–আমি সেটা ভাবছি না। একটা পাহাড়ের ওপর আমার সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়েছিল।
–দুঃখিত, বুঝলাম না।
–বাদ দাও, ওটা অনেক, অনেক আগের কথা।
পাহাড় থেকে উড়ে যাবার সময় কাজের লোকজন খুশিতে হাত নাড়ল। সব জিনিস নামানো হয়েছে। তারা ল্যাসান প্রজেক্টের প্রাথমিক কাজগুলি করছে। কেউ কেউ চা বানাচ্ছিল। লোরেন সাবধানে এ্যান্টেনার জটিল কাঠামো বাঁচিয়ে উপরে উঠতে লাগল। যদি কোন কাঠামোতে লেগে যায় তাহলে দূরের দুটো দ্বীপের দিকে তাক করা এ্যান্টেনাগুলো অসংখ্য গিগাবাইটা তথ্য হারাবে। আর ল্যাসানরা তখন সাহায্য চাওয়ার জন্যই পস্তাবে।
-তুমি তারনার দিকে যাচ্ছ না?
–কি? ওহ, ক্র্যাকান।
শব্দটা দুটো দিক থেকেই ঠিক। তাদের নীচের মাটি শ’খানেক মিটার চওড়া উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। আর এর চূড়ায় আছে নরক।
নতুন একটা বিশ্বের হৃদয়ের উত্তাপ ঠিক এর নীচেই জ্বলছে। একটা হলদে জ্বলন্ত নদী ধীরে সাগরের দিকে যাচ্ছে। ক্যালডর অবাক হয়ে ভাবল, কিভাবে এরা নিশ্চিত যে আগ্নেয়গিরিটা ঠান্ডা হয়ে গেছে, আর কখনো এটা বিস্ফোরিত হবেনা। তবে লাভার নদীটা তাদের উদ্দেশ্য নয়। এরপর আরেকটা ছোটা খাদ প্রায় কিলোমিটার খানেক চওড়া। যার মাঝে একটা প্রায় ধ্বসে যাওয়া টাওয়ার। কাছে গিয়ে তারা আরও বুঝতে পারল যে, সেখানে মোট তিনটা টাওয়ার ছিল। তবে বাকী দুটোর কেবল ভিত্তিটাই আছে।
খাদের মেঝে ধাতব পাত আর বাঁকানো তার দিয়ে ভর্তি। নিশ্চয়ই এটা সেই বিশাল বেতার প্রতিফলক যা এখানে বসানো হয়েছিল। প্রেরক আর গ্রাহক যন্ত্রটা বৃষ্টির পানি নেমে যাবার পুকুরে পড়ে আছে।
পৃথিবীর শেষ সূত্রের অবশেষ–কেউই কোন কথা বলল না। অবশেষে লোরেন নিস্তব্ধতা ভাঙল।
-এটা ভেঙে গেছে কিন্তু সারানো অসম্ভব নয়। সাগান-২ মাত্র ১২ ডিগ্রি উত্তরে পৃথিবীর চাইতেও কাছে। একটা খারাপ এ্যান্টেনাও লক্ষ্যভেদ করবে।
-দারুণ পরিকল্পনা। আমরা আমাদের বর্ম শেষ করে, তাদের সাহায্য করতে পারি।
অবশ্য তাদের তাড়াহুড়ো নেই, খুব সাহায্যও তাই লাগবে না। আসলে চারশ বছর লাগবে তাদের আমাদের কাছে থেকে আবার তথ্য পেতে– তাও যদি আমরা নেমেই তথ্য পাঠাই।
লোরেন জায়গাটা রেকর্ড করে নিল। প্রায় একহাজার মিটার নামার পর ক্যালডর দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল।
-উত্তরে ধোয়াটা কিসের? একটা সংকেত এর মতো লাগছে।
দিগন্তের মাঝামাঝি, থ্যালসার নীল আকাশের বিপরীতে সাদা একটা স্তম্ভ তৈরী হয়েছে।
কয়েক মিনিট আগেও নিশ্চিত একটা ছিল না।
–চল দেখা যাক। হয়তো কোন বোট সমস্যায় পড়েছে।
–আমার কি মনে হচ্ছে জান? ক্যালডর বলল।
লোরেন একটা শ্রাগ করে উত্তর দিল।
–একটা তিমি। সেগুলো যখন শ্বাস নিতে আসত তা তখন পানির বাস্পের একটা স্তম্ভ তৈরী করত। এটা একদম সেরকম।
-তোমার আকর্ষণীয় তত্ত্বটায় দুটো ভুল আছে। স্তম্ভটা প্রায় কিলোমিটার উঁচু তিমি!
-মানছি এবং তিমিরটা মাত্র কয়েক সেকেন্ড থাকে আর এটা অবিরাম। দ্বিতীয় আপত্তিটা কি?
-চার্ট অনুযায়ী– ওটা কোন মুক্ত পানির এলাকা নয়। অতএব বোটতো নয়ই।
–কি বলছ থ্যালসাতো পুরোটাই সাগর। ও আচ্ছা গ্রেট ইস্টার্ণ প্রেইরী….
–হ্যাঁ ওটা তার প্রান্ত।
–কিন্তু তুমি যেভাবে বললে যেন ওটা কোন জমি।
তারা দ্রুত ভাসমান সামুদ্রিক আগাছার কাছে চলে এল। এগুলো প্রায় সারা সাগর ঢেকে আছে- এবং গ্রহের অক্সিজেন তৈরী করছে। দেখতে প্রায় শক্ত সবুজ পাতের মতো মনে হয় যেন হাঁটা যাবে। কোন পাহাড় বা উঁচু জিনিস না থাকায় এমন অবস্থা।
কিন্তু এক কিলোমিটার দূরে, ভাসমান প্রেইরী–সমতলও নয় বা অবিচ্ছিন্নও নয়। একটা জল ফুটছে যা বাস্পের বিশাল মেঘ তৈরী করছে।
-আমার মনে থাকা উচিত ছিল, ক্যালডর বলল। ক্র্যাকানের সন্তান।
–হুঁ। আমরা আসার পর এই প্রথম এটা সক্রিয় হয়েছে। দ্বীপগুলো তাহলে এভাবে তৈরী হয়েছে।
হ্যাঁ, আগ্নেয়গিরিটি পূবদিকে এগুচ্ছে। কয়েক হাজার বছর পর হয়তো ল্যাসানরা পুরো একটা মহাদেশ পাবে।
তারা আরও কয়েকবার চক্কর দিয়ে পূর্ব দ্বীপের দিকে ফিরল। অধিকাংশ দর্শকের কাছেই একটা ডুবন্ত আগ্নেয়গিরি –যা কিনা জন্মাতে চেষ্টা করছে, খুব একটা দর্শনীয় ঘটনা না।
তবে যে মানুষেরা একটা সৌরজগতের ধ্বংস দেখেছে তাদের কাছে এই জন্ম। একটা ঘটনার চাইতে অনেক বেশী কিছু।
২৩. বরফ দিবস
গত তিনশ বছরের মধ্যে, প্রেসিডেন্টের প্রমোদতরী, অ্যালিয়াস আন্তদ্বীপ ফেরী নং এক, কোনদিন এতো সুন্দর সাজেনি। ফেস্টুন ওড়ানো ছাড়াও এটাকে নতুন সাদা রং করা হয়েছে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে রং বা উৎসাহ যেটার ঘাটতির কারণেই হোক না কেন কাজটা সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। তাই ক্যাপ্টেনকে বাধ্য হয়েই সতর্কভাবে রং করা দিকটাকেই পাড়ের দিকে রেখে নোঙর করতে হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ফারাদীনও বিশেষ উপলক্ষ্য হিসেবে চমকপ্রদভাবে সেজে এসেছেন। মিসেস প্রেসিডেন্টের ডিজাইনে তৈরী পোশাকটিকে রোমান সম্রাট আর প্রথম দিককার নভোচারীদের পোষাকের মিশ্রণ বলা যেতে পারে। এবং তিনি এই পোশাকে যে খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন তাও বোধ হচ্ছে না। ক্যাপ্টেন বে সাদা প্যান্ট, ভোলা গলার জামা, কাঁধের ব্যাজ আর স্বর্ণখচিত ক্যাপ পরে বেশ ভালো বোধ করছিলেন। সম্পূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও কবে শেষ এই পোশাক তিনি পরেছিলেন তা তার খেয়ালও নেই।
