অতএব সর্ব মলিনতা অপসারিত হলে, সর্ব স্থূলতা দূরীভূত হলে—সৎ ও পবিত্র স্বভাবের মধ্য দিয়ে মানুষ উপলব্ধি করে—যীশুখ্রীষ্ট যেমন বলেছিলেন—‘আমি এবং আমার পিতা এক ও অভিন্ন।’
বৈদান্তিকগণ সকলের জন্য ধৈর্য ধারণ করে অপেক্ষা করতে পারেন। যেখানে যে অবস্থাতেই আমরা থাকি না কেন, ‘আমি এবং পরমপিতা ঈশ্বর অভিন্ন’—এ উপলব্ধিই শ্রেষ্ঠ উপলব্ধি। এটিকে উপলব্ধি করতে হয়। যদি মূর্তিপূজা এ উপলব্ধির সহায়ক হয়, তবে মূর্তিপূজাই বিধেয়। যদি কোন মহাপুরুষ এ-বিষয়ে সাহায্য করতে সক্ষম হন, তবে তাঁকেই পূজা কর। যদি মহম্মদকে পূজা করলে কাজ হয়, তবে তাই কর। কিন্তু যা-ই করবে, ঐকান্তিক নিষ্ঠার সঙ্গে কর। বেদান্ত-মতে নিষ্ঠাই সিদ্ধির ধ্রুব সহায়ক। কেউ বাদ যাবে না, কেউ প্রত্যাখ্যাত হবে না। তোমার চিত্ত—যেখানে সর্বসত্য নিহিত—ধীরে ধীরে পর্যায়ে পর্যায়ে বিকশিত হবে এবং চরমে এই পরমতত্ত্ব তুমি উপলব্ধি করবে, ‘তুমি ও তোমার পরমপিতা এক ও অভিন্ন।’
মুক্তি কি? ব্রাহ্মী স্থিতিই মুক্তি। কিন্তু কোথায় সেই ব্রাহ্মী স্থিতি? সর্বত্র, সর্বস্থানে ও সর্বকালে যে ব্রাহ্মী স্থিতি, তাকেই ‘মুক্তি’ বলে।
এই যে বর্তমান মুহূর্তটি, বর্তমান ক্ষণটি—মহাকালের বুকে যে-কোন মুহূর্তেরই মত সেটি পরম মূল্যবান এই হচ্ছে প্রাচীন বেদের মহতী বার্তা। বৌদ্ধর্ধমের প্রভাবে এই বার্তা পুনর্জীবিত হয়েছিল। বৌদ্ধধর্ম ভারতবর্ষ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়েছিল সত্য, কিন্তু ভারতের জাতীয় জীবনে সে এক অক্ষয় চিহ্ন রেখে গিয়েছে—দাক্ষিণ্যে ও জীবজন্তুর প্রতি অহিংসায়।আর আজ ভারতের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত বৈদান্তিক মতবাদ তার বিজয় অভিযান শুরু
৪০. শ্রেয়োলাভের পথ
আজ সন্ধ্যায় বেদের একটি কাহিনী তোমাদিগকে বলিব। বেদ হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ও বিশাল সাহিত্য, ইহার শেষাংশ অর্থাৎ বেদের শ্রেষ্ঠভাগ নামে অভিহিত। ইহাতে নানাবিধ তত্ত্ব ও দর্শন প্রতিপাদিত হইয়াছে। ইহা প্রাচীন সংস্কৃতে রচিত, এবং স্মরণ রাখিবে বহু সহস্র বৎসর পূর্বে লিপিবদ্ধ হইয়াছে। এক ব্যক্তি একমহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিবার সঙ্কল্প করেন। হিন্দুধর্মে যজ্ঞের স্থান গুরুত্বপূর্ণ। যজ্ঞ নানাপ্রকার। যজ্ঞে বেদী নির্মিত হয়, যজ্ঞাগ্নিতে ঘৃতাহুতি দেওয়া হয় এবং নানাবিধ মন্ত্র উচ্চারিত হয়। যজ্ঞশেষে ব্রাহ্মণ ও দরিদ্রগণকে দান করা হয়। প্রত্যেক যজ্ঞে বিশেষ বস্তু দান করা হয়। একপ্রকার যজ্ঞ ছিল, যাহাতে অনুষ্ঠাতাকে সর্বস্ব দান করিতে হইত। যে ব্যক্তির কথা আমরা বলিতেছি, তিনি ধনী হইলেও কৃপণ স্বভাব ছিলেন এবং এই অতি কঠিন যজ্ঞ অনুষ্ঠান করিয়া সুনাম অর্জন করিতে ইচ্ছুক হইলেন। যজ্ঞে সর্বস্ব দান না করিয়া তিনি শুধু অন্ধ, খঞ্জ, বৃদ্ধ ও দুগ্ধ দেওয়া শেষ হইয়াছে এমন সব গাভী দান করিলেন। কিন্তু নচিকেতা নামে তাঁহার গুণী যুবা-পুত্র লক্ষ্য করিল যে, পিতা শুধু জরাজীর্ণ গাভীগুলি দান করিতেছেন এবং ভাবিল ইহা দ্বারা যজ্ঞে কোন সুফল লাভ হইবে না। অতএব সে নিজেকে দান করিয়া ক্ষতিপূরণ করিতে কৃতসঙ্কল্প হইল। পিতার নিকট গিয়া বালক বলিল, পিতা আমাকে তুমি কাহার হাতে অর্পণ করিবে?পিতা কোন উত্তর দিলেন না। বালক দ্বিতীয় ও তৃতীয় বার একই কথা জিজ্ঞাসা করিল। ইহাতে পিতা বিরক্ত হয়ে বলিলেন, ‘তোকে যমের হাতে দিলাম—মৃত্যুর কাছে অর্পণ করিলাম।’ বালক সরাসরি যমের বাড়ীতে গেল। যম তখন বাড়ীতে ছিলেন না, অতএব বালক যমের জন্য অপেক্ষা করিল। তিনদিন পর যম বাড়ীতে ফিরিয়া বালককে দেখিয়া বললেন, ‘ব্রাহ্মণ তুমি আমার অতিথি: তুমি আমার বাড়ীতে তিনদিন অনাহারে আছ। নমস্কার, তোমার এই কষ্টের ক্ষতিপূরণস্বরূপ তোমাকে তিনটি বর দিব।’
তারপর বালক প্রথম বর চাইল, ‘আমার প্রতি বাবার ক্রোধ যেন শান্ত হয়।’ দ্বিতীয় বরে বালক একটি যজ্ঞের বিষয়ে জানিতে চাহিল। তৃতীয় বরে বালক জানিতে চাহিল—‘মানুষ মরিলে কোথায় যায়? কেহ কেহ বলে তাহার অস্তিত্ব থাকে না। আবার কেহ কেহ বলে তাহার অস্তিত্ব থাকে। দয়া করিয়া ইহার উত্তর দিন। ইহাই আমার তৃতীয় বর’।তারপর যম উত্তর করিলেন, ‘প্রাচীনকালে দেবতারা এই রহস্য উদ্ঘাটন করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন; এই রহস্য এত সূক্ষ্ম যে ইহা জানা কঠিন। অন্য কোন বর চাও; এই বরটি চাহিও না। শতায়ু জীবন চাও, গোধন অশ্ব ও বৃহৎ রাজ্য চাও। এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমাকে পীড়াপীড়ি করিও না। মানুষের যাহা কিছু ভোগ্যবস্তু আছে, সে-সব চাও, তোমার ইচ্ছা পূর্ণ করিব, কিন্তু এই রহস্য জানিবার ইচ্ছা করিও না। বালক বলিল, ‘না, মহাভাগ, মানুষ বিত্ত দ্বারা সন্তুষ্ট হয় না; আপনার দর্শন পাইয়া বিত্ত চাহিলে আমরা বিত্ত পাইয়া থাকি। আপনার ইচ্ছায় আমরা দীর্ঘজীবীও হইতে পারি। সঙ্গীত ও নৃত্য দ্বারা যে আনন্দ পাওয়া যায়, তাহার প্রকৃতি জানিয়া পৃথিবীর কোন মরণশীল বুদ্ধিমান্ ব্যক্তি অজর ও অমর দেবগণের সমীপে উপস্থিত হইয়া দীর্ঘায়ুলাভে তৃপ্ত হইবে? অতএব পরলোকের এই মহান্ রহস্যটি আমাকে বলুন, আমি অন্য কিছুই চাহি না।’ নচিকেতা এই মৃত্যু-রহস্যই জানিতে চাহিতেছে। যম ইহাতে প্রসন্ন হইলেন।
পূর্বের দুই-তিনটি বক্তৃতায় বলিয়াছি যে, এই জ্ঞান মনকে প্রস্তুত করে। অতএব তোমরা দেখিতেছ, প্রথম প্রস্তুতি এই—মানুষ সত্য ছাড়া আর কিছুই চাহিবে না, এবং সত্যের জন্যই সত্য চাহিবে। যম নচিকেতাকে যে-সকল বস্তু দিতে চাহিয়াছিলেন, বালক সে-সবই প্রত্যাখ্যান করিল। শুধু এই জ্ঞানের—এই সত্যের জন্য বালক ধন-সম্পদ দীর্ঘায়ু সব-কিছুই ত্যাগ করিতে প্রস্তুত ছিল। এইভাবেই সত্যলাভ হয়। যম প্রসন্ন হইলেন। তিনি বলিলেন, ‘দুইটি পথ আছে—প্রেয় ও শ্রেয়। এই দুইটি নানাভাবে মানুষকে আবদ্ধ করে। এই দুইটির মধ্যে যিনি শ্রেয়ের (নিবৃত্তির) পথ গ্রহণ করেন, তাঁহার মঙ্গল হয় আর যে প্রেয়ের পথ অবলম্বন করে সে অধোগামী হয়। নচিকেতা, আমি তোমার প্রশংসা করি। তুমি ভোগ্যবস্তু চাও নাই। তোমাকে ভোগের দিকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করিতে চেষ্টা করিয়াছি। তুমি সবই প্রত্যখ্যান করিয়াছ—তুমি জানিয়াছ যে, ভোগ অপেক্ষা জ্ঞান বহুল পরিমাণে মহত্তর।
