কৈফিয়ত দেয়ার ভঙ্গিতে পলা বলল, তোমাদের দেখেই বুঝেছি, তোমরা খারাপ নও। কিন্তু সকালে এসেছিল দু-জন, মিস্টার লফারের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার জন্যে, ওরা ভয়ঙ্কর। কলজের পানি শুকিয়ে দিয়ে গিয়েছিল আমার। তারপর থেকে আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না। দরজায় তালা দিয়ে রাখি সারাক্ষণ।
কারা ওরা? জানতে চাইল রবিন, পুলিশ?
না। বিশালদেহী দু-জন লোক, রুক্ষ ব্যবহার। কাপড়-চোপড় ভাল না। ডাকাতের মত আচরণ করছিল। আগে জানলে ঢুকতে দিতাম না। এসে যখন বলল মিস্টার লফারের ব্যাপারে কথা বলতে চায়, ভাবলাম গোয়েন্দা টোয়েন্দা হবে।
চট করে পরস্পরের দিকে তাকাল দুই গোয়েন্দা।
কিশোর বলল, মিস্টার লফারের খোঁজ করছিল?
হ্যাঁ, করছিল, পল বলল। মিস্টার লফারের অফিসের ফাইল, রেকর্ড আর তাঁর কাছে আসা চিঠিপত্র দেখাতে আমাকে বাধ্য করল। কব্জি মুচড়ে ধরেছিল, কালশিটে পড়ে আছে, দেখাল সে।
হু, মাথা দোলাল রবিন, তারমানে বাজে লোকই ওরা। পুলিশকে জানিয়েছেন?
না, মাথা ঝাঁকাল পল। আমাকে হুমকি দিয়ে গেছে পুলিশকে জানালে আস্ত রাখবে না।
কিশোরের দিকে তাকাল রবিন, আমাদের যারা হুমকি দিয়েছে মনে হচ্ছে তাদের দলেরই লোক।
হতে পারে, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর। তবে লফারের খোঁজখবর নিতে যখন এসেছে, ধরে নেয়া যায় ওরা তাকে বন্দি করেনি। তবে কি অন্য কোন দলের হাতে পড়েছে লফার?
সাদা হয়ে গেল পলের মুখ। কি বলছ তোমরা এ সব!
সবই আমাদের অনুমান। মিস লয়েড, মিস্টার লফার লোক হিসেবে। কেমন, বলুন তো? তাকে কি পছন্দ করেন আপনি?
ভুরু কাছাকাছি হয়ে গেল পলের। ইয়ে, বছরখানেক আগে প্রথম যখন এখানে চাকরিতে ঢুকি তখন তো খুবই ভাল মনে হত। হাসিখুশি, সদা ব্যস্ত একজন মানুষ। শীই শাঁই করে ব্যবসায়ে উন্নতি হচ্ছে। সংসারে অশান্তি নেই। পছন্দ করার মতই একজন মানুষ। তারপর হঠাৎ করে বদলে গেলেন তিনি।
কি রকম?
বদমেজাজী হয়ে গেলেন। চেয়ারে বসে বসে কি চিন্তা করতেন। কাউকে সহ্য করতে পারতেন না। কেউ কাজের কথা বলতে এলেও তাকে ধমকাতে শুরু করতেন। যারা মাল কিনতে আসত, তাদেরও যেন বিশ্বাস করতে পারতেন না। ভঙ্গি দেখে মনে হত, প্রতিটি লোক যেন তাকে ঠকানোর জন্যে উঠেপড়ে লেগেছে। সবাইকে সন্দেহ করতেন।
এ সব করার পেছনে কোন কারণ ছিল? জিজ্ঞেস করল রবিন।
ছিল। খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল তার। তার এক বন্ধুর সঙ্গে পার্টনারশিপে আরেকটা ব্যবসা শুরু করতে চেয়েছিলেন। কলেজে পড়ার সময় থেকে দু জনের বন্ধুত্ব। হঠাৎ করে সমস্ত টাকা মেরে দিয়ে ইয়োরোপে চলে গেল বন্ধুটি। মিসেস লফার এ সব খবর জানেন না। দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়বে বলে তাঁকে বলেননি মিস্টার লফার।
সেই বন্ধু ঠকিয়ে চলে যাওয়ার পর লুক ব্রাউনকে ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করতেন না লফার। বলতেন, ব্রাউনের মত দুঃসাহসী বন্ধু হয় না। তারপর দু-জনেই গায়েব হয়ে গেলেন একদিন।
লুক ব্রাউন কি কাজ করতেন? জানতে চাইল কিশোর। ব্যবসা?
বলতে পারব না। তবে কোথায় থাকত, জানি। ঠিকানা দিচ্ছি, তোমরা পারলে খবর নাওগে।
নোটবুকে ঠিকানা লিখে নিল রবিন। জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, দুঃসাহসী বন্ধু বলে কি বোঝাতে চেয়েছেন, মিস্টার লফার?
মাথা নাড়ল সেক্রেটারি। তা তো বলতে পারব না।
কিশোর বলল, অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, মিস লয়েড। এক কাজ করুন, পুলিশকে ফোন করে সব কথা বলুন। লোকগুলোর হুমকির পরোয়া করবেন না। আবার এসে গণ্ডগোল করতে পারে। পুলিশই আপনাকে নিরাপত্তা দিতে পারবে। মিস্টার লফারের ব্যাপারে আর কিছু বলতে পারবেন। আমাদের?
আর? তার হবির ব্যাপারে বলতে পারি।
বলুন?
ঘোড়ার প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। শেটল্যাণ্ড পনি পুষতেন। এতে কোন কাজ হবে তোমাদের?
হতে পারে, বলা যায় না।
মহিলাকে আবারও ধন্যবাদ দিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে এল গোয়েন্দা।
হোটেলে ফিরে লিফট থেকে নেমে নিজেদের রুমের দিকে এগোল। করিডরের শেষ মাথায় একজন লোককে দেখা গেল। গায়ে খাটেী লাল জ্যাকেট। কোমরের বেল্টে চকচকে পালিশ করা তামার বকলেস।
লোকটাকে চেনা চেনা লাগল। চাবি দিয়ে দরজার তালা খুলতে খুলতে রবিনকে প্রশ্ন করল কিশোর, কে ও?
বেয়ারা-টেয়ারা হবে, জবাব দিল রবিন।
ঘরে ঢুকেই থমকে গেল কিশোর। মনে পড়েছে। চেঁচিয়ে বলল, আরে ওই লোকটাই তো! যার ছবি তুলেছে মুসা, জঞ্জালের আড়ালে ঘাপটি মেরে। ছিল! ওকে ধরতে হবে!
ছুটে বেরিয়ে এল দু-জনে।
কিন্তু নেই লোকটা। চলে গেছে।
লিফটের অপেক্ষা না করে দৌড়ে নিচে নামল ওরা। লোকটাকে দেখা গেল না। ডেস্কে বসা ক্লার্কের দিকে এগোল কিশোর। লোকটার ছবিটা মানিব্যাগে রেখেছে। বের করে কুর্কিকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, এই লোক কি আপনাদের এখানে চাকরি করে?
ভাল করে দেখে মাথা নাড়ল ক্লার্ক, না, কখনও দেখিইনি একে।
কিন্তু এইমাত্র আমাদের ঘরের করিডরে দেখে এলাম! হোটেলের বেয়ারার পোশাক পরা।
দাঁড়াও, দেখছি। খানিক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন পোর্টারকে ডাকল ক্লার্ক, ভিক, শোনো তো? পোর্টার কাছে এলে ছবিটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, একে হোটেলে ঢুকতে দেখেছ? ওপরতলায় নাকি উঠেছিল। আমাদের বেয়ারার পোশাক পরা।
অবাক হলো পোর্টার। কই, দেখিনি তো?
তাহলে পোশাক পেল কোথায়? রবিন বলল, নিশ্চয় চুরি করেছে। আপনাদের স্টোর থেকে।
