আর তোমার স্বভাব কেমন সেলিম? তুমি নিজে একগুঁয়ে এবং বোকার মতো আচরণ করোনি? তোমার বাবার রক্ষিতা আনারকলির সঙ্গে প্রণয়ে লিপ্ত হয়ে তুমিও তো তরুণ পশুর মতো আচরণ করেছিলে।
স্বীকার করছি আমি তখন পরিণতির কথা চিন্তা না করে বোকার মতো কাজ করেছি। যৌনলিপ্সা আমাকে গ্রাস করেছিলো। আমি মানছি সেটা আমার ভুল ছিলো। আমার লালসার কারণে আনারকলিকে জীবন দিতে হয়েছে এবং হ্যাঁ, ঐ ঘটনার জন্য বাবার ধৈর্যচ্যুতি ঘটা স্বাভাবিক ছিলো।
বাস্তব পরিস্থিতি তোমার এই স্বীকারোক্তির তুলনায় অনেক গভীর। তোমার পিতা একজন মহান ব্যক্তি, সে তার পূর্বপুরুষ চেঙ্গিসখান এবং তৈমুরের মতোই শক্তিশালী যোদ্ধা কিন্তু তাঁদের তুলনায় অনেক বেশি সহনশীল এবং বিচক্ষণ শাসক। মহান ব্যক্তিদের সন্তানরা এবং পিতামাতারা তাদের অন্যদের তুলনায় ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে। যাইহোক, তোমার পিতা হিসেবে, একজন ব্যক্তি হিসেবে বা একজন সম্রাট হিসেবে তাকে তোমার যে সম্মান প্রদর্শন করা উচিত ছিলো তা তুমি করোনি। তার অবস্থানগত মর্যাদাকে তুমি ক্ষুণ্ণ করেছে। তোমার পিতা যদি ততোটা ক্ষমাশীল না হতো কিম্বা অল্পবয়সী পুত্রের ভ্রান্তি মূলক লালসা উপলব্ধি না করতে পারতো তাহলে আনারকলির মতো তোমাকেও মৃত্যুবরণ করতে হতো।
আমি সেটা জানি এবং আমি সে জন্য কৃতজ্ঞও। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে বাবা আমাকে সমস্ত সভার সম্মুখে লজ্জা দিয়েছেন, আমার সঙ্গে অপমানজনক আচরণ করেছেন।
অসংযমী আচরণ করে তুমি তাকে বিভিন্ন সময় কষ্ট দিয়েছে। কেবল নারীঘটিত বিষয়েই তুমি অনিয়ন্ত্রিত আচরণ করোনি। তোমার সৎভাইদের মতোই মাতাল অবস্থায় তুমি সভায় প্রবেশ করেছে বহুবার। তোমার বাবা একজন অহংকারী মানুষ এবং নিজের রাজকীয় মর্যাদা সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। তোমার বেসামাল আচরণ সমগ্র সভার সম্মুখে তাকেও লজ্জায় ফেলেছে।
কিন্তু আমি তো আমার বদঅভ্যাস গুলি ত্যাগ করার চেষ্টা করেছি যা মুরাদ বা দানিয়েল করেনি।
সেজন্য তোমার বাবা তোমার প্রতি প্রশংসাও জ্ঞাপন করেছে।
সত্যিই কি তাই? আর আবুল ফজলের পরিণতির ব্যাপারে তার মনোভাব কি?
তোমার বাবা মনে করে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধুকে হত্যা করে তুমি তাকে শাস্তি দিতে চেয়েছে। তবে এ ব্যাপারেও সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে রক্তের সম্পর্ককে সে তার বন্ধুত্বের তুলনায় বেশি মর্যাদা প্রদান করবে এবং আমার বিশ্বাস সে সেই চেষ্টা করবে। এটাও নিশ্চিত যে এ ছাড়া তার আর বিকল্প কোনো পথ নেই। মুরাদের মৃত্যু হয়েছে এবং দানিয়েল সর্বক্ষণ মদের মধ্যে নিমজ্জিত থাকে। এই অবস্থায় তুমি এবং উপযুক্ত সময়ে তোমার পুত্ররাই আমাদের রাজবংশের ভবিষ্যৎ হবে।
সেলিমের সমস্ত দেহে একটি স্বস্তির ঢেউ বয়ে গেলো। তার বাবা সম্পর্কে তার বিচার বিশ্লেষণের সমর্থন মিললো দাদীর কাছে। শেষ পর্যন্ত তিনি তাহলে উপলব্ধি করলেন যে আমাকে তার প্রয়োজন?
হ্যাঁ, তবে তোমাকেও উপলব্ধি করতে হবে যে তোমার তাকে আরো বেশি প্রয়োজন। ইচ্ছা করলে তোমার এই ক্ষুদ্র বিদ্রোহ সে নিমিষেই ধূলিসাৎ করতে পারতো। এমনকি সে যদি তোমাকে প্রকাশ্যে ত্যাজ্যপুত্র বলে ঘোষণা করতো তাহলেও তোমার পক্ষে কর্তৃত্ব বজায় রাখা সম্ভব হতো না এবং তোমার অনুসারীরা তোমাকে ত্যাগ করা শুরু করতো। তুমি সেটা বুঝে, না কি বুঝো না?
সেলিম কিছু বললো না। তবে সে মনে মনে স্বীকার করলো তার দাদী ঠিকই বলেছেন। তার বর্তমান অবস্থান ততোটা দৃঢ় নয় যতোটা সে প্রদর্শন করছে। তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য আকবরের উপর চাপ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা স্থবির হয়ে পড়েছে। এলাহাবাদের কোষাগার দ্রুত খালি হয়ে পড়ছে। সৈন্যদের ধরে রাখার জন্য অতি শীঘ্র আরো অর্থের প্রয়োজন। সে দীর্ঘদিন যাবত রাজধানী এবং সভাসদদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। তাঁদের অনেকেরই আনুকূল্য অর্জন করা প্রয়োজন হবে যদি সে তার পিতার উত্তরাধিকারী হয়। তার পুত্রদের সঙ্গেও তার দেখা হওয়া প্রয়োজন, এতোদিন ধরে হয়তো তারা তাদের দাদার কাছে তার বিদ্রোহ সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছে। আর বাস্তবতা হলো সে এবং তার পিতা উভয়েই কিছু কিছু ভুল করেছে। কিন্তু তা সরাসরি স্বীকার করতে তার অহমিকায় বাঁধলো। পরিশেষে সে কেবল বললো, আমি বুঝি।
তাহলে মিমাংসার ব্যাপারে তোমার সম্মতি রয়েছে?
হ্যা…তবে আমার একটি শর্ত আছে। বিরোধ মিটিয়ে ফেলার প্রক্রিয়ায় আমাকে ছোট করা চলবে না।
তোমাকে ছোট করা হবে না বা কোনো প্রকার অপমানজনক পরিস্থিতিতেও ফেলা হবে না। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি। তোমার বাবা দরবারে আনুষ্ঠানিক ভাবে তোমাদের মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়টি সমাধা করার দায়িত্ব আমাকে প্রদান করেছে।
তাহলে আমি খুশি।
*
যখন শিঙ্গা বাজানো হবে তখন তুমি ডান দিকের দরজা দিয়ে দরবার কক্ষে প্রবেশ করবে, হামিদা বললেন। এলাহাবাদ এবং আগ্রার মাঝে দূরত্ব একদিনের। আজই সেলিম হামিদার সঙ্গে আগ্রায় পৌঁছেছে যাকে অল্পদিন। আগে পুনরায় আকবর তার রাজধানী বানিয়েছেন। সেলিম আগ্রা শহরের সীমায় শিবির স্থাপন করার পর হামিদা একা অগ্রার দুর্গে গমন করেছিলেন আকবরকে অবহিত করতে যে সেলিম তার সঙ্গে আপোষ করতে সম্মত হয়েছে।