একটি বই দীর্ঘকাল স্মরণ রাখা :
কায়রোর আল-আজহার হচ্ছে বিশ্বের একটি বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। এটি একটি মুসলিম প্রতিষ্ঠান যার ছাত্র সংখ্যা একুশ হাজার। ভর্তি পরীক্ষার প্রতিটি ছাত্রকে কোরান হতে মুখস্থ পাঠ করতে হয়। তিন দিন ধরে এই পরীক্ষা চলে।
চীনা ছাত্রগণকে কতিপয় ধর্মীয় পুস্তক এবং পুরাতন পুঁথি মুখস্থ করতে হয়।
আরব ও চীনা ছাত্ররা কীভাবে মুখস্থ করার মতো এই নিরস কাজটি সম্পন্ন করেন?
পুনঃপুনঃ পাঠ এবং দ্বিতীয়ত স্মরণ রাখার প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসরণ করে তারা মুখস্থ করেন, স্মরণ রাখেন।
আপনি বার-বার পাঠ করে যে কোনো পরিমাণ পাঠ মুখস্থ করতে পারবেন। যা আপনি মুখস্থ করতে চান তা পাঠ করুন। তা কাজে লাগান, ব্যবহার করুন। বিষয় সম্পর্কে আলোচনাকালে আপনি আপনার ইচ্ছানুযায়ী নতুন শব্দ ব্যবহার করুন। স্মরণ রাখতে চাইলে কঠিন অংশটি বার-বার চিন্তা করুন, বক্তৃতায় আপনি যে পয়েন্টগুলি বলতে চান সেগুলোর ভিত্তিতে আলোচনা করুন। এভাবে সংগৃহীত জ্ঞান বিস্মৃত হবার নয়।
পুনরাবৃত্তিতে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রযোজন :
কিন্তু কোনো একটি বিষয় অন্ধভাবে, যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পুনরাবৃত্তি করা সঠিক পথ নয়। কতিপয় নিয়ম অনুসরণে, বুদ্ধিমত্তার সাথে পাঠে পুনরাবৃত্তি প্রয়োজন। তাহলে মুখস্থ করা ও স্মরণ রাখা সহজতর হয়। উদাহরণ স্বরূপ, অধ্যাপক গোবিং হাউস তার ছাত্রদের কতিপয় অদ্ভুত বিষয় মুখস্থ করতে দেন। বিষয়গুলি ছাত্রদের মনঃপুত ছিল না। তিনি দেখতে পান যে ছাত্ররা তিন দিনে ৩৮ বার পুনরাবৃত্তি করে ঐগুলি মুখস্থ করছেন, কিন্তু এই সব ছাত্র ইতঃপূর্বে একই সমান বিষয় একদিনেই ৬৮ বার পুনরাবৃত্তি করতে সক্ষম ছিলেন। অন্যান্য মনস্তাত্বিক পরীক্ষার ফলাফল একইরূপ!
এটা আমাদের স্মরণ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। এই অর্থ হচ্ছে এই যে, আমরা যে বিষয়টি বুঝে পড়ি তা মুখস্থ করতে যত সময় লাগে না বুঝে পড়লে লাগে তার দ্বিগুণ। বুঝে পড়লে তা মনে গেঁথে যায় বিধায় স্মরণও থাকে।
মনের এই অদ্ভুত গতির দুটি কারণ রয়েছে। তা হচ্ছে :
প্রথমত পুনরাবৃত্তির মাঝে-মাঝে আমারে অবচেতন মন বিষয়টি ভেবে নেয়। অধ্যাপক জেমস এই বিষয়টি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, এর অর্থ হচ্ছে, শীতকালে সাঁতার আর গরম কালে স্কি খেলার মতো।
দ্বিতীয়ত যে বিষয়টি বুঝি না, যে বিষয়টির প্রতি মন আকর্ষিত হয় না। ”আরব্য উপন্যাসের অনুবাদক স্যার রিচার্ড বার্টন ২৭ ভাষায় নিজের মাতৃভাষার মতো কথা বলতে পারতেন। তবু তিনি বলেছেন যে, একসময়ে তিনি কোনো একটি ভাষা পনের মিনিটের বেশি অধ্যয়ন করতেন না। কেননা, পনের মিনিট পরেই মস্তিস্ক তার সজীবতা হারিয়ে ফেলে।”
এসব তথ্য ভিত্তিতে এখানে এটা নিশ্চিত করে বলা চলে যে, সাধারণ জ্ঞান বা বুদ্ধি সম্পর্কে গর্ব করেন অনুরূপ ব্যক্তিকেও বক্তৃতা করার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত প্রস্তুতি নিতে হয়। যদি না নেন তাহলে এটা নিশ্চিত যে, তিনি তাঁর স্বাভাবিক বুদ্ধির, দক্ষতার অর্ধেকই কাজে লাগান।
বিস্মৃত হওয়া বা ভুলে যাওয়া সম্পর্কে একটি মূল্যবান তথ্য আবিস্কৃত হয়েছে। মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা বার-বার এটা প্রমাণ করেছে সে, আমরা নতুন যা কিছু শিখি তার যতটুকু প্রথম আট ঘন্টায়। আমরা ভুলি, পরবর্তী ত্রিশ দিনেও সমপরিমাণ ভুলি না। এই হিসেবটা বড় অদ্ভুত। সুতরাং আপনি কোনো সম্মেলন, সভা সেমিনার বৈঠকে বক্তৃতা করতে যাবার পুর্বমুহূর্তে আপনার তথ্য দেখে নিন, এবং আবার তা স্মরণ করার চেষ্টা করুন।
লিংকন এই ধরনের অভ্যাসের মূল্য বুঝতেন এবং তা কাজে লাগাতেন। গেটিসবার্গে খ্যাতনামা এডওয়ার্ড এভারেট প্রথম বক্তৃতা করলেন, লিংকন করলেন তার পর বক্তৃতা। লিংকনের পদমর্যাদা অনেক উর্ধ্বে। সুতরাং তিনি এভারেটের পর যে বক্তৃতা দেবেন তা মূল্যবান ও আকর্ষণীয় না হলে তার মর্যাদা রক্ষা হয় না। কিন্তু বক্তৃতাকালে বিমূঢ় হয়ে পড়া লিংকনের বৈশিষ্ট্য। সুতরাং এভারেটের দীর্ঘ বক্তৃতা যখন শেষ হয়ে আসে তখন লিংকন পকেট হতে তার খসড়া বের করে তা নীরবে পাঠ করেন এবং মনেমনে বক্তব্য বিষয় স্মরণ করে নেন।
স্মরণ শক্তির উৎস সম্পর্কে অধ্যাপক জেমসের ব্যাখ্যা :
স্মরণ রাখার প্রথম দুটি নিয়মই যথেষ্ট। তবে তৃতীয়টি অনুসঙ্গ, এটি পুনঃ স্মরণের ক্ষেত্রে অপরিহার্য। বস্তুতপক্ষে এটি হচ্ছে স্মরণ শক্তির ব্যাখ্যা। আমাদের মন হচ্ছে, “অধ্যাপক উইলিয়াম জেমস বিজ্ঞতার সাথে বলেছেন” “একটি প্রয়োজনীয় অনুসন্ধী মাত্র…..মনে করুন আমি এক মুহূর্ত নীরব রইলাম, অতঃপর হুকুম দেয়ার মতো কণ্ঠস্বরে বললাম, পুনঃস্মরণ কর! পুনঃস্মরণ কর। আপনার মন কী এই আদেশ পালন করবে? আপনার অতীত সম্পর্কে কী আপনি কিছু প্রকাশ করবেন? নিশ্চয়ই না। আমার আদেশ ব্যর্থ হবে। বরঞ্চ আপনি মনে-মনে চিন্তা করবেন, আমার কী স্মরণ করা উচিত বলে আপনি মনে করেন? সংক্ষিপ্তভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, এর একটি সূত্র প্রয়োজন। কিন্তু যদি আমি বলি, আপনার জন্ম তারিখ স্মরণ করুন, অথবা প্রাতভোজে কী গ্রহণ করেছেন তা স্মরণ করুন, বা সঙ্গীতের কথা ও ছন্দ স্মরণ করুন, ফলে আপনার স্মরণ শক্তি জাগরিত হবে, আপনি উত্তর দিতে সক্ষম হবেন। সূত্র পেলে আপনার পক্ষে সঠিক উত্তর দেয়া সম্ভব হবে। এখন যদি আপনি চিন্তা করেন, এটা কীভাবে ঘটে, তাহলে আপনি দেখবেন যে, সূত্র জানা থাকায় আপনার পক্ষে এটা স্মরণ করা সহজ হচ্ছে। আমার জন্মদিন” এই অনুষ্ঠানের সাথে বিশেষ তারিখ মাস বছরের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। আজ সকালের প্রাতভোজ বললে কফি, ডিম প্রভৃতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আর গানের কথা বললে স্মরণে আসবে সা-রে-গা-মা। তবে অনুসঙ্গের সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, চিন্তাশক্তির উপর প্রভাব বিস্তার। মনে যা কিছু জাগবে, তা জাগবে অনুষঙ্গ ভিত্তিতে। আপনি যা কিছু স্মরণ করবেন তার ভিত্তিতে কিছু প্রকাশে সক্ষম হবেন।–স্মরণ শক্তিকে জাগরিত রাখার জন্য দুটি নিয়ম পালন করা দরকার। প্রথমত অধ্যবসায়, দ্বিতীয়ত সংখ্যা। স্মরণ শক্তির উৎস হচ্ছে ভিন্নমুখী অনুষঙ্গের একত্র সন্নিবেশ। কিন্তু এই অনুষঙ্গ ভিত্তি করে কোনো কিছু স্মরণ করতে হলে সমগ্র তথ্যটিই স্মরণ করতে হবে। একই অভিজ্ঞতার অধিকারী দুব্যক্তির কথা, যে ব্যক্তি নিজের অভিজ্ঞতার উপর বেশিভাবে নির্ভরশীল তিনি নিজের অভিজ্ঞতাকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের চেষ্টা করেন এবং অপর জনও স্মরণ শক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগান, ধারাবাহিকভাবে না হলেও, অভিজ্ঞতা এক হলেও চিন্তাধারা এক নয় বলে এরূপ বৈষম্য হয়।
