কিন্তু এটাও সুদূরের কোন আফ্রিকার পর্বতের কান্নার কারণ নয়। যোগাযোগটা খুবই দূরের।
নিশ্চয়ই অন্য কোন কারণ আছে।
সরাসরি কিছুই বের করা গেল না। এর মোগাযোগ বের করার একমাত্র পদ্ধতি হচ্ছে ব্যাপারটাকে ছেড়ে দেয়া এবং অবচেতন মনের বিস্ময়কর কর্মপদ্ধতির ওপর বিশ্বাস রাখা।
কিলমানজারোকে ভুলে যাবার চেষ্টা করতে হবে, যতদিন না হঠাৎ করে আবার মাথায় জেগে ওঠে।
৩৭. মদিরার শাশ্বত সত্যি
মিরিসার পর কুমার হলো লোরেনের কাছে সবচেয়ে প্রত্যাশিত এবং বেশী আসা অতিথি। তার ডাক নাম যাই হোক না কেন, লোরেনের কাছে তার স্বভাবটা অনেকটা সারমেয় বা সারমেয় ছানার কাছাকাছি। তারনায় বেশ কিছু কুকুর আছে, হয়তো সাগান-২ তেও থাকবে, মানুষের সঙ্গে বহু যুগের বন্ধুত্বের দাবীতে।
লোরেন এখন শুনেছে যে তার জন্য এই ছেলেটা সমুদ্রে কি ভয়ংকর ঝুঁকি নিয়েছিল। তারা শুধু বেঁচে গেছে এইজন্য যে কুমার কখনোই সমুদ্রে ডুবুরীর ছুরি ছাড়া যায় না। তারপরও তাকে সমুদ্রের তলে প্রায় তিন মিনিট থাকতে হয়েছিল। ক্যালিপসোর সবাই ধরে নিয়েছিল যে, তারা দুজনেই মারা গেছে।
তবে নতুন এই বাঁধনে বাধা পড়লেও লোরেন এখনও কুমারের সঙ্গে কোন কথা খুঁজে পায় না। আমার জীবন রক্ষার জন্য ধন্যবাদ, এ কথা সরাসরি বলা খুব মুস্কিল। আর তাদের মধ্যে বিষয়ের ব্যবধান এত বেশী! যদি সে পৃথিবী বা মহাকাশযান সম্পর্কে কিছু বলতে চেষ্টা করে তাহলে সব কিছু এত বিস্তারিত বলতে হয় যে সে হাঁপিয়ে যায় এবং খুব শিগগিরিই আবিষ্কার করে যে পুরোটাই পন্ডশ্রম। কুমার তার বোনের মতো নয়। বর্তমানটাই তার বিশ-থ্যালসাই হচ্ছে তার কাছে। গুরুত্বপূর্ণ। ক্যালডর একবার বলেছিল, সে বর্তমানের বাসিন্দা। অতীতের দুশ্চিন্তা বা ভবিষ্যতের ভাবনায় সে চিন্তিত নয়।
ক্লিনিকে শেষ রাতে ঘুমাবার আগে কুমার এক বিশাল বোতল নিয়ে উৎফুল্ল ভাবে ঢুকল।
১০৮ # দূর পৃথিবীর ডাক
-বলতো এটা কি?
–জানিনা।
–ক্র্যাকানের প্রথম মদিরা। এটা এবছর খুব ভাল হয়েছে।
–তুমি এতসব জানলে কি ভাবে?
-ওখানে আমাদের পরিবারের শত বছরের পুরানো ভাটিখানা আছে। সিংহ ব্র্যান্ড এ পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত।
কুমার দুটো গ্লাস নিয়ে ভর্তি করল। লোরেন একটা সতর্ক চুমুক দিল। একটু বেশী মিষ্টি কিন্তু খুব মসৃণ।
-কি নাম এটার?
–ক্র্যাকান স্পেশাল।
-ক্র্যাকানের ছানা একবার আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। আমার কি ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে।
-তোমার কোন হ্যাং ওভার হবে না।
লোরেন আরেকটু বড় চুমুক দিল। এবং দ্রুত গ্লাস শেষ হয়ে গেল। দ্রুতই আবার তা ভরে গেল।
ল্যাসান হাসপাতালে শেষ রাত লোরেনের আনন্দেই কাটল। মেয়রকেও সে রাতে খারাপ লাগল না।
–আচ্ছা ব্র্যান্ট কোথায়? আমি তাকে সপ্তাহখানেক ধরে দেখছি না।
-সে উত্তর দ্বীপে। জাহাজ মেরামত করছে এবং সমুদ্র প্রাণীবিদদের সঙ্গে কথা বলছে। সবাই কাঁকড়া নিয়ে খুব উত্তেজিত। কিন্তু কেউই বুঝতে পারছে না কি করা উচিত।
-তুমি কি জান ব্র্যান্টের ব্যাপারে আমারও একই অবস্থা।
কুমার হেসে দিল।
–ভেবোনা। উত্তর দ্বীপে সে এক মেয়ের সঙ্গে থাকছে।
–আচ্ছা। মিরিসা জানে?
–অবশ্যই।
–সে দুঃখ পেয়েছে?
–কেন পাবে? ব্র্যান্ট তাকে ভালবাসে এবং সে সবসময়ই ফিরে আসবে।
লোরেন তথ্যটা হজম করল। তার মনে হল সে এক জটিল সমীকরণের একটা বিশাল চলরাশি। মিরিসার কি আরও প্রেমিক আছে? তার কি জানার ইচ্ছা আছে? তার কি জিজ্ঞেস করা উচিৎ?
কুমার গ্লাস ভরতে ভরতে বলল।
-যাহোক। আসল ব্যাপারটা হলো যে তাদের জেনেটিক ম্যাপ গৃহীত হয়েছে। এবং তারা একটা সন্তানের জন্য দরখাস্তও করেছে। সে যখন জন্মাবে তখন ব্যাপারটা অন্যরকম হবে। তখন তারা শুধুই পরস্পরের সঙ্গে থাকবে। পৃথিবীতেও কি একই ব্যবস্থা ছিল?
-কখনো কখনো, লোরেন উত্তর দিল। তাহলে কুমার জানে না। জিনিসটা তবে দুজনের মধ্যেই গোপন থাকুক। অন্তত আমি আমার সন্তানকে দেখতে পাব লোরেন ভাবল। যদিও মাত্র কয়েক মাস তারপর…
অবাক হয়ে সে দেখল তার চোখ বেয়ে অশ্রু নামছে। শেষ কবে সে কেঁদেছে? দুশ বছর আগে। যখন পৃথিবী পুড়ছিল…।
-কি হয়েছে? কুমার জিজ্ঞেস করল। তুমি কি তোমার স্ত্রীর কথা ভাবছ? তার ব্যাকুলতা এতটাই খাঁটি যে লোরেন কিছু মনে করলনা। এ প্রসংগটা নীরব সমঝোতার মাধ্যমে কখনোই তোলা হয় না, কারণ এটা এখানে অপ্রাসংগিক। দুশ বছর আগের পৃথিবী আর তিনশ বছর পরের সাগান-২ থ্যালসা থেকে এতই দূরে যে তা অনুভূতিকে সেভাবে নাড়া দিতে পারেনা।
-না কুমার। আমি আমার স্ত্রীর কথা ভাবছি না…
–তুমি কি তাকে মিরিসার কথা বলবে?
-কি জানি। হয়তো… হয়তো না। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। আমরা কি পুরো বোতলটা শেষ করতে পারি? কুমার? কুমার। রাতে নার্স এলে তাদের দেখে অবাক হয়ে গেল। চাদর দিয়ে তাদের ঢেকে দিল।
লোরেন আগে জাগল। প্রথমে ধাক্কা খেলেও সে হাসতে শুরু করল।
–হাসির কি আছে? বিছানা ছেড়ে নামতে নামতে কুমার জিজ্ঞেস করল।
–তুমি সত্যিই জানতে চাও? আমি ভাবছি মিরিসা হিংসা করবে কিনা?
–আমি কিছুটা মাতাল হতে পারি, কিন্তু আমি নিশ্চিত যে কিছু হয়নি।
–আমিও জানি।
কিন্তু সে এখন জানে যে সে কুমারকে ভালবাসে। এজন্য নয় যে সে মিরিসার ভাই বা তার জীবন রক্ষাকারী। বরং সে কুমার শুধুমাত্র সে জন্যই। যৌনতার কোন সম্পর্ক এখানে নেই। এ ধারণাটা তাদের আনন্দিত করে তুলল। তারা ভালই আছে। যদিও তারনার জীবন ইতিমধ্যেই বেশ জটিল হয়ে গেছে।
