টেলিফোনটাও অবাক করল কিশোরকে।
কিশোর, আমি জুন লারসেন বলছি। আমার ব্রিফকেস!
ইঙ্গিত কিংবা সঙ্কেত খুব ভালই বোঝে কিশোর, কিন্তু জুনের কথা তাজ্জব করে দিল ওকে। তবে সে প্রশ্ন করার আগেই জুন বলল, এক ঘণ্টা আগে ঘুম থেকে উঠেছি আমি। তখন থেকে খুঁজে বেড়াচ্ছি আমার ব্রিফকেসটা, পাচ্ছি না, লম্বা দম নিল সে। এর আগে পর্যন্ত ওটার কথা ভুলেই ছিলাম। আজ ঘুম থেকে ওঠার পর মনে পড়েছে।
উত্তেজিত হয়ে উঠল কিশোর। তোমার স্মৃতি ফিরতে আরম্ভ করেছে।
মনে হয়, জুন বলল। যাই হোক, ব্রিফকেসটা পাচ্ছি না। কেন ওটা এত খুঁজছি তা-ও বুঝতে পারছি না। ভেতরে বোধহয় জরুরী কিছু ছিল।
আমি আর মুসা তোমার আব্বার অফিসে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম।
অফিসেও ফেলে রেখে আসতে পারি। খুঁজতে যেতে চাইছিলাম, কিন্তু কদিন যেতে বারণ করে দিয়েছে বাবা। বলেছে রেস্ট নিতে। আচ্ছা, একটা কথা, শুক্রবারে অ্যাক্সিডেন্টটা হওয়ার আগে আমি কোথায় ছিলাম, বের করতে পারবে?
ঠিক এই কাজটা করার কথাই ভাবছিলাম, মনে মনে বলল কিশোর। জুনকে বলল, দেখি, খোঁজখবর করব। কখন কোথায় যাও, লিখেটিখে রাখার অভ্যাস আছে, ক্যালেন্ডারে? থাকলে ভাল হত। একটা সূত্র পেতাম।
রাখি। নীল রঙের মরক্কো লেদারে মোড়া একটা সুন্দর ডায়েরীতে। ব্রিফকেসেই রাখি ওটা।
গাড়ির হর্ন বাজাতে আরম্ভ করল আবার মুসা, তালে তালে, একটা বিশেষ ছন্দ সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
ঠিক আছে। ব্যাপারটা নিয়ে সব রকমে ভেবে নিই, কিশোর বলল জুনকে। রাতে ফোন করব।
আচ্ছা। আমারও কিছু মনে পড়লে জানাব তোমাকে, লাইন কেটে দিল জুন।
বাইরে বেরোল কিশোর। ততক্ষণে বনেট খুলে ইঞ্জিনের ওপর ঝুঁকে পড়েছে মুসা। ইঞ্জিন সামান্যতম গোলমাল করলে সেটা দেখা এখন অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে তার।
জুন ফোন করেছিল, কিশোর জানাল। ওর ব্রিফকেসটা নাকি পাচ্ছে না। জরুরী কিছু ছিল বলে মনে হচ্ছে ওর।
কিশোরের দিকে না তাকিয়েই মুসা বলল, আমি শিওর, মিস্টার এক্স ওটাই খুঁজছিল হাসপাতালে।
মুখ তুললে দেখতে পেত উত্তেজনায় চোয়াল স্কুলে পড়েছে কিশোর পাশার। একটা সাতিক কথা বলেছ তো! মনেই হয়নি আমার!
গাড়িতে উঠে বসল দুজনে। রওনা হলো চিকেন লারসেনের স্যান ফারনানদো ভ্যালির অফিসে। যাওয়ার পথে দেখতে পেল ঢালের নিচে তরাইয়ে তেমনি পড়ে আছে মুসার গাড়িটা।
একটা পেট্রল স্টেশনে থামল মুসা। মেরিচাচীর বোনপো নিকি পাঞ্চকে ফোন করার জন্যে। যাকে এক ভীষণ বিপদ থেকে রক্ষা করেছিল তিন গোয়েন্দা। গাড়ির জাদুকর বলা যায় লোকটাকে। দিন কয়েক হলো আবার ফিরে এসেছে রকি বীচে। গাড়ি মেরামতের একটা গ্যারেজ করার কথা ভাবছে এখানে। উঠেছে ম্যালিবু বীচে এক বন্ধুর সঙ্গে একটা কটেজ ভাড়া করে। গরমকালটা কাটাবে এখানে, গাড়িটাড়ি মেরামত করবে, ব্যবসাটা জমে গেলে চিরস্থায়ীই হয়ে যাবে।
নিকিভাই? ফোনে বলল মুসা। মুসা। আমার গাড়িটা একটু দেখবেন?
কোনটা? শিরোকোটা?
হ্যাঁ। গাড়িটা পড়ে আছে। তুলে নিয়ে গিয়ে মেরামত করে নিন, কয়েক দিনের জন্যে চালাতে দেব। একটা গাড়ি আপনার দরকার বলেছিলেন না?
নিকির সঙ্গে আলোচনা করে গাড়ির একটা ব্যবস্থা করে আবার গাড়িতে ফিরে এল মুসা।
চিকেন লারসেন করপোরেশনের পার্কিং লটে এনে গাড়ি রাখল। ছয়তলা একটা আধুনিক বাড়িতে লারসেনের অফিস।
চিকেন করপোরেশনের পার্কিং লটে এনে গাড়ি ঢোকাল মুসা। জায়গাটা দেখে হাসি পেল দুজনেরই। এখানেও লারসেনের বিচিত্র রুচির নিদর্শন স্পষ্ট। আধুনিক ছতলা একটা বাড়ি আর এক চিলড্রেন পার্কের মিশ্রণ যেন। ভিজিটরস গেটে তালা দেয়া। ঢোকার আগে অনুমতি নিতে হয়। ইন্টারকমে কথা বলতে গেল মুসা। মুরগীর আকৃতিতে তৈরি ইন্টারকম দেখে হাসি পেল। কেন ঢুকবে, প্রশ্ন করা হলে খাবারের অর্ডার দিল সে। চিকেন লারসেন রেস্টুরেন্টে ঢোকার কথা বলল। ভাবল, আগে ভেতরে ঢুকি তো, তারপর দেখা যাবে কোথায় যাওয়া যায়।
ইলেক্ট্রনিক সিসটেমে হাঁ হয়ে খুলে গেল গেট। লাল-হলুদ রঙ করা বাড়িটার দিকে গাড়ি চালাল মুসা।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটানা কাজ করেন লারসেন। চওড়া হাসি দিয়ে স্বাগত জানালেন ওদের। পরনে লাল জগিং স্যুট। কিশোরকে দেখেই বললেন, একটা ধাধার জবাব দাও। বলো তো কোন্ সালে পেষানো মুরগীর মাংসে গাজর মেশাতে আরম্ভ করেছি?
উনিশশো সাতাশি সালে। ছোট ছোট টিনে ভরে সাপ্লাই দিতেন।
অ্যাই, কি বলেছিলাম। বলিনি, ছেলেটা পারবেই! কাছাকাছি যত লোক আছে সবাইকে শোনানোর জন্যে চেঁচিয়ে বললেন লারসেন। গলা তো নয়, মাইক। তুমি একটা পাগল, পুত্র, সন্দেহ নেই, তবে আমার মত পাগল। দাঁড়াও, আইডেনটিফিকেশন ট্যাগ দিয়ে দিচ্ছি। তোমরা দুজনে যে কোন সময় ঢুকতে পারবে। আমাদের এখানে সিকিউরিটি খুব কড়া, চাপড় মেরে কিশোর আর মুসার পিঠে স্টিকার লাগিয়ে দিলেন তিনি।
কিশোরের পিঠে কি লাগানো হয়েছে, দেখে মুসা তো থ। সন্দেহ হতে নিজের পিঠেরটা দেখাল কিশোরকে। হো হো করে হেসে উঠল কিশোর। লেখা রয়েছেঃ মুরগীর ঠোকর। জিজ্ঞেস করল, আমার পিঠে কি? মুসা জানাল, মুরগীর খামচি। ওদের সঙ্গে সঙ্গে লারসেনও হাসতে লাগলেন।
হাসি থামলে বললেন, খেতে এসেছ বলে তো মনে হয় না। তা কি দেখতে এসেছ, বলো তো? মুরগী বেচে লাভ করা আমার প্রথম ডলারটা? ফ্রেমে বাঁধিয়ে রেখেছি। আমার অফিসে। আমার প্রথম স্ত্রীর ছবিটাও বাঁধিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছি। হাহ হাহ হা!
