‘তুমি বুঝিতে পারিয়াছ—যে ব্যক্তি অজ্ঞানান্ধকারে আছে এবং ভোগের জীবনযাপন করে সে পশুর সমান। তথাপি অনেকে অবিদ্যায় আচ্ছন্ন থাকিয়াও গর্ববশতঃ নিজেদের ধীর ও পণ্ডিত মনে করে, তাহারা অন্ধ কর্তৃক পরিচালিত অন্ধের ন্যায় কুটিল পথে পুনঃপুনঃ ঘুরিয়া বেড়ায়। হে নচিকেতা, যাহারা অজ্ঞ শিশুদের মত কয়েক টুকরা মাটির ঢেলায় বিভ্রান্ত হয়, তাহাদের হৃদয়ে এই সত্য কখনও প্রতিভাত হয় না। তাহারা ইহকাল ও পরকাল দুই-ই প্রত্যাখ্যান করে এবং পুনঃপুনঃ আমার শাসনাধীন হয়। এই পরলোক-তত্ত্ব শুনিবার সুযোগ অনেকেরই হয় না; অনেকে শুনিয়াও জানিতে পারে না, কারণ বক্তা ও জ্ঞাতা হইবেন আশ্চর্য পুরুষ আর শিষ্য ও শ্রোতা হইবে কুশল বা নিপুণ। বক্তা বা আচার্য যদি জ্ঞানে সমুন্নত না হন, তাহা হইলে শ্রোতা বা শিষ্যা শতবার শুনিলেও এবং শতবার উপদিষ্ট হইলেও সত্যের আলো তাহার হৃদয়কে কখনও উদ্ভাসিত করে না। নচিকেতা, বৃথা তর্কে তোমার মনকে উদভ্রান্ত করিও না; শুদ্ধচিত্তেই এই সত্য প্রতিভাত হয়। যাঁহাকে অতি কষ্টে অনুভব করিতে পারা যায়, যিনি প্রাকৃত বিষয়বুদ্ধি দ্বারা প্রচ্ছন্ন, যিনি হৃদয়গুহাভ্যন্তরে অনুপ্রবিষ্ট, সেই পুরাতন আত্মাকে বাহিরের চক্ষু দ্বারা দর্শন করা যায় না। তাঁহাকে অন্তশ্চক্ষু দ্বারা দর্শন করিয়া সুখ-দুঃখের অতীত হওয়া যায়। যিনি এই রহস্য অবগত আছেন, তিনি সব বৃথা বাসনা ত্যাগ করেন, এই অতীন্দ্রিয় অনুভূতি লাভ করেন এবং সর্বদা ধন্য হন। নচিকেতা, ইহাই শ্রেয়োলাভের পথ। তিনি গুণাতীত, নিরঞ্জন, কর্তব্যাকর্তব্যের অতীত, ভূত ভবিষ্যৎ ও বর্তমান হইতে ভিন্ন; যিনি ইহা জানেন, তিনিই জ্ঞাতা।
যাঁহাকে সকল বেদ অনুসন্ধান করে, যাঁহাকে দেখিবার জন্য মানুষ সর্বপ্রকার তপস্যা ও কৃচ্ছসাধন করে—আমি তোমাকে তাঁহার নাম বলিব। তিনি ‘ওম্’। এই সনাতন ওম্-ই ব্রহ্ম-তিনি অমৃত; যিনি ইঁহার রহস্য অবগত আছেন তিনি যাহাই চান, তাহাই পান। নচিকেতা, এই আত্মা—যাঁহার সম্বন্ধে তুমি জানিতে চাও, কখনও জন্মানও না, কখনও মরেনও না। দেহনাশে এই অনাদি অনন্ত সনাতন আত্মা নষ্ট হন না। হত্যাকারী যদি মনে করে যে, সে হত্যা করে এবং হতব্যক্তি যদি মনে করে যে, সে হত হইয়াছে, তবে তাহারা উভয়েই অজ্ঞ, কারণ আত্মা হত্যা করিতেও পারেন না, হতও হন না। অণু অপেক্ষাও অণীয়ান, মহৎ অপেক্ষাও মহীয়ান সর্বেশ্বর আত্মা সকলের হৃদয়-গুহায় বাস করেন। নিষ্পাপ ব্যক্তি আত্মার কৃপায় তাঁহাকে সর্বমহিমময় দর্শন করে। (আমরা দেখিতেছি, পরমেশ্বরের কৃপা তাঁহাকে উপলব্ধি করার অন্যতম কারণ।) আত্মা উপবিষ্ট থাকিয়াও দূরে গমন করেন, শয়ান থাকিয়াও সর্বত্র বিচরণ করেন। পরস্পর-বিরুদ্ধ গুণাবলীর মিলনভূমি ঈশ্বরকে শুদ্ধ ও সূক্ষ্ম-বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ ব্যতীত আর কে জানিতে সমর্থ? বিভিন্ন দেহে অশরীরীরূপে বর্তমান এবং অনিত্য বস্তুর মধ্যে নিত্যরূপে বিদ্যমান সেই মহান্ ও সর্বব্যাপী আত্মাকে জানিয়া ধীমান ব্যক্তি শোক করেন না। এই আত্মাকে প্রবচন অর্থাৎ বেদাধ্যয়ন অথবা মেধা বা বহুশাস্ত্র-শ্রবণের দ্বারাও জানা যায় না। আত্মা যাঁহাকে বরণ করেন বা অনুগ্রহ করেন, তিনিই তাঁহাকে লাভ করেন, তাঁহার নিকটেই আত্মা নিজস্বরূপ প্রকাশ করেন। যে অবিরত দুষ্কৃতিপরায়ণ, যাহার মন শান্ত ও সমাহিত নয়, যে সতত চঞ্চল ও অস্থির, সে হৃদয়-গুহায় প্রবিষ্ট এই আত্মাকে ধারণা ও উপলব্ধি করিতে পারে না। নচিকেতা, এই দেহ রথ, ইন্দ্রিয়বর্গ অশ্ব, মন লাগাম বা প্রগ্রহ, বুদ্ধি সারথি, আত্মা রথের স্বামী। যখন আত্মা বুদ্ধিরূপ সারথি এবং বুদ্ধির সাহায্যে মনরূপ লাগামের সহিত, আবার মনের মাধ্যমে ইন্দ্রিয়বর্গরূপ অশ্বের সহিত যুক্ত হয়। তখনই জীবাত্মাকে ভোক্তা বলা হয়; সে অনুভব করে, কাজ করে, ক্রিয়াশীল হয়। যাহার মন সংযত নয় এবং যাহার বিবেকবুদ্ধি নাই, তাহার ইন্দ্রিয়গুলি সারথির হস্তে দুষ্ট অশ্বের মত অসংযত। কিন্তু যাঁহার বিবেকবুদ্ধি আছে, যাঁহার মন সংযত, তাঁহার ইন্দ্রিয়গুলি রথচালকের হস্তে উত্তম অশ্বের মত সর্বদা সংযত। যাঁহার নিত্যানিত্য-বিচারবুদ্ধি আছে, যাঁহার মন সত্য অবধারণ করিতে সতত প্রস্তুত, যিনি শুদ্ধচিত্ত—তিনি সেই সত্যকে গ্রহণ করেন, যাহা লাভ করিয়া পুনর্জন্ম হয় না, নচিকেতা ইহা অতি দুষ্কর, পথ দীর্ঘ, ইহা দুর্লভ।যাঁহাদের সূক্ষ্মানুভূতি লাভ হইয়াছে, তাঁহারাই এই সত্যদর্শন করিতে পারেন, অবধারণ করিতে পারেন। তথাপি ভয় পাইও না। উঠ, জাগ, সক্রিয় হও, উদ্দেশ্যলাভ না করা পর্যন্ত থামিও না, কারণ ঋষিগণ বলেন এই পথ অতি দুর্গম—ক্ষুরের ধারের মত শাণিত ও দুরতিক্রমণীয়। যিনি শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধ-বিহীন শাশ্বত, অনন্ত, নির্বিকার বুদ্ধির অগম্য, অক্ষয়—তাঁহাকে জানিয়াই আমরা অমৃতত্ব লাভ করি বা মুক্ত হই।’
এ-পর্যন্ত আমরা দেখিলাম, যম আমাদের অভীষ্ট উদ্দেশ্য বর্ণনা করিয়াছেন। প্রথম ভাব এই—নিত্যবস্তুকে জানিয়াই আমরা জন্ম, মৃত্যু, দুঃখ এবং সংসারের বিবিধ বিপর্যয়কে অতিক্রম করিতে পারি। নিত্যবস্তু কি?—বিকারহীন অপরিবর্তনীয় মানবাত্মা, বিশ্বাত্মা। আবার ইহাও বলা হয়, নিত্যবস্তুকে জানা অতি কঠিন। ‘জানা’ শব্দের অর্থ শুধু বুদ্ধির স্বীকৃতি নয়, ইহার অর্থ উপলব্ধি। আমরা পুনঃপুনঃ পড়িয়াছি যে, এই আত্মাকে দর্শন করিতে হইবে, অনুভব করিতে হইবে। আমরা ইহাকে চক্ষু দ্বারা দেখিতে পারি না, ইহাকে জানিতে হইলে সূক্ষ্মানুভূতির প্রয়োজন। স্থূল অনুভূতি দ্বারা দেওয়াল ও বইগুলির ধারণা হয়, কিন্তু সত্যকে জানিতে হইলে সূক্ষ্মানুভূতি চাই। ইহাই এই জ্ঞানের সমগ্র রহস্য। যম বলেন, মানুষকে শুদ্ধ হইতে হইবে। ইহাই সূক্ষ্মানুভূতি লাভ করিবার উপায়। তারপর যম অন্যান্য উপায়ের কথা বলিতে থাকেন। সেই স্বয়ম্ভূ আত্মা ইন্দ্রিয়াতীত। ইন্দ্রিয়গুলি বহির্মুখ, কিন্তু স্বয়ম্ভূ আত্মা অন্তর্মুখ। চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়কে বিষয় হইতে নিবৃত্ত করিয়া আত্মাকে জানিবার ইচ্ছাই বিশেষ প্রয়োজন। বাহ্য প্রকৃতিতে আমরা এই যে-সকল সুন্দর জিনিষ দেখি, সেগুলি সবই ভাল, কিন্তু ঈশ্বরকে জানিবার পথ ইহা নয়। আবৃতচক্ষু বা অন্তর্মুখ হইবার শিক্ষালাভ করিতে হইবে। বাহ্যবস্তু দেখিবার আগ্রহকে সংযত করিতে হইবে। যখন তুমি কর্মব্যস্ত রাস্তায় কাহারও সঙ্গে হাঁটিতে থাক, তখন চলমান গাড়ীর শব্দের জন্য কথা শুনিতে পাওয়া খুব শক্ত—অত্যধিক গোলমালের দরুন সে তোমার কথা শুনিতে পায় না। মন বহির্মুখ এবং তোমার পার্শ্ববর্তী জনের কথা শুনিতে পাও না। তেমনি এই বাহ্য জগৎ এত অধিক গোলমাল করে যে, ইহাতে মন বহির্মুখ হয়। আত্মাকে কিরূপে দেখিতে পারি? এই বহির্মুখিতাকে নিবৃত্ত করিতে হইবে। ইহাই চক্ষুকে অন্তর্মুখ করা। যখন এরূপ হইবে, তখনই অন্তরাত্মা মহিমা দেখিতে পাইবে।
