তাঁর পকেটে তখন ছিল মাত্র একটি লিরা যা কিনা এক বোতল মদের মূল্য। সারাদিন আহার না করে মদ পান করে কাটালেন আর আত্মহত্যার মতলব আঁটতে থাকলেন, কীভাবে আত্মহত্যা করবেন। তিনি যখন আত্মহত্যার পরিকল্পনা করছিলেন তখন হঠাৎ ঝড়ের বেগে এক লোক রঙ্গমঞ্চ থেকে তাঁর কাছে ছুটে এল। সে বলল, ‘কারুজো শিগগির এসো, রঙ্গমঞ্চের লোকজন অন্য গায়ককে পছন্দ করছে না, ওরা তাকে মঞ্চ থেকে তিরস্কার করে তাড়িয়ে দিয়েছে। ওরা শুধু তোমার জন্য চিৎকার করেছে। কারুজো বিশ্বাস করলেন না তার কথা। আশ্চর্য হয়ে বললেন, ওরা তো আমার নামও জানে না। লোকটি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ওরা তোমার নাম জানে না। তবু তোমাকেই চায়। চিৎকার করে ঐদিনের মাতালটাকেই খুঁজছে।’
তারপর একটু একটু করে বাড়তে লাগল এনরিকো কারুজোর সুনাম ও জনপ্রিয়তা। পরিণত বয়সে তিনি বনে গেলেন একজন যশস্বী গায়ক।
প্রথম দিকে তার কণ্ঠস্বর এত হালকা ও চিকন ছিল যে তার শিক্ষক তাকে বলেই বসলেন, ‘তোমাকে দিয়ে গান গাওয়া হবে না, জানালার খড়খড়ির ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের মতো তোমার কণ্ঠস্বর।‘ এতে তার উৎসাহ ও অনুশীলন বেড়ে চলল এবং তা জাদুময় কণ্ঠস্বরে পরিণত হল। তাই খ্যাতির উচ্চশিখরে আরোহণ করে প্রথম জীবনের দুঃখময় ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও অগ্নিপরীক্ষার কথা মনে পড়ল।
মাত্র পনের বছর বয়সে তার মা মারা যান। মাকে বড় ভালোবাসতেন তিনি। তাই সারা জীবন যেখানেই গেছেন, মায়ের ছবিটা সঙ্গে নিয়ে যেতেন। তার একুশ ভাই বোনদের মধ্যে শৈশবেই আঠারো জন মারা যায়। তার মা ছিলেন একজন সাধারণ মহিলা। সারা জীবন কঠোর পরিশ্রম ও দুঃখ কষ্ট ছাড়া তার ভাগ্যে আর কিছু জোটে নি। এনরিকোর প্রতি অত্যন্ত আশাবাদী ছিলেন তিনি। তাই তাঁকে খুব ভালোবাসতেন। এনরিকো বলেছেন, ‘আমি যাতে গান শিখতে পারি তার জন্য আমার মা জুতো পরা ছেড়ে দিয়েছিলেন।’
ইতালির অন্যসব চাষী পরিবারের মতো তিনিও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিলেন। জ্যোতিষীর পরামর্শ না নিয়ে কখনো ভ্রমণে বেরোতেন না। তিনি শুক্রবারে নূতন পোশাক পরিধান করতেন না, নূতন জায়গায় ভ্রমণে যেতেন না, নূতন কোনো কাজেও হাত দিতেন না। এগুলো ছাড়া তিনি ছিলেন একজন রুচিশীল ভদ্রলোক।
পৃথিবীর সর্বপেক্ষা দুর্লভ এবং মূল্যবান কণ্ঠের অধিকারী ছিলেন এনরিকো কারুজো। অথচ তিনি একজন প্রকৃত ধূমপায়ী ছিলেন। তিনি বলতেন, ধূমপান তার কণ্ঠস্বরের কোনো ক্ষতি করে না। প্রতিটি অনুষ্ঠানে মঞ্চে ঢোকার আগে দু-এক ঢোক হুইস্কি পান করতেন। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ডাক টিকেট আর দুষ্প্রাপ্য মুদ্রা সগ্রহ করতেন। ব্যঙ্গচিত্র অঙ্কনে তিনি অসাধারণ সিদ্ধহস্ত ছিলেন।
এনরিকো কারুজো জন্মগ্রহণ করেছেন নেপলসে। তার নিজের শহরের লোকেরা তাঁর গান পছন্দ করত না, পত্রিকায় তার সমালোচনা হত, সেজন্য তার মনে গভীর দুঃখ ছিল বলে নিজে শহরবাসীদেরকে কোনোদিন ক্ষমা করেন নি। জনপ্রিয়তা ও খ্যাতির উচ্চশিখরে আরোহণ করার পর প্রায়ই নেপলসে ফিরে যেতেন কিন্তু তাদের কাছে থেকে গান পাওয়ার প্রস্তাব এলে অত্যন্ত তিক্ততার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করতেন।
কারুজো যখন মারা যান তখন কয়েক মিলিয়ন ডলারের মালিক তিনি। শুধু ফোনোগ্রাফ রেকর্ড থেকেই কারুজো দুই মিলিয়ন ডলারেরও বেশি উপার্জন করতেন। যৌবনে দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতায় তিনি এতই বিতৃষ্ণ হয়েছিলেন যে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রতিটি খরচের হিসেব লিখে গেছেন।
১৯২১ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৪৮ বৎসর বয়সে যখন এনরিকো কারুজো মারা যান তখন সমগ্র ইতালিবাসী শোকে বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল। কারণ তারা জেনেছিল, স্মরণকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সুন্দরতম কণ্ঠস্বরটি চিরকালের জন্য নীরব হয়ে গেল।
এন্ড্রু কার্নেগি : অন্যদেরকেও ধনী করে তুলতেন
এন্ড্রু কার্নেগি যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন তার পরিবারের দারিদ্র্যতাহেতু ডাক্তার বা ধাত্রীর পরিচর্যার সুযোগ পান নি। ঘণ্টায় দুই সেন্ট পারিশ্রমিক দিয়ে যার আয় শুরু, শেষপর্যন্ত তিনি উপার্জন করলেন মোট চল্লিশ কোটি ডলার।
ছেলেবেলায় এন্ড্রু মাকে প্রায়ই বলতেন, ‘মা, আমি একদিন ধনী হব, তখন তোমার সিল্কের পোশাক হবে, চাকরবাকর হবে, ঘোড়ার গাড়ি হবে।‘ তার বক্তব্য অনুসারে তার সমস্ত বুদ্ধি মা’র কাছ থেকেই পেয়েছেন। অবশ্য মার প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাই তাঁর জীবনের অন্যতম প্রেরণা। স্কটল্যান্ডের ডানফার্মালিনে যে ছোট্ট বাড়িটিতে এন্ড্রুরা প্রথম বাস করতেন তাতে মাত্র দুটি ঘর ছিল। নিচের তলায় বাবা তাঁতের কাজ করতেন আর ওপরের ঘরটিতে রান্নাবাড়া, খাওয়া থাকা সবই করতে হত।
কার্নেগি পরিবার যখন আমেরিকায় এল, বাবা টেবিলক্লথ বুনে বাড়ি বাড়ি ফেরি করে বিক্রি করতেন আর মা এক জুতো প্রস্তুতকারকের অধীনে কাজ করতেন। এন্ড্রুর পরার জামা ছিল মাত্র একটি। প্রতি রাতে মা সেটা ধুয়ে ইস্ত্রি করে দিতেন। বয়স যখন বাইশ হল, এন্ড্রু মার কাছে প্রতিজ্ঞা করলেন যে, মা, যতদিন জীবিত থাকবেন ততদিন বিয়ে করবেন না। অবশ্যি তিনি তা করেন নি।
তিনি যখন বিয়ে করলেন তখন বয়স হয়েছিল বাহান্ন আর প্রথম সন্তান যখন জন্ম নিল তখন তার বয়স বাষট্টি। তার মা মারা যাওয়াতে এত গভীরভাবে দুঃখিত হয়েছিলেন যে, পনের বছর যাবত মা‘র নামোল্লেখও সহ্য করতে পারতেন না। মায়ের মতো দেখতে এক মহিলার বাড়ি বন্ধকী ঋণ তিনি পরিশোধ করে দিয়েছিলেন।