হযরত মুহম্মদ (সঃ) এখন ফুরসত পেলেন এবং নিজ আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্রতী হলেন। অনেক সময় দেখা যেত, তিনি নিরালায় চিন্তা করছেন অথবা মক্কার বাইরের একটি পাহাড়ের গুহায় ধ্যানমগ্ন আছেন। একদা এইরূপ ধ্যানস্থ অবস্থায় যখন তার চিত্ত সংশয় ও সত্যের আকুল সন্ধানে উদ্বেলিত ছিল সেই সময় তিনি শুনলেন, কে তাকে আদেশ করছে?
সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নামে আবৃত্তি কর (কোরআন ৯৬ : ১)। মহানবী তার আহ্বান পেয়েছেন। কিছুদিন চলে গেল। তিনি তাঁর দ্বিতীয় আহ্বান পেলেন। বিপুল আবেগ ভারে পীড়িত হয়ে তিনি সভয়ে সত্বর গৃহে চলে গেলেন এবং তার স্ত্রীকে বল্লেন-‘আমাকে ঢেকে দাও আমাকে ঢেকে দাও।’ তখন অবতীর্ণ হল এই ওহীঃ ‘হে বস্ত্রাবৃত পুরুষ! ওঠ এবং হুঁশিয়ার কর’ (কোরআন ৭৪১)। আহ্বানের আওয়াজ একরকম ছিল না, কখনো ঘণ্টা-ধ্বনির মত কানে আসত। পরে সমস্ত আওয়াজ এক কণ্ঠস্বরে পরিণত হল : জিবরাইলের কণ্ঠস্বর।
আরবী হযরত মুহম্মদের (সঃ) বাণী আর ওল টেস্টামেন্টের হিব্রু পয়গম্বরদের বাণী একইরকম ছিল : আল্লাহু এক। তিনি সর্বশক্তিমান। তিনি বিশ্বের স্রষ্টা। বিচারের দিন আছে। যারা আল্লাহর আদেশ পালন করে তাদের জন্য বেহেস্তে বেশুমার পুরস্কার–যারা সে আদেশ লঙ্ঘন করে তাদের জন্য দোজখে ভয়াবহ শাস্তি। তাঁর প্রথম দিকের বাণীর এই-ই সংক্ষিপ্তসার। হযরত মুহম্মদ (সঃ) মনে করলেন, তিনি এক পবিত্র ব্রত সাধনে আদিষ্ট হয়েছেন। তিনি অনুভব করলেন, আল্লাহ্র পয়গম্বর হিসেবে তাকে এ মহান ব্রত উদযাপন করতে হবে। অপার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি তার আপন লোকদের কাছে গিয়ে তাঁর নতুন বাণী প্রচার শুরু করলেন। তারা তাকে বিদ্রুপের হাসিতে উড়িয়ে দিল । তিনি তাদের সাবধান করতে লাগলেন : বিচার দিনের কথা বলতে লাগলেন, বেহেস্তের সুখের এবং দোজখের দুঃখের জ্বলন্ত রোমাঞ্চকর বর্ণনা দ্বারা তাদের মন জয় করতে চেষ্টা করতে লাগলেন; এমন কি আন্ন গজবের ভয়ও দেখাতে শুরু করলেন। তাঁর বর্ণিত প্রাথমিক ওহীগুলি সংক্ষিপ্ত, সুন্দর এবং হৃদয়গ্রাহী ছিল। কিন্তু অতিঅল্প লোকই তার ধর্মমত গ্রহণ করতে এল। তার স্ত্রী খাদীজা, তার চাচাতো ভাই আলী এবং তার জ্ঞাতি আবুবকর তার মতে দীক্ষা নিলেন। কিন্তু কোরায়েশদের আভিজাত্য-অভিমানী প্রভাবশালী শাখা অটল রয়ে গেল। তবে আস্তে আস্তে প্রধানতঃ গোলাম এবং নিম্ন শ্রেণীর মধ্য হতে লোক এসে বিশ্বাসীদের দল ভারী করতে লাগল। কোরায়েশরা দেখল, এতকাল তারা যে ঠাট্টা-বিদ্রুপের বাণ বর্ষণ করেছে, তা কার্যকরী হয় নাই। কাজেই দস্তুরমত যুলুম করার প্রয়োজন উপস্থিত হয়েছে। এই অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে মক্কার এগারটি নব দীক্ষিত পরিবার আবিসিনীয়ায় হিযরত করতে বাধ্য হল। ৬১৫ খৃস্টাব্দে আরো তিরিশজন তাদের পথ অনুসরণ করল। আবিসিনীয়ার খৃস্টান রাজা নাজ্জাসী মুহাজিরদের তাঁর পক্ষপুট-তলে আশ্রয় দিলেন। কোরায়েশ অত্যাচারীরা তাদের হাতে মুহাজিরদের ফেরত দেওয়ার জন্য নাজ্জাসীকে অনুরোধ করে পাঠাল। কিন্তু নাজ্জাসী তার আশ্রিতদের দুশমনের হাতে তুলে দিতে অস্বীকার করলেন। এতগুলি অনুগামীকে হারিয়েও হযরত মুহম্মদ (সঃ) বিচলিত হলেন না। তিনি নির্ভীকভাবে প্রচার করে চলেন এবং বুঝিয়ে সুঝিয়ে বহু দেবতার পূজা হতে তাদের নিবৃত্ত করে এক আল্লাহ্র এবাদতে প্রবৃত্ত করতে চেষ্টা করতে লাগলেন। ওহী অবতীর্ণ হতে লাগল।
অল্পকাল মধ্যেই ওমর-ইবনুল-খাত্তাব এসে ইসলামে দীক্ষা গ্রহণ করলেন। পরবর্তীকালে ইনি ইসলামী রাষ্ট্র গঠনে কি বিপুল দানই না করেছিলেন। এই সময়ের মধ্যেই ঘটে এক রোমাঞ্চকর নৈশ-ভ্রমণ। কথিত আছে? হ্যরত মুহম্মদ (সঃ) চোখের পলকে গেলেন বায়তুল মোকাদ্দেস এবং সেখান হতে তিনি গেলেন সপ্তম আসমানে। বায়তুল মোকাদ্দেস (জেরুমালেম) আগে হতেই ইহুদী ও খৃষ্টানদের নিকট পবিত্র স্থান ছিল। যেহেতু এই নৈশ-ভ্রমণ কালে এস্থান হতে মহানবী আসমানে গমন করেন, এই জন্য মুসলমানদের চোখে মক্কা-মদীনার পরই আজো বায়তুল মোকাদ্দেস সবচেয়ে পবিত্র স্থান। এই অলৌকিক ভ্রমণ কাহিনীতে পরবর্তীকালে অনেক নতুন কথা যোগ করা হয়েছে এবং এই পরিবর্ধিত আকারে ইহা আজো পারস্য ও তুরস্কের মরমী-মহলে সমাদৃত হয়ে আসছে। একজন স্পেনীয় পণ্ডিত বলেন, এই কাহিনীই দান্তের ‘ডিভাইন কমেডী’র মূল উৎস। ফিলিস্তিনে ১৯২৯ সালের আগস্ট মাসে যে ভয়াবহ দাঙ্গা হয়, তা থেকেই বোঝা যায় যে, ইসলামে এ ভ্রমণের স্মৃতি আজো কত জীবন্ত ও শক্তিশালী। ইহুদীদের ক্রন্দনমান দেয়াল’-কে কেন্দ্র করে এই দাঙ্গা বেঁধে ওঠে। কেউ কেউ মেনে করে, যে বোরাকে সওয়ার হয়ে মহানবী উক্ত নৈশ-ভ্রমণ করেন, সে অপরূপ ঘোড়া এইখানে কিছুকাল অবস্থান করেছিল।
এই অলৌকিক ভ্রমণের দুইবছর পর প্রায় পঁচাত্তরজন লোকের একটি প্রতিনিধি দল হযরত মুহম্মদকে (সঃ) মদীনায় গিয়ে বাস করতে দাওয়াত করে। মদীনার ইহুদীরা একজন মসিহ্’-এর জন্য প্রতীক্ষা করছিল এবং তাদের প্রতিমা-পূজক প্রতিবেশীদের মনকে অমন একজন ধর্ম প্রচারকের আবির্ভাবের জন্য তৈরি করে রেখেছিল। মদীনা ছিল হযরত মুহম্মদের (সঃ) মায়ের শহর। তিনি তাঁর দুইশ’ অনুগামীকে কোরায়েশদের নজর এড়িয়ে চুপচাপ মদীনায় চলে যেতে অনুমতি দিলেন। তিনি নিজে সেখানে ৬২২ খৃস্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর গিয়ে হাজির হলেন। এই-ই ছিল বিখ্যাত হিযরত । হিযরত পুরোপুরি পলায়ন ছিল না। এ ছিল দুই বছরের সুচিন্তিত পরিকল্পনার ফল। যে চান্দ্র বছরে এই হিযরত ঘটে সতর বছর পরে খলীফা ওমরের নির্দেশমত সেই বছর হতে মুসলমানদের সরকারী অব্দ গণা শুরু হয়।
