একজন অত্যন্ত বৃদ্ধ ব্যক্তি-থ্যালসায় ড. ভার্লের দেখা সবচে বয়স্ক লোক, রুমের পেছন দিকে আস্তে উঠে দাঁড়ালো। চেয়ারম্যান একটা দ্রুত নোট পাঠালেন, প্রফেসর ডেরেক উইন্সলেড ১১৫-সজেব থ্যাব, বিজ্ঞান-ঐতিহাসিক। ড. ভার্লে ‘সজেব’-এর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর হঠাই তিনি বুঝতে পারলেন ‘সজেব’ মানে হচ্ছে সর্ব জেষ্ঠ্য ব্যক্তি।
তিনি ভাবলেন, এটাই স্বাভাবিক যে ল্যাসান বিজ্ঞানের ডীন কোন ঐতিহাসিকই হবেন। সাতশ’ বছরের ইতিহাসে তিনটা দ্বীপ হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র মৌলিক চিন্তাবিদের জন্ম দিয়েছে।
এটা অবশ্য মেধার সমালোচনা নয়। ল্যাসানদের শূন্য থেকে অবকাঠামো তৈরি করতে হয়েছে। বাস্তব প্রয়োগ নেই এমন কোন গবেষণার সুযোগ বা চেষ্টা ছিল না। এছাড়া আর একটা বড় সমস্যা হল জনসংখ্যা। কোন মৌলিক গবেষণা করার জন্য যতগুলো নূন্যতম মস্তিষ্কের প্রয়োজন তা কখনোই থ্যালসায় পাওয়া সম্ভব নয়।
কেবলমাত্র গণিত-সঙ্গীতের মতোই একটা বিরল ব্যতিক্রম। রামানুজ বা মোজার্টের মতো একজন নিঃসঙ্গ প্রতিভাবান হঠাৎ করে এরকম একটা অদ্ভুত সাগর পাড়ি দেবার ক্ষমতা রাখে। ফ্রান্সিস জোলান (২১৪-২৪২) এমন একজন বিখ্যাত ল্যাসান বিজ্ঞানী। পাঁচশ বছর পরও তার নাম উচ্চারিত হয়। তবে তার সন্দেহাতীত প্রতিভা সমন্ধেও ড. ভার্লের কিছু মন্তব্য আছে। তা হলো, তার পর্যবেক্ষণে, কেউই এখানে হাইপারট্রান্সফিনেট সংখ্যার ওপর তার কাজকে বুঝতেই পারেনি। সেগুলো আর সম্প্রসারিতও হয়নি। সেটা তার মেধাকেই অবশ্য প্রমাণ করে। এমনকি, এখন পর্যন্ত তার শেষ ‘প্রস্তাবিত তত্ত্ব’ কে প্রমাণিত বা অপ্রমাণিত হিসেবে ধরা হয়।
সে সন্দেহ করে। যদিও সেটা তার ল্যাসান বন্ধুদের সামনে খুব সতর্কতার সাথে তুলে ধরে যে জোলানের দুঃখজনক মৃত্যু তার খ্যাতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বেঁচে থাকলে তার মাথা আরও কি বের করত– এই ভেবে। উত্তর দ্বীপে সাঁতার কাটার সময় তার নিখোঁজ হয়ে যাওয়া নিয়ে অনেক রোমান্টিক মিথ আর তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে ভালোবাসায় ব্যর্থতা, প্রতিহিংসা, জটিল আবিষ্কারের ব্যর্থতা, হাইপার ইনফিনেটের ভীতি- অবশ্য কোনটাই আসল সত্যটাকে তুলে ধরে না। তবে সবাই থ্যালসার জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বকে এভাবেই দেখে- সবচে মেধাবী যে কিনা তার সাফল্যের চূড়ায় থেকে বিদায় নিলেন।
বৃদ্ধ প্রফেসর কি বলছেন? ওহহো–সব সময়ই আলোচনার সময় এমন একজনকে পাওয়া যাবে যে কিনা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন বা নিজস্ব কোন তত্ত্ব হাজির রাখবে। সাধারণতঃ একটা হাসি দিয়েই ড. ভার্লে এদের মোকাবেলা করেন। কিন্তু তাকে তো সজেব’, এর প্রতি আরও স্র হতে হবে যেখানে তিনি তার অনুজপ্রতিম সহকর্মীদের মাঝে সম্মানিত আসনে আছেন।
প্রফেসর-অ্যাঁ-উইন্সডেল-“উইন্সলেই”-চেয়ারম্যান ফিসফিসিয়ে বললেন।
অবশ্য ড. ভার্লে জানেন যে কোন শোধরানোর চেষ্টা ব্যাপারটাকে আরও ঘোলাটে করবে।
-আপনার প্রশ্ন খুব ভালো হলেও তা আরেকটা আলোচনার ব্যাপার। বা আসলে অনেকগুলো আলোচনার ব্যাপার। এমনকি তারপরও বিষয়বস্তুটা ভালোভাবে বোঝা যাবে কিনা সন্দেহ।
তবে আপনার প্রথম পয়েন্টটার ব্যাপারে বলছি। এই সমালোচনা প্রায়ই আমরা শুনলেও, জিনিসটা ঠিক নয়। আপনাদের কথামতো কোয়ান্টাম ড্রাইভের গোপন তত্ত্ব আমাদের ভেতরে আমরা লুকিয়ে রাখতে চাইছি–কথাটা ঠিক নয়। পুরো তত্ত্বটা মহাকাশযানের আর্কাইভে আছে।
আপনাদের যে জিনিসগুলো দেয়া হয়েছে তার মধ্যেও তত্ত্বটা আছে।
কিন্তু এটা বলে আমি আপনাদের হতাশ করতে চাই না। মহাকাশযানের কোন ক্রু এই তত্ত্বটা পুরোপুরি বোঝে না। আমরা কেবল এটা ব্যবহার করতে পারি মাত্র। কেবল মাত্র তিনজন বিজ্ঞানী শীতনিদ্রায় আছে যারা এই ড্রাইভের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ। সাগান-২-এ পৌঁছার আগে তাদের জাগিয়ে তোলাটা আমাদের জন্য বিশাল অসুবিধার ব্যাপার।
সুপারস্পেসের জিওমেট্রোডাইনামিক কাঠামোকে দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপ দিতে গিয়ে মানুষ পাগল হতে বাকী থেকেছে। মহাবিশ্ব কেন এগার মাত্রার, যেখানে দশ বা বার মাত্রার সুন্দর সাম্য নেই- এ কথার প্রশ্ন এখনো অজানা। আমি যখন উৎক্ষেপণের প্রাথমিক প্রশিক্ষণে যাই, আমার প্রশিক্ষক বলেছিলেন, “কোয়ান্টাম ড্রাইভ যদি তুমি বুঝতেই পারতে, তাহলে তুমি এখানে আসতেই না। তুমি ল্যাগরেঞ্জ-১ এর অগ্রসর বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে থাকতে। এবং তার এই কথাটা আমাকে ঘুমাতে সাহায্য করেছিল। কারণ টেন টু দি পাওয়ার মাইনাস থার্টি থ্রি সেন্টিমিটার জিনিসটার কল্পনার চেষ্টা আমার দুঃস্বপ্নের ভেতর দেখা দিচ্ছিল।
আমার প্রশিক্ষক আমাকে বলেছিলেন, “ম্যাগেলানের ক্রুরা শুধু ড্রাইভটা কিভাবে কাজ করে সেটা জানবে। বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রকৌশলীদের মতো তাদের কাজ। শক্তিটা কিভাবে ব্যবহার করা যায় এটা জানলেই হবে। শক্তিটা কিভাবে তৈরি হচ্ছে তা জানার দরকার নেই। সাধারণ তেল চালিত ডায়নামো, কিংবা সৌর শক্তি বা জলবিদ্যুতের মতো সহজ ভাবে সেটা তৈরী হতে পারে।
অথবা আরও কোন জটিল ভাবেও বিদ্যুৎ আসতে পারে। যেমন ফিউশন রিএ্যাক্টর, থার্মোনিউক্লিয়র ফিউশন বা মাও ক্যাটালাইজার বা পেনরোজ নোড অথবা হকিং স্করশিল্ড কারনেল-মানে অনেক ভাবেই। কোন এক জায়গায় তাদের বোঝার চেষ্টা ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু তা হলেও তারা প্রত্যেকে যোগ্য প্রকৌশলী, প্রয়োজন মতো তারা বৈদ্যুতিক শক্তি চালু বা বন্ধ করার যোগ্যতা রাখে।
