সবচে বড় আশীর্বাদ, সারা শরীর মুড়ে নিয়ে স্পেসস্যুট পরার কোনো দরকার নেই। আজো পরিবেশের বাতাস টেনে নেয়া নিরাপদ না হলেও শুধু একটা মাস্ক আর অক্সিজেন সিলিন্ডার হলেই কাজ চলে যায়। আর মাত্র কয়েক দশক… বলে বেড়ায় মাইক্রোবায়োলজিস্টরা, যদিও ঠিক কবে তা বলতে তারা রাজী নয়… তারপরই উপড়ে ফেলব গ্যাসমাস্ক আর ভারী সিলিন্ডার। গ্যানিমিডের মুখ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে অক্সিজেন উগড়ে দেয়া ব্যাক্টেরিয়ার দঙ্গল। অবশ্যই, প্রথম চোটে ইচ্ছামতো তারা মারা পড়ে উপগ্রহের বিরূপ পরিবেশে, তারপরও কেউ কেউ বেঁচে গেছে; বাঁশঝাড়ের মতো বিস্তার করছে নিজের বংশ, অতি ধীরে বাড়াচ্ছে বায়ুমণ্ডলের চার্টের একটা বিশেষ রেখার বক্রতা, সাথে সাথে বাড়ছে দার্দানাসে বসে থাকা লোকগুলোর আশা।
প্রথম প্রথম ভ্যান ডার বার্গ ইউরোপা-৬ থেকে আসা ডাটার উপর চোখ রাখত, যদি…যদি একবার মেঘটা সরে যায় জিউস পর্বতের উপর থেকে… সে জানে, সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ, তবু চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখে না কখনো। রিসার্চের আর কোনো পথ ধরে চলার ধার ধারে না তখন। অবশ্য তাড়াহুড়োর কিছু নেই, সে খুব ভালমতোই জানে। আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হাতে পড়ে আছে; সেসব না করলে কপালে পড়বে উপজাতীয় হওয়ার দোষ আর অজনপ্রিয় হবার বোঝা।
আর তারপরই, অকেজো হয়ে পড়ল ইউরোপা-৬; একেবারে হঠাৎ করেই এলোপাথাড়ি উল্কাঝড়ের কবলে পড়ে। এদিকে পৃথিবীতে ভিক্টর উইলিস বেশ একটা বোকাটে কাজ করে বসেছে। গত শতাব্দীর ইউ এফ ও গুজবদাতাদের স্থান পূরণ করা ইউরোপাগল মানুষগুলোর কথা শুনতে গিয়েই এই দুর্গতি। তাদের মতে-এই কৃত্রিম উপগ্রহের পতন হয়েছে নিচের বিচিত্র দুনিয়ার অধিবাসী অথবা তাদের রক্ষাকারীর কল্যাণে। মজার ব্যাপার হল, জিনিসটা যে এর তৈরি করা ও ডিজাইনের সময়ে প্রত্যাশিত জীবদ্দশার দ্বিগুণের চেয়েও বেশি টিকেছে, প্রায় পনের বছর-সে কথাটা যেন ধর্তব্যই নয়। এ কথা বলে ভিক্টর উইলিস অনেক চিৎকার করলেও এখন আর করার কী থাকতে পারে! সে-ই তো এই সব মানুষকে প্রচার দিয়ে খাল কেটে কুমির টেনে এনেছে প্রথমদিকে।
ভ্যান ডার বার্গের হিসাব মতে তার এই সহকর্মী হল একেবারে কাঠখোট্টা ডাচম্যান; সে এই তত্ত্ব সব সময় চাউর করে বেড়াতেও চেষ্টা করে। ইউরোপা-৬ এর পতন তার কাছেও এক চ্যালেঞ্জ। আর এই বিশ্বস্ত উপগ্রহটার বদলে আরেকটা বসানোর টাকা অনুমোদনের বিন্দুমাত্র লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না, যাবার কথাও নয়।
তাহলে বিকল্পটা কী? নিজস্ব চিন্তা আর করণীয় নিয়ে বসে গেল কাজের মানুষ ভ্যান ডার বার্গ। যেহেতু সে একজন ভূতত্ত্ববিদ-কোনো অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট বা মহাজাগতিক পদার্থবিদ নয়, গ্যানিমিডে অবতরণের সাথে সাথেই তার দিক নির্ধারিত হয়ে বসে আছে।
গালি দেয়ার দিক দিয়ে পৃথিবীর সবচে ভাল ভাষাগুলোর মধ্যে একটা হল আফ্রিকান; অতি ভদ্রভাবে বলার সময়ও ভ্যাজাল পাকিয়ে বসে। ভ্যান ডার বার্গ কয়েক মিনিটের জন্য বাষ্প বন্ধ রেখে টিয়ামাট অবজার্ভেটরিতে একটা কল করল। ওই অবজার্ভেটরিটাও নগ্ন লুসিফারের ছোট্ট সদা জ্বলন্ত চোখের নিচে অবস্থিত। অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্টরা, মহাজাগতিক সুবিশাল রহস্যগুলো নিয়ে সর্বক্ষণ চিন্তিত বিজ্ঞানীর দল প্রায়ই বিরক্তির চরমে পৌঁছে যায় ভূতত্ত্ববিদদের একটা গ্রহের মতো অকিঞ্চিৎকর বিষয় নিয়ে মাতামাতি দেখতে দেখতে। কিন্তু সামনের সেই রণক্ষেত্রে সবাই সবাইকে সহায়তা করছিল যথাসম্ভব; আর ড. উইলকিন্স শুধু আগ্রহীই নয় বরং সহমর্মী।
টিয়ামাট অবজার্ভেটরি মাত্র এক উদ্দেশ্যে গড়া হয়েছে, যে উদ্দেশ্যটা গ্যালিমিডে বেস গড়ার অন্যতম কারণ। লুসিফারের উপর গবেষণা শুধু বৃহস্পতি-অবলোপন রহস্য বা সাধারণ বৈজ্ঞানিক চিন্তা চেতনা নয় বরং নিউক্লিয়ার প্রকৌশলী, উল্কাতবিদ, সমুদ্রবিজ্ঞানী এমনকি দার্শনিকদেরও বাস্তব প্রয়োজন মেটাতে পারে : একটি সূর্য। তার উপর কী ঘটলে একটা গ্রহ পরিণত হয় নক্ষত্রে সেই চিন্তাও সহস্ৰজনকে জাগিয়ে রেখেছে রাতের পর রাত। ব্যাপারটা জানা মানবজাতির জন্য খুবই প্রয়োজন। এই জ্ঞানই এমন কোনো কাজ করতে সক্ষম করবে মানুষকে, অথবা এমন কোনো সম্ভাব্য ঘটনা ঠেকাতে করবে সহায়তা যা…
আর এজন্যই এক দশকেরও বেশি সময় ধরে টিয়ামাট একে জরিপ করে চলেছে অবিরত; সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে। প্রতিটি মিলি সেকেন্ডের সমস্ত তথ্য টুকে রাখছে সেসব যন্ত্র। পুরো ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ব্যান্ডের সমস্ত আলোক বর্ণালী রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে সর্বক্ষণ। আর পরীক্ষা চলছে আগ্নেয়গিরির মুখে বসানো একটা শত মিটারের ডিশ অ্যান্টেনা দিয়ে।
ইয়েস, বলল ড. উইলকিন্স, আমরা মাঝেমধ্যে ইউরোপা আর আইওর দিকে তাকাই বটে, কিন্তু আমাদের ডিশটা একেবারে লুসিফারের দিকেই তাক করে রাখা হয়েছে; ফিক্সড। উপগ্রহগুলো যখন লুসিফারকে পার করে যায় তখনই শুধু কয়েক মিনিটের জন্য দেখতে পাই-এই যা। আপনার ঐ জিউস পর্বত তত দিনের প্রান্তে, না?
হ্যাঁ।
“আমরা ইউরোপার রাতের দিকটাই শুধু দেখতে পাই।
আমিও ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পারছি। একটু অস্থির যেন ভ্যান ডার বার্গ, কিন্তু আপনারা কি বিমটাকে সামান্য একটু সরিয়ে সেট করতে পারেন? ইউরোপা লাইনে আসার আগেই যেন দেখা যায় এমন কোথাও? দশ-বিশ ডিগ্রি ঘোরাতে পারলেই দিনের পাশটা দেখা সম্ভব।
