জ্যোতিষবাবুদের ব্যাবসায়িক প্রবণতার কারণে প্রচার হয়েছে, রুদ্রাক্ষ যে-কোনো ধর্মের এবং যে-কোনো বয়সের নারী-পুরুষই ধারণ করতে পারে। গলায়, বাজুতে এবং কবজিতে। প্রচার হয়েছে গাছের তলায় পড়ে থাকা রুদ্রাক্ষ ব্যবহার্য নয়, গাছ থেকে চয়ন করতে হবে তবেই কাজে দেবে। রুদ্রাক্ষের লাল কালো হলুদ ধূসর নানা রং এবং এর সঙ্গে গ্রহ নক্ষত্রের প্রভাব, পাপস্খলন, দাম্পত্য জীবনে সুখ, ব্যাবসায়িক সাফল্য ইত্যাদি বিষয়গুলিকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে, যার পরিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সম্পর্কে আমরা অজ্ঞাত।
অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছাড়া রুদ্রাক্ষ ও ভদ্রাক্ষ নির্ণয় করা কঠিন ব্যপার। বাজারে নকল রুদ্রাক্ষ প্রায় ৯৮ শতাংশ। ২ শতাংশ খাঁটি রুদ্রাক্ষ ব্যবহার উপযোগী, তাও অনেক মূল্য। বিশেষ প্রক্রিয়ায় কাঠের গুড়ার সঙ্গে লোহা, সিসা, গ্যালিলিথ নামক রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রণ করে রুদ্রাক্ষ তৈরি করা হয়, যার বড়ো বাজার হচ্ছে নেপাল, বোম্বে ও বাঙ্গালোরে সহ গোটা বিশ্বে। যেহেতু নেপালে রুদ্রাক্ষ বৃক্ষ জন্মে, তাই বিদেশিরা মনে করে থাকেন নেপালেই খাঁটি রুদ্রাক্ষ পাওয়া যায়। নেপালে ব্যবসায়ীরা ৩/৪ হাজার টাকায় খাঁটি রুদ্রাক্ষের একটি পিসও সরবরাহ করতে পারেন না অপরদিকে ৮/৯ টাকায় নকল পেয়ে যাবেন। আগে নকল জিনিস চেনার চেষ্টা করতে হবে, কারণ নকল না চিনলে নকল সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে আসল চেনা যায় না। খাঁটি রুদ্রাক্ষের দানাতে ৫০.০৩১% কার্বন, ০.৯৫% নাইট্রোজেন, ১৭.৮৯% হাইড্রোজেন এবং ৩০.৫৩% অক্সিজেন বিদ্যমান। ভালো বা আসল রুদ্রাক্ষ চেনার উপায় বা লক্ষণ– যে রুদ্রাক্ষ সবদিকে সমান, কোথাও বিকৃত, বাঁকা, উঁচু-নীচু বা ভাঙ্গা-চোরা নেই সেই রুদ্রাক্ষ সব থেকে ভালো। এর কিনারাগুলি বেশ স্পষ্ট থাকবে আর গায়ের কাঁটা কাঁটা দাগগুলি বাইরে বেরিয়ে থাকে। যে রুদ্রাক্ষ জলে ডুবে যায়, দুটো তামার টুকরোর মধ্যে রাখলে ঘুরতে থাকে উজ্জল ও ভারী হয় এমন রুদ্রাক্ষ সবচেয়ে ভাল। একে সর্বোত্তম বলে মানা হয়। এই রুদ্রাক্ষ সবচেয়ে বেশি উপকারী। হিসাবে বলা যায়। কবিরাজি মতানুসারে যে ব্যক্তি রুদ্রাক্ষ সঠিক নক্ষত্র, তিথি, সময় অনুযায়ী ধারণ করেন তার কোনো রোগ হতে পারে না। সেকি, পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষ যদি সকলেই রূদ্রাক্ষ ধারণ করে বসে থাকে তবে তো সব চিকিৎসকদের চিকিৎসা ছেড়ে আকাশের তারা গুণতে হবে! বিশ্বাসীদের ধারণা– রুদ্রাক্ষের ক্ষমতা, ধারণ করার নিয়ম, পুজো মন্ত্র যা সঠিকভাবে অনুসরণ করলে মানুষের জীবনে শান্তি আসবেই। বাপ রে, এদের তো ধরে দশ-পাঁচটা নোবেল দিয়ে দেওয়া দরকার।
জ্যোতিষবাবুরা বলেন যেমন মুখ, তেমন ফল। এটাই মানুষের বিশ্বাস। যেমন ধরুন–
(১) সপ্তমুখী রুদ্রাক্ষ: এই শ্রেণির রুদ্রাক্ষের নাম ‘অনন্ত মাতৃকা’। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে সামাজিক প্রতিষ্ঠা, অর্থ মান, যশ ও প্রতিপত্তি লাভের পথ সুগম হয়ে থাকে। রাশিচক্রে রাহুগ্রহ রবি ও চন্দ্র যুক্ত হয়ে লগ্নে দ্বিতীয়ে, চতুর্থে, পঞ্চমে, ষষ্ঠে, সপ্তম, অষ্টমে, নবম, দশমে এবং দ্বাদশে অবস্থান করলে বা কোনোভাবে অশুভ হলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উক্ত রুদ্রাক্ষ উজ্জীবন করতে হয়। ১০৮ বার মন্ত্র জপ করে উক্ত রুদ্রাক্ষ কণ্ঠে ধারণ করলে রাহু গ্রহের সমস্ত কুফল বিনষ্ট হয় অনেকের বিশ্বাস।
(২) অষ্টমুখী রুদ্রাক্ষ: এই রুদ্রাক্ষের দুটি নাম ‘বিনায়ক’ ও ‘বটুকভৈরব’। শনিগ্রহ ও রাহুর অশুভ প্রভাব খর্ব করে। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে হঠাৎ আঘাত পাওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। দুষ্কৃতকারীদের হাতে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। রাশিচক্রে শনি ও রাহু অশুভ থাকলে উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধি সংস্কারপূর্বক পুরুষের ডান বাহুতে এবং স্ত্রীলোকের বাম বাহুতে ধারণীয়। এ রূপে বিনায়ক মন্ত্র পাঠ করে বা বটুক ভৈরব মন্ত্র এ মন্ত্রে বটুক ভৈরবের পুজো করে এবং পরে জপ করে ও পরে বীজমন্ত্র জপ করে উক্ত রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে সমস্ত অশুভ প্রভাব দূরীভূত হয়।
(৩) নবমুখী রুদ্রাক্ষ: এই রুদ্রাক্ষের অন্য নাম ‘মহাকাল ভৈরব’। ধারণে জীবনে উন্নতির সূচনা যায়, সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও জয়লাভ করা হয়। দুর্ঘটনা ও হঠাৎ মৃত্যুর হাত থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। ধারণের পূর্বে মন্ত্র উচ্চারণ করে এ রুদ্রাক্ষের উজ্জীবন বা প্রাণসঞ্চার করে নিতে হয়। মন্ত্র পাঠের পর উচ্চারণ করতে হয়। বুদ্ধিবৃত্তিজনিত কাজকর্মের ক্ষেত্রে নানাভাবে প্রচুর সুফল দান করে এ রুদ্রাক্ষ। রাশিচক্রে বৃহস্পতি গ্রহ মকরে নীচস্থ, মকরস্থানে অবস্থান করলে, বা মারকস্থ হলে এবং ষষ্ঠ, অষ্টম, দ্বাদশ স্থানে অবস্থান করলে কিংবা কোনোভাবে অশুভ হলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উপরোক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধ সংস্কার পূর্বক ধারণের পর মন্ত্র জপ করে ‘বৃহস্পতয়ে’ এ বীজমন্ত্র জপের পর পুরুষের দক্ষিণ বাহুতে এবং স্ত্রীলোকের বামবাহুতে ধারণ করলে সকল অশুভ বিনাশ হয়।
(৪) দশমুখী রুদ্রাক্ষ: এ শ্রেণির রুদ্রাক্ষ দুর্লভ। এর অন্য নাম ‘মহাবিষ্ণু’। মর্যাদা, প্রতিষ্ঠা, সুনাম, খ্যাতি, সম্মান, পার্থিব সমৃদ্ধি, কর্মদক্ষতা এবং ব্যাবসায়িক সাফল্য অর্জনে সহায়ক এ রুদ্রাক্ষ। প্রেতাদি কর্তৃক অনিষ্টকর প্রভাব থেকেও মুক্ত হওয়া যায়। রাশিচক্রে বুধ গ্রহ নীচস্থ শযুক্ত ও শত্রুক্ষেত্রগত, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ, অষ্টম ও দ্বাদশ স্থানে অবস্থান করলে বা কোনোভাবে পীড়িত হলে উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধি মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক সংস্কার করে ধারণ করতে হয়। মন্ত্র পাঠ ও জপ করে জপের পর উক্ত রুদ্রাক্ষ কণ্ঠে ধারণ করলে সমস্ত অশুভ দূরীভূত হয়।
