আমার পক্ষে যা কিছু দেখা আর শোনা সম্ভব হয়েছিল তা থেকে এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হলাম যে ভদ্রলোক নিয়তির পরিহাসে বা সাময়িক উত্তেজনার বশে বা উৎসাহের আতিশয্যে ওঁর চাইতে সব দিক থেকে নিম্নশ্রেণীর একজন মহিলাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছেন। এর স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে ওঁর মনে অতি দ্রুত এক ধরণের ঘৃণা সৃজিত হয়েছে। ওঁর সম্পর্কে আমার মনে করুণার সৃষ্টি হোল ঠিকই কিন্তু পরমুহূর্তেই ঐ ‘লাস্ট সাপার’ ছবি নিয়ে যে গোপনীয়তা উনি রক্ষা করছিলেন তার জন্যে নির্মম হয়ে উঠলাম। এর জন্যে প্রতিশোধ নেবার ইচ্ছাটাই দৃঢ় হোল শেষ পর্যন্ত।
একদিন তিনি ডেকের ওপর বেরিয়ে এসেছিলেন আর অভ্যাস মতো তাঁর হাত ধরে এদিক ওদিক পায়চারী করছিলাম আমি। তার স্বাভাবিক বিষণ্ণভাবটি কিন্তু বজায় ছিল। উনি যেন বেশ চেষ্টা করেই মাঝে মধ্যে একটুখানি কথা বলছিলেন। দু একবার ওঁর সঙ্গে রসিকতা করার চেষ্টা করলাম কিন্তু তার পরিবর্তে ওঁর হাসিকে বড় বেশী করুণ মনে হোল। হতভাগ্য ওয়াটের স্ত্রীর কথা মনে পড়তে এ বিশ্বাসটিই দৃঢ় হল যে বন্ধুর পক্ষে কোন আনন্দের ভান করাও সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত আমি নিজের কাজ শুরু করলাম। প্রসঙ্গক্রমে ঐ চারকোনা বাক্সটা সম্পর্কে দু’একবার ইঙ্গিত করলাম। ওঁকে পাকেচক্রে বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করলাম যে এ ব্যাপারে তিনি যে একটা রহস্য রেখে দেবেন, তা আমি হতে দিতে চাইনে। আসলে কয়েকটা তীক্ষ্ণ আক্রমণই চালালাম ওঁর ওপর যদিও সবই খুব অপ্রত্যক্ষভাবে। ওঁর সেই চারকোনা বাক্সটার প্রসঙ্গ তুলে বললাম যে তার অদ্ভুত আকৃতি আমাকে আকৃষ্ট করেছে। কথা বলতে গিয়ে আমি একটু সবজান্তার ভাব দেখিয়ে হাসলাম এমন কি আমার তর্জনী ওঁর বুকে ঠেকিয়ে একটা গভীর ইঙ্গিতও করলাম।
ওয়াট কিন্তু যেভাবে আমার সমস্ত নির্দোষ পরিহাস হজম করে ফেললেন তাতে বুঝলাম উনি পুরোপুরি উন্মাদ হয়ে গিয়েছেন। প্রথমটা উনি এমন ভাবে আমার দিকে তাকালেন যেন পরিহাসের কোন অর্থই উনি বুঝতে পারছেন না। তার পর যখন কিছুটা অর্থবোধ হোল, তখনো আগের মতোই বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইলেন। এর পর ওঁর মুখ চোখ লাল হয়ে উঠল আবার পরক্ষণেই ফ্যাকাসে হয়ে গেলেন তিনি। আবার এর পরমুহূর্তেই আমার রসিকতা বুঝে ফেলেছেন এই রকম ভঙ্গীতে হো হো করে হেসে উঠলেন। আমার পক্ষে অবাক হবারই কথা, উনি প্রায় মিনিট দশেক বা তারও বেশী সময় ওইভাবে হাসতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত হাসতে হাসতে উনি জাহাজের পাটাতনের ওপর আছাড় পড়ে গেলেন। ওঁকে তাড়াতাড়ি তুলে ধরতে গিয়ে দেখলাম ওঁর সমস্ত শরীরে মৃত্যুর লক্ষণ পরিস্ফুট।
অনেকেই আমাদের সাহায্যের জন্য দৌড়ে এলেন। কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর তার চেতনা ফিরে এলো। জ্ঞান ফেরার পরও বেশ কিছুক্ষণ তিনি এলোমেলো কথা বলতে থাকলেন। যাই হোক আমরা তার কামরায় নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলাম। পরদিন সকালে তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ দেখা গেল। অন্তত শরীরের দিক থেকে কোন রকমের অসুস্থতা তখন আর ছিল না। তার মনের খবর নিইনি। জাহাজে থাকার বাকী ক’দিন আমি তাঁকে এড়িয়ে চলেছি। ক্যাপ্টেনের সঙ্গে এ ব্যাপারে আমার মতৈক্য ঘটেছিল। তার অনুবোধ মতোই আমি মিঃ ওয়াটের সঙ্গে মেলামেশা করিনি আর তার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জাহাজের অন্য কোন যাত্রীর সঙ্গে কোন রকমের আলোচনাও করিনি।
মিঃ ওয়াটের এই অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পর অনেকগুলো ঘটনা ঘটে গেল আর আমার মনের মধ্যে যে কৌতূহল স্তিমিত হয়ে এসেছিল তা আবার উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল। আমি বেশ উত্তেজিত বোধ করছিলাম তাই বেশ কয়েক কাপ চা খেয়ে ফেললাম। এর ফলে দু’রাত্রি আমার একেবারেই ঘুম হোল না। আমার কামরার দরজা খুলে খাবার ঘরে যাওয়া যেত। প্রকৃত পক্ষে একক যাত্রীর জন্যে নির্দিষ্ট সব কামরারই ঐ এক ব্যবস্থা ছিল। মিঃ ওয়াটের কামরাগুলো ছিল অন্য দিকে। ও ঘরগুলোর একটা ছোট দরজা খুলে খাবার ঘরে আসা যেত। ওদের সেই দরজাগুলোকে রাত্রেও তালা দিয়ে রাখা হোত না। আমরা সমুদ্রে বাতাসের যথেষ্ট আনুকুল্য পেয়েছিলাম। এর ফলে জাহাজটা যখনই বাতাসের দিকে মুখ করে দক্ষিণদিকে মোড় নিচ্ছিল তখনই ঐ ছোট দরজাগুলো খুলে যাচ্ছিল। কোন যাত্রী তার বিছানা থেকে উঠে গিয়ে দরজাগুলো বন্ধ করার কষ্টটুকুও স্বীকার করতে রাজী ছিলনা। তাই দরজাগুলো খোলাই থেকে যাচ্ছিল। এদিকে গরমের জন্য আমি আমার কামরার দরজা খোলাই রেখেছিলাম। এর ফলে ওদিকের ঘোট দরজা দিয়ে অন্য কামরাগুলোর বিশেষ করে মিঃ ওয়াটের কামরাটার ভেতরটা স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছিলাম। যে দু’ রাত্রি আমার ঘুম হয়নি (পরপর দু’রাত্রি নয় কিন্তু সে দু’টি রাত্রেই দেখলাম রাত এগারোটা নাগাদ মিসেস ওয়াট খুব সাবধানে ওঁদের কামরা থেকে বেরিয়ে ওই বাড়তি কামরাটায় গিয়ে ঢুকছেন আর ভোর পর্যন্ত ওখানেই থাকছেন। ভোরে তার স্বামী ডাকলে তিনি কামরায় ফিরে আসছেন। ওঁরা যে বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করছেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ ছিল না। পাকাঁপোক্ত ভাবে বিবাহবিচ্ছেদ করে নেবার আগে ওঁরা বাড়ীতেও নিশ্চয় পৃথক ঘর ব্যবহার করছিলেন। এখানে একটা বাড়তি কামরা ভাড়া করার রহস্যটা এতদিনে স্পষ্ট হয়ে গেল।
আরও একটা ঘটনায় আমি কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। নিদ্রাহীন ঐ দু’টো রাত্রে মিসেস ওয়াট অন্য কামরায় চলে যাবার পর ওঁর স্বামীর কামরায় খুব সাবধানী চাপা কণ্ঠস্বর শুনলাম আমি। খুব মনোযোগ দিয়ে শোনার পর ওর অর্থবোধ হোল একেবারে নির্ভুল ভাবেই। শিল্পী ভদ্রলোক ছেনী আর হাতুড়ী দিয়ে ওঁর চারকোনা বাক্সটি খোলর চেষ্টা করছিলেন অথচ হাতুড়ীর আঘাত পড়ছিল এমন সব জায়গায় যেগুলো সুতী বা পশমী কোন বস্তু দিয়ে ঢাকা ছিল।
