উনিশশো পঁয়তাল্লিশে এক ব্রিটিশ জ্যোতির্বিদ বলেছিল, রিংগুলো অস্থায়ী; গ্র্যাভিটিশনাল ফোর্স অচিরেই এই ক্ষণিকের দৃশ্যপটকে বদলে দেবে। অতীত দেখলেও বোঝা যায় যে তারা এই সেদিন জন্ম নিয়েছে। টেনেটুনে দুই বা তিন মিলিয়ন বছর হবে।
কিন্তু কেউ এই দু-ব্যাপারকে এক করে দেখেনি। এখানেও ত্রিশ লাখ বছর।
অধ্যায় ৩৪. ঘুরতে থাকা বরফ
ডিসকভারি গ্রহটার সুবিস্তৃত উপগ্রহরাজ্যের সীমানা পেরিয়ে চলে এসেছে। শনি এখন একদিনের পথ। কেন্দ্র থেকে আশি লাখ মাইল দূরে ঘুরন্ত উপগ্রহ ফোব শনির পেছনে।
সামনে এখন জ্যাপেটাস, হাইপেরিয়ন, টাইটান, রিয়া, ডিওন, টেথিস, এনক্লিয়াডাস, মিমাস, জ্যানাস। তারপর হাজারো বলয়ের অবাক চিত্র। প্রতিটি উপগ্রহই নিজস্বতা ঠিক রেখেছে পুরোদমে, আর সেসব উপরিতলের হাজারটা চিত্র পাঠাচ্ছে বোম্যান পৃথিবীর দিকে। টাইটান একাই তিন হাজার মাইল ব্যাসের স্যাটেলাইট। মাসের পর মাস ব্যয় করলেও এখানটা দেখে পোষাবে না।
বাকী সব উপগ্রহের শরীর ধূমকেতু আর উল্কার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। সাথে আছে হাজারো জ্বালামুখ। তবে এক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবে মঙ্গল। উপগ্রহগুলোয় আলো আধারীর বড় নকশাদার খেলা দেখা যায়; একটু পর পর চোখে পড়ে প্রচণ্ড প্রতিফলক এলাকা-সম্ভবত জমাট গ্যাস। অন্যদিকে জ্যাপেটাসের ভূ-প্রকৃতি অনেক বেশি অদ্ভুত।
এর এক গোলার্ধ শনির চিরসাথী, ফিরে থাকে শনির দিকেই কিন্তু ঝুঁকে থাকে বাইরে; এটা একেবারে অন্ধকারের দেশ। আলোর মুখে একটা নিখুঁত ডিম্বাকার সাদা এলাকা আছে, প্রস্থে দুশ আর দৈর্ঘ্যে চারশো মাইল। জায়গাটা পৃথিবী থেকেই টেলিস্কোপে দেখা যায় কারণ এ পিঠ সোজাসুজি সূর্যের দিকে তাক করা।
এখন দেখে মনে হচ্ছে উপগ্রহের মুখে খুব চিন্তাভাবনা করে কেউ সমতল জিনিসটা বানিয়েছে; এটা জমাট কোনো তরল নয়তো? এমন কৃত্রিম আকৃতি দেখে এ ধারণাও উবে যায়।
কিন্তু তার দেখার সময় নেই- কারণ ডিসকভারি এখন গতিহ্রাসের জন্য শনি জগতের কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এবার শনির একটা উপগ্রহ হয়ে বিশ লাখ মাইলের একটা সরু কক্ষপথে ঘুরবে, এ পথ ধরেই স্বাভাবিক নিয়মে জ্যাপেটাসের কাছে যাওয়া সম্ভব।
পৃথিবীর কম্পিউটারের সাথে এখন তিন ঘণ্টার সময় পার্থক্য থাকলেও সেটা জানিয়ে দিল যে সব ঠিকমতো চলছে।
শনি বলয়ের মাত্র দশ হাজার মাইল উপর দিয়ে উড়তে উড়তে বোম্যান নতুন দৃষ্টিকোণের সন্ধান পায়। সে জানত এখানে বরফ আছে আর সেগুলো আলো প্রতিফলন করে। কিন্তু এখান থেকে নিচে শুধু তুষারের পাতলা মহাসমুদ্র চোখে পড়ে। নিচে, যেখানে মাটি থাকার কথা, সেখানে খাবি খাচ্ছে কালো আকাশ আর নক্ষত্রের দঙ্গল।
কাছে যেতে যেতে এক সময় পুরো আকাশ জুড়ে শুধু বলয় আর বলয় দেখা গেল, এরমধ্যেই শনির পেছনে যাওয়া শুরু করেছে স্পেসশিপ। সূর্যের সবটুকু আলো বীরত্বের সাথে ফিরিয়ে দিচ্ছে চকচকে বলয়গুলো। এবার শনি-বলয়ের পেছনের সূর্যাস্ত দেখার মতো এক দৃশ্য হয়ে সামনে এলো, আকাশে ছড়িয়ে আছে লক্ষ সূর্য; এটাই বরফের কৃতিত্ব। আলোর এ অপার্থিব খেলা ফুরিয়ে যায় একটু পরেই, শনির পেছনে চলে এসেছে ডিসকভারি।
উপরে নক্ষত্রদের আকাশ, নিচে হাল্কা শনি-মেঘ। শনির মেঘমালা বৃহস্পতির মতো আলোর দ্যুতি ছড়াতে জানে না, কিন্তু ঘুরন্ত হিমবাহ সূর্যকে তাড়িয়ে দেয়ার পরও তার আলো নিয়ে খেলা করে অভাবটা পুষিয়ে দিচ্ছে।
যথারীতি রেডিও যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। বোম্যানের একাকিত্ব উপভোগের সময় নেই। শনির ওপাশে গেলেই আবার সূর্যালোক আর রেডিও যোগাযোগ দুইই ফিরে আসবে। এখন তার প্রতিটি সেকেন্ড কড়ায়গণ্ডায় মিটিয়ে নেবে ডিসকভারি; হাতে অসীম কাজ।
বহু মাসের আড়মোড়া ভেঙে ডিসকভারির মূল গ্লাস্টার কয়েক মাইল লম্বা আগুনে-লেজ দিয়ে জ্বলন্ত প্লাজমা ছুঁড়ে দিচ্ছে। শনির আকাশ এর আগে কখনো পেছনদিকে একটা সূর্যকে দেখতে পায়নি।
অবশেষে রাতের সমাপ্তির সাথে সাথে ডিসকভারির গতিও অনেক কমে এসেছে। এখন আর সৌরজগৎ ছেড়ে যাবার ভয় নেই, কিন্তু শনির অর্বিট ছাড়ার ঝুঁকি থাকে।
চৌদ্দদিন লাগবে জ্যাপেটাসের অর্বিটে স্থান করে নিতে। বাকী উপগ্রহগুলোর কক্ষপথ একে একে ফেলে সেখানে যেতে হচ্ছে। তারপর মিলতেই হবে জ্যাপেটাসের সাথে। না পারলে ফিরে যাবে শনিতে, আটাশ দিনের কাজ শেষ করে আবার উঠে আসবে। এমনি কথা ছিল।
কিন্তু দ্বিতীয় সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না, পরের বার গ্রহটা থাকবে শনির পেছনে।
ডিসকভারি ঠিকই তার সাথে দেখা করবে, কিন্তু সাক্ষী হিসেবে বোম্যান নাও থাকতে পারে, কারণ এ অবস্থা ফিরে আসতে কয়েক বছর সময়ের দরকার।
অধ্যায় ৩৫. জ্যাপেটাসের নয়ন
প্রথমবার জ্যাপেটাসকে দেখার সময় সে আধো আলো-ছায়াতে ছিল। এবার ভালমতো দেখা যায়, কারণ সে তার উনআশি দিনের কক্ষপথে এখন সবচে ঝলমলে দিন পোহাচ্ছে।
বোম্যান একটা কথা বলেনি মিশন কন্ট্রোলকে, কিন্তু নিজেকে নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেছে। অবশ্যই, একটু হলেও ডিশনে ভুগছে, মিথ্যা দৃশ্য-মিথ্যা স্মৃতি দেখছে।
যেমন এখন তার মনে হয় পুরো জ্যাপেটাসের পিছনদিকটাই তার দিকে চেয়ে থাকা পাঁপড়িবিহীন এক রাক্ষুসে চোখ। যেন সে গভীর আগ্রহে ছোট্ট ডেভ বোম্যানকে দেখছে। পনের হাজার মাইল দূর থেকে সে চোখের মনিটাও খুঁজে বের করে ফেলে। ছোট্ট, কালো সেই জিনিস এটা।
