- বইয়ের নামঃ বুদ্ধির খেলা
- লেখকের নামঃ শামসুদ্দীন নওয়াব
- সিরিজঃ তিন গোয়েন্দা সিরিজ
- প্রকাশনাঃ সেবা প্রকাশনী
- বিভাগসমূহঃ রহস্যময় গল্প, গোয়েন্দা কাহিনী, রোমাঞ্চকর গল্প
বুদ্ধির খেলা
১
সকাল। পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ড। ইয়ার্ডের মূল অফিসের ছাদে রঙিন টালি। ওখানে মেরি চাচীর কাঁচঘেরা চেম্বার, ছাপার মেশিনের ওপাশে জঞ্জালের স্তূপ উঁচু হয়ে থাকায় ওঅর্কশপ থেকে দেখা যায় না। তবে এখন ওয়র্কশপে নেই তিন গোয়েন্দা, আছে বাতিল মালের নাচে চাপা পড়া ওদের হেডকোয়ার্টার, মোবাইল হোমে।
আধ-পোড়া ডেস্কে বসে জটিল একটা জ্যামিতি নিয়ে মগ্ন কিশোর, মুসা ব্যস্ত মটর সাইকেলের একটা নষ্ট কারবুরেটর মেরামত করতে, আর রবিন ভ্রু কুঁচকে উচ্চারণ করে করে পড়ছে একটা বাংলা বই।
ক্রিং ক্রিং করে বেজে উঠল ফোন।
বইটা নামিয়ে রেখে সবাই যাতে ওর কথা শুনতে পায় সেজন্য স্পিকারের সুইচটা অন করে রিসিভার তুলল রবিন। বইয়ের এই এক সুবিধে, যখন ইচ্ছে রেখে দিয়ে কাজ সেরে আসা যায়। নাটক-সিনেমার মতো নয় যে, গেলাম তো কাহিনী এগিয়ে যাবে, ফিরে এসে আর তাল রাখা মুশকিল।
হ্যালো? তিন গোয়েন্দার হেডকোয়ার্টার এটা।
হ্যালো, কে? ওদিক থেকে প্রশ্ন করা হলো।
কোঁচকানো ভ্রূ আরও কঁচকে গেল রবিনের। বাড়ির কলিং বেল টিপে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া যদি শয়তানি হয়, তা হলে ফোন করে নিজের পরিচয় না দিয়ে কে ধরল সেটা জানতে চাওয়া বিশ্রী একটা অভদ্রতা।
আপনি কে তা বলুন।
আমি শ্যারন, অস্থির শোনাল গলাটা। কে, রবিন?
শ্যারন মেয়েটা ওদেরই সমবয়সী। এই কিছুদিন আগে ওদের স্কুলে একই ক্লাসে ভর্তি হয়েছে। হাসিখুশি সহজসরল আর কৌতুকপ্রিয়। সহজেই তিন গোয়েন্দার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে ওর। এমনকী জিনার সঙ্গেও খাতির হয়ে গেছে শ্যারনের। এতোটাই যে, দুদিন আগে বাবা মার সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকায় বেড়াতে যাওয়ার সময় জিনা ওর। হেফাজতেই রাফিয়ানকে রেখে গেছে। বিনা পয়সায় ডগ-হাউসে রাফিয়ানকে রেখেছে শ্যারন।
হ্যাঁ, আমি রবিন। কী ব্যাপার, শ্যারন, তোমার গলা শুনে মনে। হচ্ছে খারাপ কিছু হয়েছে।
খানিক নীরবতা, তারপর ফুঁপিয়ে উঠল শ্যারন। আমি ফেঁসে গেছি, রবিন। তোমাদের সাহায্য খুব দরকার। পুলিশ আমাকে জেরা করছে। ভাব দেখে মনে হচ্ছে না জানি কতো বড় অপরাধ করেছি আমি। কথার ফাঁকে ফাঁকে ফেঁপাচ্ছে শ্যারন। তোমরা তো গোয়েন্দা, তোমরা হয়তো পুলিশকে বোঝাতে পারবে আসলে আমার কোনও দোষ নেই।
বন্ধুদের দিকে তাকাল রবিন। কী হয়েছে, শ্যারন? কোথায় তুমি?
ইতিমধ্যে জ্যামিতির খাতা নামিয়ে রেখে সোজা হয়ে বসেছে। কিশোর। মুসার হাতে এখনও কারবুরেটর ধরা, মুখটা একটু হাঁ হয়ে আছে। দুজনেরই মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে রবিন আর শ্যারনের ফোনালাপ।
কাজের জায়গায়। গলা কাঁপছে শ্যারনের। পেট মোটেলে। কোটিপতি হার্বার্ট রকফেলারের শখের কুকুরটা চুরি হয়ে গেছে। আমার বস খেপে আছেন আমার ওপর। আমার ডিউটির সময়েই চুরিটা হয়েছে বলে ধারণা করছে সবাই। বস্ আভাস ইঙ্গিতে বলতে চাইছেন, আমি এই কুকুর-চুরির সঙ্গে কোনও না কোনও ভাবে জড়িত।
কোটিপতি হার্বার্ট রকফেলার ছুটি কাটাতে নিজস্ব ইয়টে করে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছেন, খবরের কাগজে পড়েছে ওরা। যাওয়ার আগে
রকি বিচের নতুন পেট মোটেলে নিজের শখের কুকুরটাকে রেখে গেছেন। ভদ্রলোক। নামীদামী বড়লোক যাঁরা তাঁদের অনেকেই ইদানীং বাইরে গেলে ওই পেট মোটেলে নিজেদের কুকুর রেখে যান। ওখানে ডিলাক্স রুমে কুকুর রাখতে হলে প্রচুর খরচ করতে হয়, সবার পক্ষে সেটা সম্ভব নয়।
নীরব সমঝোতা হয়ে গেল তিন গোয়েন্দার ভিতর। রবিন বলল, চিন্তা কোরো না, শ্যারন, আমরা আসছি।
ফোন রেখে দিল শ্যারন। রিসিভার নামিয়ে রাখল রবিনও। কিশোর বলল, কুকুর অপহরণ করেছে কেউ। নিশ্চয়ই অনেক টাকা মুক্তিপণ দাবী করবে। শুনেছি রকফেলার সাহেবের জানের জান ওই বিরল প্রজাতির কোলিটা।
কুকুরটা কোলি সেটা তুমি জানলে কী করে? জ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল মুসা।
রবিন বলল, পেপারে পড়োনি? দুর্লভ কুকুর। কয়েকটা ফ্যাশন শোতে চ্যাম্পিয়ানও হয়েছে।
নীচের ঠোঁটে চিমটি কাটল কিশোর। একটা ব্যাপার তোমরা খেয়াল করেছ? অভিজাত এলাকা থেকে একটা স্পিঞ্জ কুকুরও নিখোঁজ, হয়েছে। কালকের পেপারে ওটার মালিক বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, যে, ওটা ফেরত এনে দিতে পারবে তাকে তিনি পাঁচশো ডলার পুরস্কার দেবেন।
পড়েছি, বলল রবিন।
মুসা জিজ্ঞেস করল, তোমার কি ধারণা ওটাও কুকুর চোরের কাজ, কিশোর?
হতে পারে, একটু দ্বিধা করে বলল কিশোর। ওটার মালিকও পয়সাওয়ালা মানুষ। কিন্তু যদি কাজটা কুকুর চোরের হয়ও, তখন পর্যন্ত কেউ মুক্তিপণ চায়নি।
মোবাইল হোম থেকে বেরিয়ে এলো ওরা, মেরি চাচীকে অফিসেই পেল। তাঁকে বলে এবার ওরা চড়ে বসল মুসার : তোবড়ানো ফোক্সওয়াগেনে। বিকট কয়েকটা মিস ফায়ার করে স্টার্ট নিল এঞ্জিন, রওনা হয়ে গেল ওরা।
শ্যারন পেট মোটেলে পার্টটাইম চাকরি নিয়ে মনে করেছিল জম্ভজানোয়ারের সঙ্গে সময়টা দারুণ কাটবে ওর, বলল রবিন। এখন ওকে সন্দেহ করা হচ্ছে। দুঃখজনক।
ডগ-হাউস পেট মোটেলটা শহরের উত্তর প্রান্তে। শুনেছিল, তবু ওটার সামনে পৌঁছে খানিকটা অবাক না হয়ে পারল না তিন গোয়েন্দা। বাইরে থেকে বাড়িটা দেখতে একদম মানুষের হোটেলের মতোই। গেটের উপর একটা নিয়ন সাইন। তাতে লেখা: ঘর খালি আছে।