কাকে বলবেন! ভূত তো সরষের মধ্যেই ঢুকে বসে আছে। আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে তাবড় তাবড় শিক্ষিতজন বিজ্ঞানীরা পর্যন্ত জ্যোতিষ বিশ্বাস করে, এরাও কোনো যুক্তি-ব্যাখ্যা-কার্য-কারণের ধার ধারে না। এ যেন আর্ক লাইটের নীচে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজের গায়ে কালি ঢেলে দেওয়া। সেই কারণে এরাও দিন-ক্ষণ-তিথি-নক্ষত্র বিচার করেই বিয়ে-শ্রাদ্ধ-অন্নপ্রাশন গৃহপ্রবেশ করে থাকেন। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীও দিন-ক্ষণ মেনেই প্রধানমন্ত্রীর সিংহাসনে বসেন। চলচ্চিত্রের পরিচালক- অভিনেতাও দিন-ক্ষণ দেখেই শুভ মহরৎ করেন। এমনকি সেই মুভি যদি জ্যোতিষ ও জ্যোতিষীদের বিরুদ্ধেও হয়, সেটাও দিন-ক্ষণ দেখেই হবে। দিন-ক্ষণ-তিথি-নক্ষত্রের কথাই যখন উঠল, তাহলে বাঙালিদের একমাত্র প্রিয় গ্রন্থ ‘পঞ্জিকা’ নিয়ে আলোকপাত করা যাক। এমন একটি বাঙালি হিন্দুঘর পাওয়া যাবে না, যাঁর ঘরে ‘পঞ্জিকা নেই। অবশ্য শুধু বাঙালি-হিন্দু নয়, ভারতের অন্যান্য প্রদেশেও ‘শুভদিন’ দেখার প্রথা আছে।
বর্ষপঞ্জি বা পঞ্জিকাকে বাদ দিয়ে ধর্মপ্রাণা ভিতু মানুষদের এক দণ্ডও চলে না। জ্যোতিষবাবুদের মতে ‘পঞ্জিকা বছরের প্রতিদিনের তারিখ, তিথি, শুভাশুভ ক্ষণ, লগ্ন, যোগ, রাশিফল, বিভিন্ন পর্বদিন ইত্যাদি সংবলিত গ্রন্থ। একে পঞ্জি বা পাঁজিও বলা হয়। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে একে বলা হয়েছে ‘পঞ্চাঙ্গ। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও এটি এই নামে পরিচিত। এর কারণ এতে বার, তিথি, নক্ষত্র, যোগ ও করণ প্রধানত এই পাঁচটি অঙ্গ থাকে। বাংলায় অবশ্য এটি ‘পঞ্জিকা’ নামেই সুপরিচিত। সভ্যতা বিকাশের শুরু থেকেই সমাজসচেতন ব্যক্তিদের চিন্তা-চেতনায় কালবিভাগের ধারণাটি আসে। প্রয়োজনের তাগিদে তখন বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন উপায়ে বছর, মাস, দিন ও তারিখ গণনার কৌশল আবিষ্কৃত হয়। কালক্রমে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের পাশাপাশি পূজা-পার্বণের সময় নিরূপণও পঞ্জিকা প্রণয়নের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। কালনিরূপণে বিভিন্ন দেশে ভিন্নরকম পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। বৈদিক যুগের ঋষিরা বিভিন্ন ঋতুতে নানারকম পূজা-পার্বণ করতেন। সেই কারণে তাঁরা বিশেষ ঋতুবিভাগের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করেন। এসব উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তাঁরা ঋতুভিত্তিক বছর হিসাব করে বছরকে উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ন এই দু-ভাগে ভাগ করতেন। সূর্য উত্তরদিকে আগমন করা থেকে উত্তরায়ণ এবং দক্ষিণদিকে যাত্রা করা থেকে দক্ষিণায়ন গণনীয় হত। প্রাচীন মনীষিগণ বছরকে বারো ভাগে বিভক্ত করেন। যেমন– তপঃ, তপস্যা, মধু, মাধব, শুক্র, শুচি, নভস্, নভস্য, ইষ, ঊর্জ, সহস্ ও সহস্য। তপঃ থেকে শুচি পর্যন্ত উত্তরায়ণ এবং নভস্ থেকে সহস্য পর্যন্ত দক্ষিণায়ন। অনুমান করা হয় যে, এরূপ সময়বিভাগ যর্জুবেদের কালে (১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে) প্রচলিত ছিল। তিথির প্রচলন হয় অনেক পরে। শুধু সেই সময়কালে পূর্ণিমা, অমাবস্যা ও অষ্টকা ব্যবহৃত হত। কৃত্তিকা নক্ষত্র থেকে গণনা করে ২৭টি বা ২৮টি নক্ষত্রে ভূচক্রকে বিভক্ত করা হত। এটাই এতদঞ্চলের পঞ্জিকা গণনার আদিরূপ। বৈদিক সাহিত্যে ফাল্গুনী পূর্ণিমার উল্লেখ পাওয়া যায়। এতে অনুমিত হয় যে, তখন চান্দ্রমাস গণনার প্রচলন ছিল, যা পূর্ণিমান্ত মাস নামে পরিচিত।
১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি পঞ্জিকায় বছর আরম্ভ হত উত্তরায়ণ দিবস থেকে এবং তাতে ১২টি চান্দ্রমাস ব্যবহৃত হত। এই পঞ্জিকায় ৩০টি তিথি এবং ২৭টি নক্ষত্র গণনার নিয়ম ছিল। তখন প্রতি পাঁচ বছরে একটি যুগ গণনা করা। হত এবং এক যুগ পরপর এই পঞ্জিকা গণনার পদ্ধতি আবর্তিত হত। ওই সময় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তিথ্যন্ত প্রভৃতি কাল গণনার পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়নি। মাত্র মধ্যমমানে প্রতিদিন এক তিথি এক নক্ষত্র এই হিসেবে তিথ্যাদি নির্ণয় করা হত এবং মাঝে মাঝে এক-একটি তিথি হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হত। পঞ্চবর্ষাত্মক যুগ ব্যতীত কোনো অব্দ গণনার প্রথা তখনও প্রবর্তিত হয়নি। দেড় হাজার বছর ধরে কালগণনা ও পূজা-পার্বণের সময় নিরূপণের কাজে এরূপ বেদাঙ্গজ্যোতিষ পঞ্জিকা খুবই সমাদৃত ছিল। গবেষকরা খ্রিস্টীয় চতুর্থ বা পঞ্চম শতকে তাঁরা সূক্ষ্ম গণনার কৌশল আয়ত্ত করেন। এসব বিষয়ে যাঁরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তাঁরা হলেন আর্যভট্ট, বরাহমিহির, ব্ৰহ্মগুপ্ত প্রমুখ। তাঁরা পঞ্জিকার গণনাকে জ্যোতির্বিদ্যার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং তিথ্যাদির সূক্ষ্ম কালগণনার সূত্রাদি দ্বারা দৈনিক গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান, লগ্ন, ক্ষণ, তিথি প্রভৃতির পূর্তিকাল পঞ্জিকার মধ্যে পরিবেশনের ব্যবস্থা করেন। এতে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সহজেই পঞ্জিকা থেকে পাওয়া যেত। এক্ষেত্রে সূর্যসিদ্ধান্ত জ্যোতির্বিদ্যার একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও মূল্যবান গ্রন্থ। পরে সূর্যসিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পঞ্জিকার সবকিছু গণনা করা হত। পঞ্জিকার মধ্যে তখন স্থান পেত বার, তিথি, নক্ষত্র, যোগ ও করণযুক্ত প্রতিদিনের পঞ্চাঙ্গ এবং তা তালপাতায় লিপিবদ্ধ করে গণকঠাকুর বা ব্রাহ্মণরা বছরের প্রারম্ভে গ্রামে-গঞ্জে গিয়ে মানুষদেরকে অবহিত করতেন বা জনগণের সুবিধার্থে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এর অনুলিপি সংরক্ষণ করতেন। এসবের ভিত্তিতে পূজা-পার্বণাদি বা ধর্মকৃত্য সাধনের কালও নির্ণয় করা হত।
