লওয়েল টমাস কর্ণেল টমাস লরেন্সের নিম্ন বিবৃতি উদ্ধৃত করে তার বক্তৃতা শুরু করতেন :
একদা আমি জেরুজালেমের খ্রিস্টান পাড়ায় ঘুরছিলাম। এই সময় আমি মূল্যবান পোশাক ও অলঙ্কার সজ্জিত এক ব্যক্তিকে দেখতে পাই। তার কোমরে ঝুলছিল স্বর্ণনির্মিত তরবারি। এরূপ একমাত্র হজরত মোহাম্মদ (দঃ)-এর অনুসারীরা ব্যবহার করেন। কিন্তু এই লোকটি আরব ছিলেন না। তার চেহারা আরবদের মতো নয়। চোখ নীল, কিন্তু আরবদের চোখ নীল নয়, কালো বা ব্রাউন।
এই বক্তব্য কী আপনার মনে কৌতূহল জাগায় না? নিশ্চয়ই আপনি লোকটা সম্পর্কে আরো জানাতে চান। সে কে? কেন সে আরবদের মতো চলতো? সে কী করত? তার কী হল?
যে ছাত্র নিম্ন প্রশ্ন দিয়ে তার বক্তব্য শুরু করে :
আজকের বিশ্বের সতেরটি দেশে যে দাসত্ব প্রথা প্রচলিত তা কী তোমরা জান?
এটা শুধু কৌতুক জাগায় না, শ্রোতাদের মনেও আঘাত দেয়। দাসত্ব আজকের দিনে? সতেরটির দেশে? দেশগুলো নাম কী? কোথায় সে-সব দেশ। নানা প্রশ্ন জাগায়।
বক্তা তার বক্তৃতার মাধ্যমে শুধু কৌতূহল সৃষ্টি নয়, শ্রোতাদের শেষ কালের প্রতি আগ্রহী ও করে তুলতে পারেন। উদাহরণ স্বরূপ, একজন ছাত্র নিম্ন বিবৃতি দিয়ে তার বক্তব্য শুরু করেন :
আমাদের একটি আইন পরিষদের জনৈক সদস্য তার পরিষদের দাঁড়িয়ে যে কোনো স্কুল ভবনের দু’মাইল এলাকার মধ্যে ব্যাঙাচি হতে ব্যাঙ উৎপাদনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে একটি আইন পাশ করার প্রস্তাব করেন।
আপনি হাসছেন। বক্তা কী কৌতূহল করছেন। কী অসম্ভব। এটা কি সত্যি করা হয়েছিল? হ্যাঁ, বক্তা ব্যাখ্যা করেন।
স্যাটারডে ইভিনিং পোষ্ট এ ”দুর্বৃত্তদল” শীর্ষক এক নিবন্ধ ঠিক এভাবে শুরু করা হয়েছে :
দুর্বৃত্তদল কী সত্যিই সংঘঠিত। নিয়মানুযায়ী তারা সংগঠিত হবার কথা কীভাবে?
মাত্র দশটি শব্দের লেখক তার বিষয় ঘোষণা করেছেন এবং দুর্বৃত্তদল সংঘঠিত কী না সে সম্পর্কে আপনার মনে কৌতূহল সৃষ্টি করেছেন। এটা প্রশংসাযোগ্য। লেখকেরা যেভাবে পাঠকদের আগ্রহ সৃষ্টি করে বক্তাকেও ঠিক সেভাবে বক্তৃতার প্রতি শ্রোতার আগ্রহ সৃষ্টির চেষ্টা করতে হবে। ছাপানো বক্তৃতার চাইতে বক্তৃতা অভ্যাস করা কালে আপনি বেশি জানতে পারবেন, কীভাবে শুরু করা কল্যাণকর হবে।
গল্প দিয়ে শুরু করেন না কেন?
আমরা বক্তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা শুনতেই সাধারণত অভ্যস্ত। রামেলোই কনওয়েল তাঁর বক্তৃতাকে অলঙ্কার পূর্ণ করে তুলতেন। তিনি ছয় হাজার বারেরও অধিক এরূপ বক্তৃতা করেছেন এবং হাজার-হাজার টাকা রোজগার করেছেন। তিনি কীভাবে তাঁর জনপ্রিয় বক্তৃতা শুরু করতেন?
১৮৭০ সালে আমরা টাইগ্রিস নদীতে ভ্রমণ করতে যাই। বাগদাদে আমরা একজন পথ প্রদর্শক ভাড়া করি। তাকে সরাসরি নিযুক্ত করি আমাদের পারমিপোলিশ, নাইনবে ও বেবিলন, দেখিয়ে দেওয়ার জন্য।
এখানেই তিনি গল্প শেষ করেন। এই গদ্যাংশ সকলের মনে কৌতূহল সৃষ্টি করে। এই ধরনের সূচনা অত্যন্ত ফলপ্রসু হয়। এরূপ সূচনা বা ভূমিকা কখনো ব্যর্থ হয় না। কারণ শ্রোতারা তখন জানতে চায় অতঃপর কী হল? কী ঘটল? অথবা এর পর কী হতে পারে?
এই বইয়ের তৃতীয় পরিচ্ছেদে গল্প দিয়ে শুরু করার কথা বলা হয়েছে।
সাটারডে ইভিনিং পোস্টের একটি সংখ্যায় প্রকাশিত দুটি গল্পের সূচনা এখানে উল্লেক করা হচ্ছে :
(১) রিভলবারের তীব্র শব্দের আঘাতে সবকিছু স্তদ্ধ হয়ে গেল।
(২) জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে ডেনভারের মন্টভিউ হোটেলে একটি মামুলি ঘটনা ঘটে। ঘটনাটা অত্যন্ত মামুলি বা তুচ্ছ হলেও আবাসিক ম্যানেজার গোয়েবলের কল্যাণে এটি ব্যাপকতা লাভ করে। তিনি হোটেল মালিক স্টেভিফারাডে এবং হোটেলের অন্যান্যদের ঘটনাটি জানান। কর্ণগোচর হওয়ায় স্টেভি সারা গ্রীষ্মকাল নিয়মিতভাবে হোটেল পরিদর্শনে আসতে থাকেন।
এই ধরনের সূচনা অর্থবহ। কারণ এটা শ্রোতার মনে কৌতূহল সৃষ্টি করে। একথা শোনার পর আপনি আবার জানতে চান, বুঝতে চান অতঃপর কী হল, কী ঘটল।
একজন অদক্ষ বক্তাও যদি এরূপ দিয়ে বক্তৃতা শুরু করেন তবে তিনি শ্রোতাদের মনে কৌতূহল সৃষ্টি করতে, প্রশ্ন জাগাতে সক্ষম হবেন। বিশেষ চিত্র দিয়ে শুরু করুন : দীর্ঘক্ষণ ধরে শুষ্ক বক্তৃতা শোনা, মন দিয়ে শোনা বা গভীর মনোনিবেশ সহকারে শোনা সাধারণ শ্রোতাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন। চিত্র দিয়ে বোঝানো যেমন সহজ, শ্রোতাদের পক্ষে বোঝাও তেমনি সহজ, তা হলে চিত্র দিয়ে শুরু করেন না কেন? এটা বক্তার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। আমি এটা জানি। আমি চেষ্টা করছি। সাধারণ বক্তারা মনে করেন যে, সাধারণ বিবৃতির মধ্যে সেই বক্তৃতা করা উচিত? চিত্র দিয়ে শুরু করে, শ্রোতাদের কৌতূহলী করে, আগ্রহী করে, সাধারণ বিবৃতি দিলে শ্রোতারা মনে দিয়ে শোনে, বুঝবার চেষ্টা করবে। এই প্রসংগে কোনো উদারহণ দিয়ে চাইলে চতুর্থ পরিচ্ছদের কথা স্মরণ করুন।
এক্ষেত্রে অত্র পরিচ্ছেদ শুরুতে কি কৌশল অবলম্বন করবেন?
কোনো কিছু প্রদর্শন করা :
কোনো কিছু দেখিয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভবত সারা বিশ্বে প্রচলিত সহজতর পন্থা। বন্য বর্বর জাতি এবং এমনকি বানর অথবা রাস্তার কুকুরও কোনো কিছু দেখলে তার প্রতি দৃষ্টি দেয়। এটা বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ, শ্রোতাদের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত ফলপ্রসূ। উদাহরণ স্বরূপ, ফিলাডেলফিয়ার মি. এম. এস. এলিস একবার তার বক্তৃতা শুরু করেছিলেন বুড়ো আঙুল ও তর্জনীর মধ্যে একটি মুদ্রা রেখে। দুটো আঙুলের মাঝে মুদ্রা রাখায় সবাই স্বাভাবিকভাবে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তখন তিনি জানাতে চান : ‘ফুটপাত দিয়ে চলার সময় আপনারা কেহ কী কখনো এরূপ মুদ্রা পেয়েছেন? যদি কেহ পেয়ে থাকেন তবে তা নিয়ে এগিয়ে আসুন, তা উন্নয়ন কাজে লাগানো যেতে পারে।–অতঃপর মি. এলিস এভাবে মুদ্রা সংগ্রহের প্রবণতার নিন্দা করেন।
