জগতের শ্রেষ্ঠ চিত্র, মূর্তি, সাহিত্য, নৃত্য ও সঙ্গীত তাই প্রেম-প্রতীক। এক কী বহু ধর্ম আর দর্শনও প্রেমবাদী। পৃথিবীব্যাপী আদি সমাজে মানুষের মনে ও মননে, কর্মে ও ধর্মে শৃঙ্গারই পেয়েছে প্রধান্য। শৃঙ্গারের নামই তাই আদিরস। সভ্যতা ও সংস্কৃতির এক বিশেষ স্তরে জীবনের ক্ষেত্রে এ আদিরসের বিচিত্র ও বহুধা প্রভাব স্বীকার করে ধন্য হয়েছে মানুষ, ধন্য করেছে দেবতাদের। গ্রীক ও হিন্দু পুরাণ তার সাক্ষ্য।
.
০৩.
পরকীয়াতেই প্রেমের স্ফুর্তি। তবু সমাজ-বিকাশের বিশেষ স্তরে সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্যে, দাম্পত্য প্রেমকেই আদর্শ ও মহিমান্বিত করবার প্রয়াস চলল। এই নৈতিক চেতনার যুগেই আমাদের দেশে হর-গৌরী, ইন্দ্র-সচী, রাম-সীতা, বিষ্ণু-লক্ষ্মী প্রভৃতি দাম্পত্য প্রেমের মহিমা কীর্তনচ্ছলে নিজেদের প্রণয়াকুতি প্রকাশ করেছে মানুষ। এই কৃত্রিম প্রয়াসে মানুষের তৃষ্ণা মেটেনি, ভরে উঠেনি তার বুক। তাই আবার পরকীয়া রসে সিক্ত হয়েই প্রস্ফুটিত হল তার চিত্ত-উৎপল। এই রসেই তার হৃৎকমলে সঞ্চিত হল মধু, সৃষ্টি হল মহিমান্বিত। মানুষের অবদমিত ও অবেচতন বাঞ্ছা-অপূর্ণতার আকুতি গানে, গাথায়, গল্পে, কবিতায়, উপন্যাসে, চিত্রে, নৃত্যে, প্রতিমায়, অধ্যাত্ম জিজ্ঞাসায় আজো অভিব্যক্তি পাচ্ছে বিচিত্র ও বর্ণালী হয়ে।
ইউসুফ-জোলেখা, লায়লী-মজনু, শিরি-ফরহাদ, কৃষ্ণ-নিপ্পিনাই বা রাধা-কৃষ্ণ–এ প্রেম প্রকাশের আদর্শ ও বিকাশের অবলম্বন হয়ে প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে মানুষের মনের আকুতি মিটিয়েছে। সমাজ-কলেবর বৃদ্ধির সাথে সাথে নৈতিক চেতনা যতই প্রবল হয়েছে, ততই সূক্ষ্ম অনুভবের স্তরে উন্নীত হয়েছে স্থূল প্রয়োজন, বাস্তব চাহিদা পেয়েছে মানসোপভোগে চরিতার্থতা। তাই বাস্তব জীবনে যা পাপ (sin), যা নৈতিক দোষ (vice) ও সামাজিক অপরাধ (crime) এবং সেহেতু ঘৃণ্য ও পরিহার্য; ভাবলোকে তা-ই আত্মার উল্লাস জাগায়। এ জীবনে কেবল আনন্দানুভবের উৎস হয়ে থাকেনি, পারিত্রিক সুখ-স্বপ্নেরও আধার হয়েছে।
দেহে রূপ, রূপে কাম, কামে প্রেম আর প্রেমেই আত্মার মুক্তি। সূফী-বৈষ্ণবের এ ধারণা একদিনে গড়ে উঠেনি। মানুষ অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছে চাওয়া ও পাওয়ার মধ্যে ব্যবধান থাকে বিস্তর, বাধা থাকে দুর্লঙ্ঘ। বাঞ্ছিত বস্তুমাত্রেই দুর্লভ ও দুঃসাধ্য। অথবা দুর্লভ না হলে কিছু বাঞ্ছনীয় হয় না। কাজেই তার জন্যে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও প্রয়াস প্রয়োজন। ধৈর্য ও অধ্যবসায়ই এ সাধনার সম্বল। হৃদয়ে দাহ ও চোখে অশ্রু প্রেমিকের নিয়তি। আর মিলনাকাঙ্ক্ষা তথা বিরহবোধই তার প্রেরণা ও সামর্থ্যের উৎস। এইজন্যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্য বিরহী আত্মার কান্নায় করুণ।
.
০৪.
এই রূপ ও রতি, কাম ও প্রেমবাঞ্ছা অভিব্যক্তি পেয়েছে রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলীতে। চৈতন্য-পূর্ব যুগে এগুলোতে অধ্যাত্মতত্ত্ব ছিল না। এ দৈহিক প্রেম ঐহিক জীবনে আনন্দিত স্বপ্ন জাগানোতেই ছিল সীমিত। চৈতন্যের প্রেম-ধর্ম প্রচারিত হওয়ার পরে এ সংগীত পারত্রিক ত্রাণের অবলম্বন হল। তখন অপ্রাকৃত হৃৎ-বৃন্দাবনে জীবাত্মা রূপিণী রাধার ও পরমাত্মারূপী কৃষ্ণের প্রণয়লীলার অনুধ্যান ও আস্বাদনই এর অপার্থিব মহৎ ও পরম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল। এভাবে প্রেমকে তত্ত্বের অনুগত করে রাধাকৃষ্ণের অবৈধ প্রেমকে করা হল মহিমান্বিত ও অনন্য। চৈতন্য-পূর্ব যুগে গোটা ভারতব্যাপী যা ছিল শৃঙ্গার-রস উপভোগের বাহন, চৈতন্যোত্তরকালে তা-ই হল অধ্যাত্মরসের আকর।
জয়দেব, বিদ্যাপতি ও বড়চণ্ডীদাসের পদাবলী ছিল শারীর প্রেমের আকুতিমুখর। বৈষ্ণব ভক্তের চোখে পদকারেরা হলেন মহাজন ও গোস্বামী; আর পদাবলী হল সাধন-শাস্ত্র ও ভজন গীতি। তার পরে চৈতন্যোত্তর যুগের রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক প্রায় সব সঙ্গীতই আধ্যাত্মরসাশ্রিত।
যদিও জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতবাসীরা রাধা-কৃষ্ণ, রাম-সীতা কিংবা হর-গৌরী বিষয়ক পদ অভিন্ন লক্ষ্যে রচনা ও আস্বাদন করেছেন, তবু তত্ত্বগত পার্থক্য যে ছিল না, তা নয়। কেবল দ্বৈতাদ্বৈতবাদে নয়, ভক্তি আর প্রেম তত্ত্বেও ছিল তফাৎ। দ্বিজ চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, দীনচণ্ডীদাস, মীরাবাই, তুলসীদাস, আবদুর রহীম খান খানান, দাদু, এয়ারী, দরিয়া, রজব, তাজবেগম, আহমদ, রসখান কিংবা চাঁদ কাজী সৈয়দ সুলতান, আলাউল, সৈয়দ মর্তুজা, আলিরজা, মীর ফয়জুল্লাহ্ প্রভৃতি পদের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য তাই অভিন্ন নয়।
আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়, চৈতন্যদেব বাঙালির এবং ষোলো শতকের ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক গণ-নেতা। হয়তো বাঙলাদেশে থাকেননি বলেই বাঙলায় বৈষ্ণব ধর্মের বিস্তার আশানুরূপ হয়নি। কিন্তু তাঁর প্রেমবাদ, তাঁর সাম্য, প্রীতি ও করুণার বাণী, তাঁর উদার মানবতাবোধ বাঙালিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। গৌতম বুদ্ধের ও ইসলামের বাণীর ঐতিহ্য তার মাধ্যমে নতুন করে পেয়ে বাঙালি-চিত্ত সঞ্জীবিত হল। এজন্যে ষোলো শতক বাঙালির চিপ্রকর্ষের কাল–রেনেসাঁসের যুগ। আশ্চর্য, তবু ষোলো-সতেরো শতকে পদাবলী রচয়িতা বাঙলা দেশের সর্বত্র মিলে না। এই সময়কার প্রায় সব বৈষ্ণব কবিই পশ্চিমবঙ্গের তথা প্রেসিডেন্সী ও বর্ধমান বিভাগের।
