আমি বেশ অনুভব করতে পারছিলাম যে কোন এক সময় বাক্সের ঢাকনাটি খোলা হয়ে গেল এবং মেঝেতে রাখার জায়গা ছিলনা তাই ওটাকে রাখা হোল নীচের শোবার জায়গাটায়। খুব সাবধানে রাখার চেষ্টা করা হলেও কাঠের শব্দ বেশ পেয়েছিলাম আমি। এর পর কামরার মধ্যে নেমে আসতে নিচ্ছিদ্র নীরবতা আর ভোর পর্যন্ত সেই পরিবেশই বজায় থাকত। ভোরে কিন্তু চাপা গলায় ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ আর ফিস্ ফিস্ করে কথা বলার আওয়াজ শুনেছিলাম। অবশ্য জানিনে এগুলো আমারই মনের মধ্যে তৈরী হচ্ছিল কিনা। হয়ত ওঁর কামরা থেকে ফুঁপিয়ে কান্না বা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ সত্যিকারের কোনটিই আমি শুনিনি। শিল্পী হয়ত তার কাঠের সেই চারকোনা বাক্সটা খুলে অমূল্য আর অপূর্ব শিল্পকৃতির আস্বাদই প্রাণভরে গ্রহণ করছিলেন। এর মধ্যে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠবার মত বোধ হয় কিছুই ছিল না। তাই আমি আবার বলছি যে এটা খুবই স্বাভাবিক যে ক্যাপ্টেন হার্ডির কাছে বেশ কয়েকবার চা খাওয়ার ফলে এ সবই আমার উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনাপ্রসূত। সেই দু’ রাত্রির শেষে ভোরের দিকে বাক্সের ঢাকনা বন্ধ করার শব্দ শুনেছি, পেরেকের ওপর সাবধানে হাতুড়ী পেটানোর আওয়াজও পেয়েছি। তার পর পোক বদলে তিনি বাড়তি কামরাটা থেকে মিসেস ওয়াটকে ডেকে আনতে যেতেন।
সাতদিন সমুদ্র যাত্রার পর আমরা যখন কেপ হটেজ পেরিয়ে গিয়েছি ঠিক তখনই দক্ষিণ পশ্চিম দিক থেকে প্রচণ্ড বাতাস বইতে আরম্ভ করল। এ ধরণের ভয় একটা ছিল কারণ কয়েকদিন ধরেই তার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছিল। যাই হক এর জন্য যতখানি সাবধানতা নেবার তা নেওয়া হোল। জাহাজটি তার সমুদ্রযাত্রার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকল। প্রায় আট
চল্লিশ ঘণ্টার শেষের দিকটায় আমরা যে প্রবল ঝড়ের সম্মুখীন হয়েছিলাম তাতে জাহাজের প্রভূত ক্ষতি হয়েছিল আর তিন জন মাল্লা প্রাণ হারিয়েছিল। একটা মাস্তুল ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। ঝড় পুরো থেমে যাবার লক্ষণ দেখা গেল না। তৃতীয় দিনে আর একটা মাস্তুলের ক্ষতি হোল। আমরা যখন ওটাকে নিয়ে ব্যস্ত তখন খবর এলো জাহাজের খোলে চার ফুটের মতো জল জমে গিয়েছে। সমস্যাটা গুরুতর হয়ে দাঁড়ালো যখন দেখা গেল যে জল সেচের পাম্পগুলো প্রায় অকেজো হয়ে রয়েছে।
আমরা যখন এইভাবে প্রচণ্ড হতাশা বিমূঢ়তার মধ্যে রয়েছি তখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল ভারি জিনিষপত্র ফেলে দিয়ে জাহাজটাকে যতদূর সম্ভব হালকা করে ফেলা হবে, এমন কি বাকী দুটো মাস্তুলও কেটে ফেলা হবে। এ সব কাজ করার পরও দেখা গেল অবস্থার এমন কিছু উন্নতি হয়নি। পাম্পগুলো তখনো অকেজো অথচ ওদিকে খোলের ছিদ্রটার আয়তন বেড়ে চলেছিল। সূর্যাস্তের সময় হাওয়ার তীব্রতা আর সেই সঙ্গে সমুদ্রের উন্মত্ততা অনেকখানি কমে গেল। আশা হোল আমরা বোধহয় এ যাত্রা রক্ষা পেয়ে গেলাম। রাত আটটা নাগাদ বাতাস থেমে গেল আর মেঘের ফাঁক দিয়ে আকাশে পূর্ণচন্দ্র দেখা গেল। এতে আমাদের হতাশার ভাব অনেকখানি দূর হয়ে গেল।
অমানুষিক পরিশ্রমের পর আমরা প্রথম ছোট নৌকোখানা জাহাজের পাশ থেকে জলে নামাতে পারলাম। ঝড়ে ওটার বড় একটা ক্ষতি করে নি। ওর মধ্যে সমস্ত মাঝিমাল্লা আর অধিকাংশ যাত্রীকে তুলে দেওয়া হোল। নৌকোটা তক্ষুনি রওনা হয়ে গেল আর তিন দিনের দিন ওক্রাকোকে গিয়ে পৌঁছল নিরাপদেই।
এদিকে ভাঙা জাহাজে আমরা ছিলাম চৌদ্দ জন যাত্রী আর ক্যাপ্টেন। আমাদের ভরসা ছিল আর একটা ছোট নৌকোর ওপর। এবার ওটাকে জলে নামানো হোল। অবশ্য নামানোর সময় একটা বিপদ ঘটতে যাচ্ছিল। যাই হোক দৈবানুগ্রহে নৌকোটা
ঠিকমত জলে ভাসল আর ক্যাপ্টেন আর তার স্ত্রী, মিঃ ওয়াটের লোকজন, একজন মেক্সিকান অফিসার আর তার স্ত্রী এবং চারটি ছেলেমেয়ে, আমি ও একজন নিগ্রো–এই কজন সবাই গিয়ে ওটাতে উঠলাম।
কিছু খাদ্য ও পানীয়, অত্যাবশ্যকীয় কিছু যন্ত্রপাতি ছাড়া অন্য কিছু জিনিষপত্র সঙ্গে নেবার প্রশ্নই ছিল না। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার নৌকোটা জাহাজ থেকে কয়েক হাত এগোতে-না-এগোতেই মিঃ ওয়াট উঠে দাঁড়িয়ে মিঃ হার্ডিকে তার চারকোনা কাঠের বাক্সটা নিয়ে আসবার জন্যে নৌকোটাকে জাহাজের কাছে নিয়ে যেতে বললেন।
কিছু রূঢ়তার সঙ্গেই ক্যাপ্টেন বলে উঠলেন, ‘আপনি চুপ করে বসে থাকুন মিঃ ওয়াট। আপনি কি আমাদের নৌকোটা ডুবিয়ে দিতে চান? দেখছেন না, জল এর মাথায় মাথায় এসে দাঁড়িয়েছে?
মিঃ ওয়াট তখনো দাঁড়িয়ে। তিনি বলে উঠলেন, কিন্তু আমার বাক্সটা? ক্যাপ্টেন হার্ডি, আপনি মানা করতে পারেন না, করা উচিত নয় আপনার। ওটার ওজন এমন কিছু বেশী নয়। না, মোটেই নয়। আপনার জন্মদাত্রী মায়ের নামে আপনার কাছে অনুরোধ করছি, ক্যাপ্টেন, ফিরে চলুন, আমার বাক্সটা নিয়ে আসতে দিন।’
শিল্পীর আবেগকম্পিত অনুরোধ শুনে কয়েক মুহূর্তের জন্য হয়ত বা ক্যাপ্টেন সহানুভূতি অনুভব করেছিলেন। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি আগের মতোই কঠোর ভাবে বলে উঠলেন, ‘মিঃ ওয়াট, আপনি উন্মাদ। আপনার কথা আমি শুনতে চাইনে। আপনি চুপ করে বসে পড়ন নইলে আমাদের নৌকো ডুবে যাবে। ওঁকে ধরে বসান তো সবাই, আটকে রাখুন ওঁকে। উনি লাফিয়ে পড়বেন মনে হচ্ছে, হ্যাঁ তাই, ঐ যে, গেল–গেল!
