জ্যোতির্বিদা বাস্তবিকই জ্যোতির্বিজ্ঞান হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্রের মধ্যে অবিরাম গতিতে বিশ্লেষিত হয়ে চলল পার্থক্যের ব্যাপকতা। বহু পরীক্ষানিরীক্ষা এবং নিয়ত গবেষণার মধ্য দিয়ে জ্যোতির্বিদ্যা প্রতিষ্ঠা পেল বিজ্ঞানের অলিন্দে। তৎসহ জ্যোতিষশাস্ত্র অবিজ্ঞান হিসাবে ডাস্টবিনে পরিত্যক্ত হল।
ভারতে দারিদ্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ৪০%, অতি নিম্নবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের সংখ্যাও ৪০%। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মানুষ বাকি শতংশের মধ্যে পড়ে। ৫% উচ্চবিত্ত ধরলে ১৫% মধ্যবিত্ত –এরা বেশ সচ্ছল প্রজাতির। দেখা যায় মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরাই মূলত জ্যোতিষের সমর্থক। বহু বছর আগে ‘ফলিত জ্যোতিষ’ শিরোনামে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী লিখেছেন –“কোনও একটা ঘটনার খবর পাইলে সেই খবরটা কি না এবং ঘটনাটা প্রকৃত কি না তাহা ……জানিবার অধিকার বিজ্ঞানবিদদের প্রচুর পরিমাণে আছে। এই অনুসন্ধান। কার্যই বোধ করি তাঁর প্রধান কার্য। প্রকৃত তথ্য নির্ণয়ের জন্য তাঁহাকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। … তিনি অতি সহজে অত্যন্ত ভদ্র ও সুশীল ব্যক্তিকেও বলিয়া বসেন, তোমর কথায় আমি বিশ্বাস করিলাম না। … নিজের উপরেও তাঁর বিশ্বাস অল্প। … কোথায় কোন্ ইন্দ্রিয় তাঁহাকে প্রতারিত করিয়া ফেলিবে …… এই ভয়ে তিনি সর্বদা আকুল। …..ফলিত জ্যোতিষে যাঁহারা অবিশ্বাসী তাঁহাদিগের সংশয়ের মূল এই। তাঁহারা যতটুকু প্রমাণ চান ততটুকু পান না। তাহার বদলে বিস্তর কুযুক্তি পান। …. একটা ঘটনার সহিত মিলিলেই দুন্দুভি বাজাইব। আর সহস্র ঘটনার যাহা না মিলিবে তাহা চাপিয়ে যাইব, অথবা গণকঠাকুরের অজ্ঞতার দোহাই দিয়া উড়াইয়া দিব এরূপ ব্যাবসাও প্রশংসনীয় নহে। …একটা সোজা কথা বলি। ফলিত জ্যোতিষকে যাঁহারা বিজ্ঞানবিদ্যার পদে উন্নীত দেখিতে চাহেন তাঁহারা এইরূপ করুন। প্রথমে তাঁহাদের প্রতিপাদ্য নিয়মটা খুলিয়া বলুন। মানুষের জন্মকালে গ্রহনক্ষত্রের স্থিতি দেখিয়া কোন্ নিয়মে গণনা হইতেছে তাহা স্পষ্ট ভাষায় বলিতে হইবে। … ধরি মাছ না ছুঁই পানি হইলেও চলিবে না। তাহার পর হাজার খানেক শিশুর জন্মকাল ঘড়ি ধরিয়া দেখিয়া প্রকাশ করিতে হইবে; এবং পূর্বের প্রদত্ত নিয়ম অনুসারে গণনা করিয়া তাহার ফলাফল স্পষ্ট ভষায় নির্দেশ করিতে হইবে। ….. পূর্বে প্রচলিত ফলাফলের সহিত প্রত্যক্ষ ফলাফল মিলিয়া গেলেই ঘোর অবিশ্বাসীও ফলিত জ্যোতিষে বিশ্বাসে বাধ্য হইবে। হাজারখানা কোষ্ঠীর মধ্যে যদি নয়শো মিলিয়া যায় তবে মনে করিতে হইবে যে ফলিত জ্যোতিষে অবশ্য কিছু আছে। যদি পঞ্চাশখানা মার মেলে তবে মনে করিতে হইবে, তেমন কিছু নাই। হাজরের বলে যদি লক্ষটা মিলাইতে পারো, আরও ভালো। সহস্র পরীক্ষাগারে ও মানমন্দিরে বৈজ্ঞানিকেরা যে রীতিতে ফলাফল গণনা ও প্রকাশ করিতেছেন সেই রীতি আশ্রয় করিতে হইবে। কেবল নেপোলিয়নের ও বিদ্যাসাগরের কোষ্ঠী বাহির করিলে অবিশ্বাসীর বিশ্বাস জন্মিবে না। চন্দ্রের আকর্ষণে জোয়ার হয়, তবে রামকান্তের জজিয়তি কেন হইবে না, এরূপ যুক্তিও চলিবে না।”
জ্যোতিষী নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দের অভিমত : “জ্যোতিষে বিশ্বাস সাধারণত দুর্বল মনের লক্ষণ। সুতরাং মনে এরকম দুর্বলতা এলেই আমাদের উচিত সুচিকিৎসক দেখিয়ে ভালোভাবে ওষুধ খাওয়া, ভালো পথ্য খাওয়া। আর বিশ্রাম করা।” বলেছেন –“In many cases it is simply mind-reading some times wonderful predictions are made, but in many cases it is arrant trash.”
এহেন বিষয়কেই ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে রেখে যুবকযুবতীদের স্বনির্ভরতার সন্ধান দিতে আগ্রহী হয়ে পড়েছে। এরপর কি ডাইনি বিদ্যা, ভূত প্রেত-জিন চর্চা, ডাকিনী চর্চা, ওঝা-গুণিন বিদ্যা, কালাজাদু, ঝাড়ফুঁক বিদ্যা, তেল-পড়া, জল-পড়া, বাটি চালান, ক্ষুর চালান, বশীকরণ বিদ্যাও সিলেবাসে আনবেন? অবাক হব না। কারণ আদি যুগ থেকে রাষ্ট্রই এইসব বিষয়ের পৃষ্ঠপোষক। রাষ্ট্রকে নির্বিঘ্নে থাকতে হলে নিয়তী বা অদৃষ্টবাদকে প্রতিপালন করতে হবে। তাই পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই অবিশ্বাসী বা নাস্তিকদের সুরক্ষা দেয় না, আস্তিকদের মদত জোগান। নাস্তিকরা এইসব অবৈজ্ঞানিক বিষয়গুলোর সমালোচনা করলে সবক শেখাতে চান। বলেন– অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কথা নাস্তিকদের বলা উচিত হয়নি। আস্তিকরা নাস্তিকদের উপর হামলা করলে রাষ্ট্র প্রায় নির্লিপ্ত থাকে। এবার ইউজিসির কথা একটু উল্লেখ করা যাক ইউজিসি (University Grant Commission) বলছেন–জ্যোতিষ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে তিন বছরের স্নাতক পাঠক্রম এবং দুই বছরের স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণাভিত্তিক পাঠক্রম চালু করবেন। আর এই জ্যোতিষচর্চায় নতুন নামকরণ করা হবে জ্যোতির্বিজ্ঞান। অ্যা, হাসবেন না কাঁদবেন! আরও শুনুন –উৎসাহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে দেওয়া হবে এককালীন ১৪ লক্ষ টাকা। দেওয়া হবে জ্যোতিষবিদ্যার উপযুক্ত সরঞ্জাম কেনার জন্য। ইউজিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী সেইসব জ্যোতিষ বিভাগে একজন অধ্যাপক, দুইজন লেকচারার, একজন লাইব্রেরিয়ান এবং একজন কম্পিউটার চালক থাকবেন। এর ফলে যদি দেশে কুড়িটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই পাঠক্রম চালু করা হয় তাহলে এই পাঁচজনের জন্য বাৎসরিক খরচ হবে ১ কোটি টাকা। বুজরুকি জারি রাখার জন্য এত অর্থের অপচয়! এ সংবাদ শুনে ভারতের অগ্রগণ্য পদার্থবিদ ও ইউজিসির প্রাক্তন চেয়ারম্যান অধ্যাপক যশপাল ক্ষোভ করে বললেন–”এ খবর শুনে আমি মর্মাহত। এ এক নিদারুণ লজ্জা, এক কলঙ্ক। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি ইউজিসির সভ্যদের মতোই আজ এদেশে মশা মাছির মতো অজ্ঞানদের অভাব নেই।” বেঙ্গালুরু রামন রিসার্চ সেন্টারের বৈজ্ঞানিকগণও একসুরে বললেন– “পশ্চাদে এগিয়ে চলার এ এক বিরাট পদক্ষেপ। এরপরে ভারতের বৈজ্ঞানিক গবেষণার আর কোনো মূল্যই রইল না।” ইন্ডিয়ান ডেমোক্র্যাটিক টিচার্স ফ্রন্টের বক্তব্য– “এই প্রস্তাব অবান্তর, হাস্যকর এবং ভয়ংকরও।”
