চোখ, নাক, কিছুই নাই। বাদলের দিনে জল-কাদায় যখন বুকে হাঁটিয়া চলে, তখন তাহাদের দেখিলেই যেন গা ঘিন্-ঘিন্ করে। কিন্তু ইহারা অতি নিরীহ প্রাণী,—সাপের মত কামড়ায় না এবং কখনো কাহারো অনিষ্টও করে না; নিজের আহারের চেষ্টায় লুকাইয়া ঘুরিয়া বেড়ায়।
জলে কেঁচোরা স্থান পায় না; নিশ্চিন্ত হইয়া যে, ডাঙায় ঘুরিয়া বেড়াইবে তাহারো উপায় নাই। কেঁচো দেখিলে পিঁপ্ড়েরা দল বাঁধিয়া তাহাকে আক্রমণ করে; মাছেরা কেঁচো পাইলে পরম আনন্দে ভোজ লাগায়। এই সকল উপদ্রবের হাত হইতে উদ্ধার পাইবার জন্য কেঁচো মাটীর তলায় লুকাইয়া বাস করে। রাত্রি আসিলে, তাহারা চুপি চুপি গর্ত্ত হইতে বাহির হয় এবং খাবার চেষ্টায় একটু এদিক্ ওদিক্ ঘুরিয়া বেড়ায়। কেবল বাদলের সময়ে ইহারা দিনের বেলায় গর্ত্তের বাহিরে আসে। অল্প জল গায়ে লাগিলে ইহাদের খুব আনন্দ হয়।
কোঁচোর দেহটা কি রকম তোমরা বোধ হয় ভালো করিয়া দেখ নাই। বড় বড় গাছের তলায় বা অন্য ভিজে জায়গায় মাটির নীচে প্রায়ই অনেক কোঁচো থাকে। এই রকম জায়গায় মাটি খুঁড়িয়া দুই একটা বড় কেঁচো সংগ্রহ করিয়ো এবং তাহাদের দেহ পরীক্ষা করিয়া দেখিয়ো। পরীক্ষার জন্য যদি ইহাদিগকে জীবন্ত রাখিতে চাও, তবে একটি ছোট পাত্রে কিছু ভিজা মাটি ও পচা পাতা মিশাইয়া তাহাতে তিন চারিটি কেঁচো ছাড়িয়া দিয়ো। এই রকমে তাহারা বেশ আরামে থাকিবে। তার পরে যখন দরকার হইবে, দুই-একটাকে পাত্র হইতে উঠাইয়া তোমাদের ঘরে মেজের উপরে বা কাগজের উপরে ছাড়িয়া দিয়ো। এই রকমে ইহাদের দেহের খুঁটিনাটি ও তাহাদের চলাফেরা ভালো করিয়া দেখিতে পাইবে। ছোট জিনিসকে বড় করিয়া দেখার জন্য এক রকম কাচ আছে; ইহাকে আতসী কাচ (Magnifying Glass) বলে। সেই রকম কাচ দিয়া পরীক্ষা করিলে, তোমরা কেঁচোর শরীরের ছোটখাটো অংশও বেশ স্পষ্ট দেখিতে পাইবে।
এখানে কোঁচোর একটা ছবি দিলাম। দেখ,—মুখটা কত সরু। এই রকম ছুঁচ্লো মুখ আছে বলিয়াই ইহারা সহজে মাটিতে গর্ত্ত করিতে পারে। তার পরে দেখ,—শরীরের আগাগোড়ায় খুব ঘন ঘন দাগ কাটা আছে। গুণিলে এই দাগের সংখ্যা একশত পর্য্যন্ত হইতে দেখা যায়। ছবিতে কিন্তু ততগুলি দাগ দেওয়া হয় নাই। এক-একটি দাগ আংটির মত কেঁচোর দেহ ঘেরিয়া থাকে। বাচ্চা কেঁচোর গায়ে তোমরা হয় ত এই রকম দাগ দেখিতে পাইবে না, কিন্তু আতসী কাচ দিয়া দেখিলে নিশ্চয়ই দাগ নজরে পড়িবে। পিঁপ্ড়ে, প্রজাপতি, ফড়িং প্রভৃতি পোকার শরীরের উপরটা নরম হাড়ের মত একটা জিনিস দিয়া ঢাকা থাকে এবং তাহা আংটির আকারে সাজানো থাকে। কেঁচোর গায়ের আংটিগুলি সে-রকম শক্ত জিনিসে প্রস্তুত নয়। সেগুলিতে কেবল রবারের মত মাংসপেশীই আছে। প্রজাপতি প্রভৃতি প্রাণীরা প্রথমে ডিমের আকারে জন্মে। তার পরে উহারা ডিম হইতে বাহির হইয়া শুঁয়ো-পোকার মত হয়; তার পরে কিছুদিন নির্জ্জীবভাবে অনাহারে পড়িয়া থাকে; এবং সকলের শেষে তাহারা ডানা-ওয়ালা প্রাণী হইয়া দাঁড়ায়। পতঙ্গদের শরীরের এই সব পরিবর্ত্তনের কথা তোমাদিগকে পরে বলিব। কেঁচোর শরীরের এই রকম পরিবর্ত্তন হয় না,—ইহারা চিরজীবনই বুকে হাঁটিয়া চলে। তা’ছাড়া শুঁয়োপোকাদের দেহের আংটির গায়ে যেমন পা লাগানো থাকে, ইহাদের তাহা থাকে না। এই সকল কারণে কেঁচো শুঁয়োপোকাদের দলের প্রাণী নয়। যে-সকল জলের প্রাণীর কথা তোমরা আগে শুনিয়াছ, তাহাদেরি সঙ্গে কেঁচোর খুব নিকট সম্বন্ধ আছে। তাই ইহারা আজও ভিজে জায়গা ভিন্ন অন্য কোনো স্থানে থাকিতে পারে না। কেঁচোর চোখ নাই। যারা মাটির তলায় অন্ধকারে চিরজীবন কাটায়, তাদের চোখের দরকারও হয় না। কিন্তু শুঁয়ো-পোকাদের চোখ আছে এবং আরো অনেক ইন্দ্রিয় আছে, ইহারা প্রাণীদের মধ্যে খুব উন্নত; কেঁচো নিতান্ত অধম প্রাণী। পাছে তোমরা কেঁচো ও শুঁয়ো-পোকাদের একই রকমের প্রাণী বলিয়া মনে কর,—সেই ভয়ে এই কথাগুলি বলিলাম।
তোমরা যদি কেঁচোর গায়ে ধীরে ধীরে আঙুল বুলাইতে পার, তবে বুঝিবে আঙুলে যেন কাঁটা-কাঁটা কি ঠেকিতেছে। লেজের দিক্ হইতে মাথার দিকে আঙুল টানিয়া লইলে, ইহা বুঝা যায়; মাথার দিক্ হইতে লেজের দিকে আঙুল টানিলে, আঙুলে কিছুই ঠেকে না। তোমরা হয় ত ভাবিতেছ, কেঁচোর দেহে যে আংটির মত দাগ কাটা আছে, তাহাই বুঝি আঙুলে ঠেকে,—কিন্তু তাহা নয়। এখানে কেঁচোর শরীরের গোটা তিনেক আংটীর ছবি দিলাম। আতসী কাচে যে রকম বড় দেখায় ছবিগুলি ঠিক্ সেই রকমে আঁকা আছে। দেখ,—প্রত্যেক আংটীতে শুঁয়োর মত চারিটি করিয়া অংশ লাগানো আছে এবং সেগুলি আবার বাঁকিয়া লেজের দিকে ঝুঁকিয়া আছে। কাজেই যখন তুমি লেজ হইতে মাথার দিকে আঙুল টানিয়া লও, তখন সেই বাঁকা ও শক্ত শুঁয়োগুলি খাড়া হইয়া উঠিয়া আঙুলে বাধা দেয়। কিন্তু মাথা হইতে লেজের দিকে আঙুল টানিলে সেগুলি আরো ঝুঁকিয়া পড়ে, ইহাতে আঙুলে একটুও বাধা লাগে না।
বাদলের দিনে কেঁচো কি রকমে মাটির উপর দিয়া বুকে হাঁটিয়া চলে তোমরা দেখিয়াছ কি? যদি না দেখিয়া থাক, তবে বাদল হইলেই তোমাদের বাড়ীর আঙিনার কেঁচোগুলার চলা-ফেরা লক্ষ্য করিয়ো। ইহারা প্রথমে শরীরের মুখের দিকের খানিক অংশ টানিয়া লম্বা করে। এই রকমে তাহারা কিছু দূর আগাইয়া যায় বটে, কিন্তু লেজের দিকটা মোটেই অগ্রসর হয় না। ইহার পরেই তাহারা সেই মুখের দিকের অংশটাকে কোঁচ্কাইয়া পিছনের শরীরটাকে টানিতে থাকে। পিছনের দেহ ইহাতে অগ্রসর হয়। কোঁচ্কাইলেই শরীর পিছাইয়া পড়ে; কিন্তু কেঁচোর শরীরে প্রত্যেক অংশটিতে যে শুঁয়োগুলি লেজের দিকে ঝুঁকিয়া থাকে, সেগুলি মাটির গায়ে বাধা পাইয়া খাড়া হইয়া উঠে; কাজেই কোঁচ্কাইলেও কেঁচোর সম্মুখের দেহ আর পিছাইতে পারে না। এই রকমে ইহারা একবার সাম্নের দিক্টাকে বাড়াইয়া অগ্রসর হয় এবং পরে তাহাই শুঁয়ো দিয়া আট্কাইয়া পিছনের দেহটাকে টানিয়া লয়। এই উপায়ে কেঁচোরা খুব তাড়াতাড়ি সামনের দিকে চলিতে পারে। কিন্তু পিছু হটিয়া চলা ইহাদের অসাধ্য। পিছনে চলিতে গেলেই শুঁয়োগুলি মাটিতে বাধা পাইয়া খাড়া হইয়া উঠে, তখন কেঁচো আর পিছাইতে পারে না। কেঁচোর চলা-ফেরা লক্ষ্য করিলে দেখিবে, তাহারা কখনই পিছাইয়া চলে না।
