–বাধা কি আছে। বেশ, দেখাচ্ছি। মিসেস প্রথেরো চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
ইনসপেক্টর স্লাক এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলেন। সেটা দিয়ে বেরিয়ে মিসেস প্রথেরো ঘরে পেছনের জানালার দিকে গেলেন।
ইনসপেক্টর লেখার টেবিলে গিয়ে বসার জন্য আমাকে ইশারা করলেন।
আমার কেমন অস্বস্তি লাগছিল। তবু ধীরে ধীরে লেখার টেবিলে গিয়ে বসলাম।
একমিনিট পরেই কানে এলো একজোড়া পায়ের শব্দ। কিছুক্ষণ থেমে রইল। তারপরেই শব্দটা আবার ফিরে গেল।
ইনসপেক্টর স্লাকের নির্দেশে লেখার টেবিল থেকে আমি আবার আগের জায়গায় ফিরে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গেই মিসেস প্রথেরো ঘরে ফিরে এলেন।
-ঠিক এভাবেই আপনি এসেছিলেন? মিঃ মেলচেট জিজ্ঞেস করলেন।
–হ্যাঁ, অবিকল এইভাবে।
–আচ্ছা এবারে বলুনতো, আপনি যখন জানালা দিয়ে তাকালেন, তখন ভিকার কোথায় ছিলেন?
–ভিকার? মাপ করবেন, আমি ভিকারকে দেখতেই পাইনি।
ইনসপেক্টর গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বললেন, বুঝতে পারা গেল। এই জন্যেই আপনি সেদিন আপনার স্বামীকে ঘরে দেখতে পাননি। সেদিন মিঃ প্রথেরো লেখার টেবিলে ছিলেন।
–ও ওখানে…। বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকালেন মিসেস প্রথেরো।
–হ্যাঁ, মিসেস প্রথেরো, আপনি যখন জানালা দিয়ে তাকান সেই সময় মিঃ প্রথেরো ওখানেই বসেছিলেন। যাই হোক, ব্যাপারটা পরিষ্কার হল। আচ্ছা, রেডিং-এর যে একটা পিস্তল আছে আপনি কি জানতেন?
-হ্যাঁ। একবার আমাকে বলেছিল।
–সেটা কোথায় থাকতো তা কি আপনি জানতেন?
–তা ঠিক জানতাম না। তবে ওর ঘরে বুক কেসের ওপর সেটা চোখে পড়েছে।
পিস্তলটা শেষ করে আপনার চোখে পড়েছে, মনে করতে পারেন?
–সম্ভবতঃ হপ্তা তিনেক আগে। সেদিন আমি আর আমার স্বামী ওখানে চায়ের নিমন্ত্রণে। গিয়েছিলাম।
-তারপর আর ওখানে যাননি?
–না। সাধারণতঃ আমি লরেন্সের বাড়িতে যাই না।
–তাহলে আপনাদের দেখা হত কোথায়?
–ওল্ডহলেই ও আসত। লেটিসের একটা ছবি আঁকায় হাত দিয়েছিল। এছাড়া বনের মধ্যে প্রায়ই দেখা হত আমাদের।
মেলচেট এবারে বললেন, না, আমার আর কিছু জানার নেই। আপনি এখন যেতে পারেন। আমাদের সহযোগিতা করার জন্য ধন্যবাদ।
ডাঃ হেডক মিসেস প্রথেরোকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। লরেন্স রেডিং-ও তাদের সঙ্গে গেল।
মিঃ মেলচেট বললেন, ওই চিরকূটটাই মনে হচ্ছে আমাদের পথ দেখাবে। লক্ষ্য করে দেখুন, চিঠির কথাগুলো অন্য কালিতে লেখা। আর মাথায় যে সময়ের উল্লেখ করা হয়েছে সেই লেখাটার কালি অন্যরকম। চিরকূটে কোন আঙুলের ছাপ পাওয়া গিয়েছিল?
ইনসপেক্টর স্লাক বললেন, ওতে কোন আঙুলের ছাপ পাওয়া যাবে এমন আশা করা বৃথা। তবে পিস্তলে লরেন্স রেডিং-এর আঙুলের ছাপ পাওয়া যেতে পারে। তবে সবচেয়ে রহস্যজনক আমার মনে হচ্ছে গুলির শব্দটা। যদি গুলির শব্দ হয়েই থাকে তাহলে তা কারোর না কারোর কানে আসবেই।
কর্নেল মেলচেট বললেন, মিস মারপল শব্দটা শুনেছেন বলে স্বীকার করেছেন।
এরপর আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ঘটনাটা ক্রমশই জটিল হয়ে উঠছে। সমস্ত ঘটনাগুলোর পেছনেই এমন একটা প্রেক্ষাপট লুকিয়ে আছে। আমার ধারণা, আমরা এখনো পর্যন্ত তার নাগাল ধরতে পারিনি।
আমাদের চোখের সামনের জিনিসগুলো যেমন ঘড়ি, চিরকূট, পিস্তল, এসবগুলোর অন্য কোন অর্থ থাকা অসম্ভব নয়।
-তাহলে এখন তুমি কি করতে চাইছ? জানতে চাইলেন ইনসপেক্টর।চল একবার মিসেস প্রাইস রিডলের সঙ্গে দেখা করে আসি।
ইনসপেক্টর আপত্তি করলেন না। আমাকেও তারা সঙ্গে নিয়ে চললেন।
.
১২.
মিসেস প্রাইস রিডলে বাড়িতে ছিলেন না। চাকর বলল পুলিস স্টেশনে গেছেন। আমরাও পা বাড়ালাম সেদিকে।
পুলিস স্টেশনেই তার সঙ্গে দেখা হল। তিনি বেশ উত্তেজিত অবস্থাতেই ছিলেন। তার কাছ থেকে জানা গেল কেমন একটা বিকৃত অদ্ভুত স্বরে কে তাকে টেলিফোনে শাসিয়েছে।
কথাগুলো তাকে কি বলা হয়েছিল জানতে চাইলে মিসেস রিডলে বললেন, কথাগুলো মনে করতেও আমার শরীরে কাটা দিয়ে উঠছে। বলল, তুমি একটা পরনিন্দুক নচ্ছার মেয়েছেলে। এবারে তুমি বড় বেশি বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। ভুলে যেও না তোমার পেছনে স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ড লেগেছে। ভবিষ্যতের জন্য সাবধান হয়ে যাও, নইলে মহা বিপদে পড়বে। মিঃ মেলচেট এসব কি কোন কথা হলো? সে কি ভয় ধরানো গলার স্বর!
-তারপর?
–আমি যেই জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কে কথা বলছো, অমনি বলল, একজন প্রতিশোধ গ্রহণকারী। তারপরই শুনলাম ফোনটা নামিয়ে রাখল।
একমুহূর্ত বিরতির পরে মিসেস রিডলে ফের বললেন, ফোনটা পেয়ে এমনই ঘাবড়ে গিয়েছিলাম আমি যে বনের দিক থেকে একটা গুলির আওয়াজের মত শব্দ কানে আসতেই ভীষণভাবে চমকে উঠেছিলাম।
ইনসপেক্টর স্লাক সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন-বন থেকে গুলির শব্দ?
-হ্যাঁ। বেশ জোরেই হয়েছিল শব্দটা মনে হল। অবশ্য তখন আমার মানসিক অবস্থাও খুব উত্তেজিত ছিল। তার জন্যও খুব জোরে বলে মনে হতে পারে।
মিঃ মেলচেট বলল, ঠিক আছে, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমরা খোঁজখবর নিয়ে দেখছি।
আমি বললাম, এমনও হতে পারে, কেউ আপনার সঙ্গে রসিকতা করেছে।
মিসেস রিডলে কুঞ্চিত করে প্রথমে আমার দিকে তাকালেন। পরে মিঃ মেলচেটকে বললেন-সম্প্রতি গ্রামটায় অদ্ভুত অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে চলেছে। অদ্ভুতভাবে মারা গেলেন কর্নেল প্রথেরো। এরপর কার পালা কে জানে হয়তো আমারই হবে।
