কিন্তু একরকম আকস্মিকভাবে আমরা ষোলো শতকের শেষ পাদে আরাকান রাজ্যভুক্ত চট্টগ্রামে এবং সতেরো শতকের শেষার্ধে ও আঠারো শতকে মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত চট্টগ্রামে হিন্দু মুসলিম বহু পদকার পাচ্ছি। এই স্থানিক জনপ্রিয়তার ঋজু কারণ দুর্লক্ষ্য। এ কী চৈতন্য পার্ষদ চট্টগ্রামবাসী পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি, মুকুন্দ ও বাসুদেব দত্তের প্রভাবের ফল!
.
০৫.
আমরা দেখছি, রাষ্ট্রিক বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বাংলা দেশের তথা উত্তরভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগ রক্ষা করে চলেছিল। মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্যে মুসলমানের রচনা বলতে প্রায় সবটাই তো চট্টগ্রামেরই দান। এমনকি বাঙলা দেশের যে-কোনো অঞ্চলের হিন্দুর চাইতে চট্টগ্রামের হিন্দুর দানও কম নয়। হয়তো আন্তর্জাতিক বন্দর এলাকার লোক বলেই সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুগের আহ্বানে তারা সহজেই সাড়া দিতে পেরেছিল।
মধ্যযুগের চট্টগ্রামী হিন্দু কবিদের মধ্যে ষোলো শতকে পাচ্ছি কবীন্দ্র পরমেশ্বর ও শ্ৰীকরনন্দীকে। এরাই বাঙলায় মহাভারতের প্রথম অনুবাদক! সতেরো শতকে পাচ্ছি মৃগলুব্ধ প্রভৃতি রচয়িতা দ্বিজ রতিদেবকে ও লক্ষ্মণ দ্বিগ্বিজয়ের কবি দ্বিজ ভবানীনাথকে। আর আঠারো শতকে পাই সারদা-মঙ্গল প্রণেতা মুক্তারাম সেন, মার্কণ্ডেয় চণ্ডী মাহাত্ম্য লেখক ব্রজলাল সেন (ইনি মুক্তারামের ভাই), কালিকামঙ্গল রচক নিধিরাম আচার্য ও গোবিন্দ দাস, মনসার ভাসান প্রণেতা রামজীবন বিদ্যাভূষণ, মৃগলুব্ধ সংবাদ রচক রামরাজা, গোকুল মঙ্গল লেখক ভক্তরাম দাস, সত্যনারায়ণ পাঁচালী রচক ফকির চাঁদ প্রভৃতি ছাড়াও শঙ্কর দাস, শঙ্কর ভট্ট, বলরামদেব, রামতনু আচার্য, সদানন্দ ভট্ট প্রভৃতিকে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে আঠারো শতক থেকে বাঙালি হিন্দুরা প্রণয়োপাখ্যান রচনা শুরু করেন। এবং চন্দ্রাবলী রচয়িতা দ্বিজ পশুপতি ব্যতীত সবাই চট্টগ্রামবাসী। কাজেই এক্ষেত্রে পথিকৃতের গৌরব এঁদেরই। আজ অবধি আমরা আঠারো শতকের রামজীবন দাসের শশিচন্দ্রের উপাখ্যান, সুশীল মিশ্রের রূপবতী রূপবান উপাখ্যান, রাণীরাম দাসের শীত-বসন্ত, গোপীনাথ দাসের মনোহর মধুমালতী এবং উনিশ শতকের কবি মহেশচন্দ্র দাস চৌধুরীর সয়ফুল মুলুক জরুখভান পেয়েছি।
.
০৬.
চট্টগ্রামে প্রাপ্ত হিন্দুকবির পদগুলোর বৰ্হিরূপ বৈষ্ণব পদাবলীর মতো হলেও অনেক পদেই বৈষ্ণবীয় ভাব-সত্যের অভাব লক্ষণীয়। এমনকি ভণিতাগুলোও অনেক ক্ষেত্রে মহাজন পদাবলী সুলভ নয়, বরং মুসলিম রচিত পদের মতোই। এ-ও হয়তো আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতার ফল। মধ্যযুগে আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা বাঙলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার সর্বাঞ্চলিক বিকাশের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এজন্যে চণ্ডী মঙ্গল ও ধর্ম মঙ্গলের উদ্ভব ও বিকাশ কেবল রাঢ় অঞ্চলেই নিবদ্ধ দেখি। আবার পূর্ববঙ্গেই যেন মনসা কাহিনীর জনপ্রিয়তা ছিল সর্বাধিক। বৈষ্ণব সাহিত্যের উদ্ভব এবং বিকাশও সীমিত দেখি পশ্চিমবঙ্গে এবং আধুনিক চট্টগ্রাম বিভাগে (সিলেট ব্যতীত) বাউল সম্প্রদায় চিরকালই অনুপস্থিত। এখানে সত্যপীরের প্রভাবও ছিল সামান্য।
এমনকি বহুকাল ধরে মুসলমানদের বাঙলা সাহিত্য চর্চাও বিশেষ করে নিবদ্ধ ছিল চট্টগ্রামে ও রোসাঙ্গে। তেমনি দোভাষী রীতির ও পুঁথিসাহিত্যের উন্মেষ ও বিকাশ এবং কবিওয়ালাদের আবির্ভাব সীমিত ছিল পশ্চিমবঙ্গের এখানকার প্রেসিডেন্সী বিভাগে। আবার দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গেই বিশেষ চর্চা হয়েছিল লৌকিক উপদেবতা ও পীরকাহিনীর, এবং গাথা-গীতিকা রচিত হয়েছে বিশেষ করে ময়মনসিংহে ও চট্টগ্রামে।
অতএব, মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্যের একটা সর্ববঙ্গীয় চরিত্র ও রূপের অনুধ্যানে যতই আমরা আনন্দিত হতে চাই এবং অখণ্ডতা ও ঐক্যবোধের আগ্রহে যতই কেন সামগ্রিক রূপ-কল্পনাকে প্রশ্রয় দিই, ভৌগোলিক দূরত্ব যে বিভিন্ন অঞ্চলের বাঙলাভাষীদের পারস্পরিক মানসযোগ রক্ষার অন্তরায় ছিল, তা অস্বীকার করা যাবে না।
বাউল তত্ত্ব
০১.
মৈথুনতত্ত্ব ও টোটেম-বিশ্বাস অতি প্রাচীন। দুনিয়ার তাবৎ জাতির আদিম বিশ্বাস ও জীবনচর্যার সঙ্গে এ দুটো জড়িত। টোটেম-বিশ্বাসের একটি পরিচায়ক হচ্ছে পশু-পাখির নামানুসারে গোত্র ও ব্যক্তির নাম গ্রহণ। এটি আমরা প্রাচীন ভারতে যেমন দেখি, তেমনি অস্ট্রেলিয়া-আমেরিকার আদিবাসীদের মধ্যেও পাই। মৈথুনতত্ত্ব ভিত্তি করে শাস্ত্র ও দর্শন গড়ে ওঠে প্রধানত কৃষিজীবী সমাজেই–বিদ্বানদের মত এই। তার কারণ মৈথুন ও প্রজনন প্রাচীনকালের চেতনা অনুসারে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত ছিল।২ এবং ধন উৎপাদন পদ্ধতির অভিন্নতর ধারণা থেকেই মৈথুনতত্ত্ব ধর্মশাস্ত্রের মর্যাদায় উন্নীত হয়। এই জন্যে মৈথুন-ক্রিয়া ও উৎসবের সঙ্গে ফসলের সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠ। জাভা, নিউগিনি, অস্ট্রেলিয়া, মেক্সিকো প্রভৃতি আদিবসী অঞ্চলে এবং ভারতের আদিবাসী সাঁওতাল, হো, মুণ্ডা, পাঞ্চা, কোটার প্রভৃতির মধ্যে আজো মৈথুন উৎসব বিদ্যমান। এ হচ্ছে ফসল প্রাপ্তির বাঞ্ছায় সিদ্ধির আবহ সৃষ্টির প্রয়াস। আমাদের দেশে চৈত্র-বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে আজো অনাবৃষ্টির সময়ে ছেলেমেয়েরা কুলো নিয়ে ঘরে ঘরে পানি মাগে। তখন যেসব ছড়া আওড়ায় তাতে আছে কলাতলে এক গলা পানি, বৌ নাইয়রের নৌকা আনি ইত্যাদি। এতে বোঝা যায়, প্রবল বারিপাত জাত পরিবেশটা এরা কল্পনা করে, এবং তা-ই উচ্চারিত হয় বৃষ্টির আগমনী গানে। শস্য উৎপাদনের সঙ্গে মৈথুনের এমনি প্রতীকী আবহ সৃষ্টির সম্পর্ক রয়েছে। R. Briffault তাই বলেন :
