একটু সবুর করুন, আমরা কিন্তু এখনো মাউন্ট জিউসের উপর আপনার রিপোর্ট পাবার অপেক্ষায় আছি।
একবার ফ্লয়েড চোখ বুলিয়ে নিল ভ্যান ডার বার্গের মুখের উপর, কাঁধ ঝাঁকিয়ে তুলে নিল মাইক্রোফোন।
এখনি বলে দিলে, ক্যাপ্টেন, আপনি আমাদের স্রেফ পাগল ভাববেন। ব্যস। প্রমাণসহ ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই তো আসছি, ধৈর্যটা ধরা যায় না?
হুম! আদেশ করে শুধু শুধু আপনাদের মনোযোগ নষ্ট করার কোনো মানে হয়, কী বলেন? যাই হোক-গুড লাক। বিশেষত স্বত্বাধিকারীর পক্ষ থেকেও শুভেচছা-তিনি খুশি হয়েছেন জিয়াংয়ের কাছে যাবার কথা শুনে না। লরেন্স অনুমতি দেবেই, ফ্লয়েড নিজের মন্তব্য ছুঁড়ে দিয়ে। বলল, লুসিটা কে, বলতো একটু, রালফ ভায়া…
আমিও ঠিক চিনি না। আসলে নামটা বের করেছি কম্পিউটার সার্চ করে। ভাবলাম, সবাই সাথে সাথে লুসিফারের সাথে তালগোল পাকিয়ে ফেলবে, সেইসাথে আমরাও সন্দেহের বাইরে থাকব, এই আর কী! এম্নিতেও, সেটাতো এখানে আছেই, লুসি ইজ হেয়ার…
“আমি তাদের নাম শোনার কোনো আশা দেখিনি। হাজার হলেও, শত বছর আগে একটা বিখ্যাত গাইয়ের দল ছিল, নাম হল বিটলস। কিম্ভূত নাম। জিগগেস করো না কেন এমন ছন্নছাড়া নামের জন্ম হল। তাদের একটা মজার গান আছে, লুসি ইন দ্য স্কাই উইথ ডায়মন্ডস। অদ্ভুত, না? যেন তারা ঠিক ঠিক জানতো…
.
গ্যানিমিডের রাডার অনুসারে, জিয়াংয়ের ভাঙা অংশ পড়ে আছে মাউন্ট জিউসের তিনশো কিলোমিটার পশ্চিমে। আঁধার রাজ্যের কাছাকাছি কোথাও। পেছনে তাপহীন জগৎ। জায়গাটা পুরো ঠাণ্ডা হলেও একেবারে অন্ধকার নয়। অর্ধেক সময় সেখানে ভাল প্রতাপ নিয়ে দূরের সূর্য জেগে থাকে। এমনকি ইউরোপার সেই লম্বা সৌর দিনের পরও তাপমাত্রা শূন্যের অনেক অনেক নিচে থাকে সবসময়।
তরল পানি শুধু লুসিফারের দিকে মুখ করা দিকেই পাওয়া যায়। ইউরোপার অন্যদিকে শুধু বরফ, তাই এই গোধূলী এলাকা সারা বছর তীব্র ঝড়ে কাবু হয়ে থাকে।
সেখানে, সেই আলো আঁধারির মিলনমেলায় বৃষ্টি আর তুষাররা ঝগড়া করে মরে দিনমান।
পঞ্চাশ বছর আগে এখানেই কোথাও কিংবদন্তীর জিয়াং ক্র্যাশ করেছিল। কিন্তু সেই কোথাওটা হাজার কিলোমিটার সরে গেছে। শিপটা নিশ্চই গ্যালাক্সির মতো ভেসে গিয়ে ঠেকেছে বরফের রাজ্যের পাশে। এই শত্রুসুলভ শীতল-আঁধার প্রান্তে এসে ভিড়েছে অনিবার্যভাবেই।
এ দুনিয়াটার কেন্দ্রীয় সাগরের দ্বিতীয় ঠোঁটের পাশে আসার সাথে সাথে বিল টি রাডারে প্রতিধ্বনি টের পেল। এতো বড় জিনিসের তুলনায় প্রতিধ্বনি একেবারে
ক্ষীণ। মেঘ ভেঙে নামার সাথে সাথেই বুঝতে পারল কেন এমন লেগেছিল।
বৃহস্পতির কোনো উপগ্রহে আসা মনুষ্যবাহী প্রথম স্পেসশিপ জিয়াং এর ধ্বংসাবশেষ একটা ছোট, গোলাকার হ্রদে আটকে আছে। হ্রদটা অবশ্যই কৃত্রিম। সাগরের সাথে একটা ছোট নালা দিয়ে যুক্ত। সাগর থেকে তিন কিলোমিটারও হবে না দূরত্ব। শুধু কঙ্কালটাই টিকে আছে। তাও পুরোটা নেই। অনেক কিছুই চেঁছে পুছে সাফ করা।
কিন্তু করলটা কে? নিজেকেই প্রশ্ন করে ভ্যান ডার বার্গ।
এখানে জীবনের কোনো চিহ্ন নেই। জায়গাটা যেন অনেক বছর ধরেই পরিত্যক্ত। বোঝাই যাচ্ছে কিছু একটা শিপটাকে এখানে রেখে ব্যবচ্ছেদ করেছে একেবারে চিকিৎসকদের মতো।
ল্যান্ড করা একেবারে নিরাপদ। বলল ফ্লয়েড, তারপর অপেক্ষা করল ভ্যান ডার বার্গের কাঙ্ক্ষিত সায় আসার আশায়। বিজ্ঞানী সবকিছু ভিডিও করছে, মাথা নাড়ল সামান্য, অন্যমনস্কভাবে।
বিল টি বিনাশ্রমে ছোট্ট পুলটার পাশে ল্যান্ড করে। আর তারা আনমনা চোখে মানুষের কীর্তির স্মৃতি সৌধ দেখে শীতল, কালো জলের এপাড় থেকে। ধ্বংসাবশেষটার কাছে যাবার কোনো পথ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না-তাতে তেমন চিন্তি ত মনে হল না ছোট্ট যানটার দু কুকে।
নেমে ক্যামেরায় দৃশ্যগুলো ধরে নিল। তারপর গ্যালাক্সি থেকে ভেসে আসা উল্লাসধ্বনিতে চমকে উঠল দারুণভাবে।
কী চমৎকার করে বানিয়েছে শিপটাকে! এখন ধাতব গড়ন ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না, তবু বোঝা যায় বেশ। তারপর, ধাতু-কাগজ-প্লাস্টিকে বানানো লিপি আর ফুল পাঠিয়ে দিল শিপের উদ্দেশ্যে। লেখাগুলো রোমান অক্ষরে উল্কীর্ণ; আধুনিক সভ্যতার প্রথমদিকে যে ভাষা দুনিয়াকে এক করেছিল-সে ভাষায়।
বিল টির দিকে ফিরতে ফিরতে ফ্লয়েড আনমনে বলল, দেখেছ নাকি, বাস্তবে সেখানে কোনো ধাতুই ছিল না। কাঁচ, প্লাস্টিক আর সিন্থেটিকের আখড়া।
তাহলে রিব আর সাপোর্টিং গার্ডারগুলো?
যৌগ, ঠিক ধাতব নয়। বেশিরভাগই কার্বন আর বোরন। এখানকার কেউ নিশ্চই খুব ধাতুখেকো। তার উপর ধাতু দেখেই বুঝতে পারে, পারে চিনতে, ইন্টারেস্টিং …।
ভেরি, ভাবল ভ্যান ডার বার্গ। যে দুনিয়ায় আগুনের জন্ম হয়নি সেখানে ধাতু আর এ্যালয় গড়ার প্রশ্নই ওঠে না। ধাতুর দাম অবশ্যই… হীরার মতো হবার কথা। সেখানে কী করে ধাতুখেকো থাকতে পারে…।
বেসে রিপোর্ট করার পর সেকেন্ড অফিসার চ্যাঙের সম্ভাষণেভরা ফিরতি খবর পেয়ে দারুণ উৎসাহিত হয়ে উঠল তারা। ফ্লয়েড বিল টি কে হাজার মিটার উঠিয়ে নিয়ে পশ্চিমমুখো যাত্রা করল।
“লাস্ট ল্যাপ। সে বলল, গেমের এ পর্যায়ে উপরে উঠলে কোনো পয়েন্ট নেই। মিনিট দশেকের মধ্যেই চলে যাব সেখানে। কিন্তু ভুলেও ল্যান্ড করছি না। গ্রেট ওয়ালটা আমরা যা মনে করেছি তা হয়ে থাকলে না যাওয়াটাই অনেক ভাল। চড়ুইয়ের মতো ফুড়ৎ করে একটু উড়ে যাব উপর দিয়ে, তারপর সোজা বাসায়। মরার ক্যামেরাগুলো রেডি করে রাখ। এটা মাউন্ট জিউসের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
