নরেন্দ্র
২২৭*
[মিঃ স্টার্ডিকে লিখিত]
৮০ ওকলি ষ্ট্রীট, লণ্ডন
৩১ অক্টোবর, ১৮৯৫, বৈকাল ৫টা
প্রিয় বন্ধু,
এইমাত্র দুইজন যুবক ভদ্রলোক, মিঃ সিলভারলক এবং তাঁহার বন্ধু চলে গেলেন। মিস মূলার তো আজ বিকালে এসেছিলেন এবং এঁদের আসার সঙ্গে সঙ্গে চলে যান।
এঁদের একজন ইঞ্জিনীয়র, আর একজন শস্যের ব্যবসা করেন। দর্শন ও বিজ্ঞানের অনেক গ্রন্থ এঁরা পড়েছেন এবং উভয়ে শাস্ত্রের আধুনিকতম সিদ্ধান্তগুলির সঙ্গে হিন্দুদিগের প্রাচীন চিন্তাধারার অপূর্ব মিল দেখে বিস্মিত হয়েছেন। দুজনেই চমৎকার লোক—বেশ বুদ্ধিমান ও পণ্ডিত। একজন গীর্জার সঙ্গে সম্বন্ধ ত্যাগ করেছেন, আর একজন করবেন কিনা আমায় জিজ্ঞাসা করলেন।
এঁদের সঙ্গে আলাপ হবার পর দুটি জিনিষ আমার মনে জাগছে। প্রথমতঃ ঐ বইখানি আমাদের তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে। এর ভেতর দিয়ে আমরা এমন একদল লোকের সংস্পর্শে আসতে পারব, যাঁরা দার্শনিক ভিত্তিতে ধর্মকে গ্রহণ করেন এবং অলৌকিকতা একদম পছন্দ করেন না। দ্বিতীয়তঃ এঁরা দুজনেই আমার ধর্মের আনুষ্ঠানিক দিকটা জানতে চান। এতে আমার চোখ খুলেছে। জগতের সাধারণ লোক চায়—কোন প্রকার অবলম্বন। বস্তুতঃ সাধারণভাবে বলতে গেলে অনুষ্ঠানের মধ্যে যখন দর্শন (Philosophy) রূপপরিগ্রহ করে, তখনই তাকে ‘ধর্ম’ বলা হয়। তাই ধর্মমন্দির ও কিছু ক্রিয়াকলাপ থাকা নিতান্তই আবশ্যক অর্থাৎ আমাদের যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি কিছু ক্রিয়াকলাপ ঠিক করে ফেলতে হবে।
যদি আপনি শনিবার সকালে বা তার পূর্বে আসতে পারেন, তবে আমরা ‘এসিয়াটিক সোসাইটিতে’ যাব, কিম্বা আপনিই আমার জন্য ‘হেমাদ্রিকোষ’ নামক গ্রন্থখানি সংগ্রহ করতে পারেন; ঐ পুস্তকে আমরা যা চাই, তা পাব। উপনিষদগুলিও নিয়ে আসবেন। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যুকালের মধ্যে আমরা একটা কিছু অপূর্ব সিদ্ধান্ত সুদৃঢ় করে ধরতে পারব; অসম্বদ্ধ দার্শনিক মতবাদ মানবজীবনের উপর কোনই প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।
আমরা যদি আমাদের ক্লাসগুলি শেষ হবার আগেই বইটি শেষ করে ফেলতে পারি এবং দু-একটি অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে সেটি সর্বসাধারণের মধ্যে প্রকাশ করতে পারি, তবে বইখানি চালু হয়ে যাবে। এরা চায় সঙ্ঘবদ্ধ হতে, আর চায় ক্রিয়াকলাপ। আর ঠিক এটিই একটি কারণ, যার জন্য ‘—’রা পাশ্চাত্য জনসাধারণের উপর কোনদিনই প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না।
‘নৈতিক সমিতি’র প্রস্তাবে সম্মত হওয়ায় তারা আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আর একখানা পত্র লিখেছে এবং তাদের একখানা ফরমও পাঠিয়েছে। তাদের ইচ্ছা যে, আমি একখানা বই সঙ্গে নিয়ে যাই এবং তা থেকে দশ মিনিট পাঠ করি। আপনি দয়া করে গীতার অনুবাদ এবং বৌদ্ধ জাতকের অনুবাদটি নিয়ে আসবেন কি? আপনার সঙ্গে দেখা না করে আমি এ বিষয়ে কিছুই করব না। আমার ভালবাসা ও শুভেচ্ছা জানবেন। ইতি
বিবেকানন্দ
২২৮*
৮০ ওকলি ষ্ট্রীট, লণ্ডন
৩১ অক্টোবর, ১৮৯৫
প্রিয় জো জো,
শুক্রবার সানন্দে তোমার ওখানে মধ্যাহ্নভোজন এবং এলবেমার্লে মিঃ কয়েটের সহিত আলাপ করব।
মিসেস ও মিস নেটার নামে দু-জন আমেরিকান মহিলা—মাতা ও কন্যা—গত রাত্রের ক্লাসে যোগদান করেন। তাঁরা যথার্থ অনুরক্ত বলে মনে হয়। মিস চেমিয়ার্সের ওখানে যে ক্লাস হত তা শেষ হল। আগামী শনিবার রাত্রি থেকে আমার বাসাতেই হবে। আমার ক্লাসের জন্য দু-একখানা চলনসই বড় ঘর পাব, আশা করি। মন্কিওর কন্ওয়ের নৈতিক সমিতির (Moncure Conway’s Ethical Society) নিমন্ত্রণে ১০ তারিখে তাদের ওখানে বক্তৃতা দেব। আগামী মঙ্গলবার ব্যাল্বোয়া সমিতিতে (Balboa Society) বক্তৃতা। প্রভু সাহায্য করবেন। শনিবার তোমার সঙ্গে বেরুতে পারব কিনা ঠিক নেই। তবুও শহরের বাইরে তোমার খুবই ভাল লাগবে, তা ছাড়া মিঃ ও মিসেস স্টার্ডি অতি চমৎকার লোক।
ভালবাসা, আশীর্বাদ জানবে। ইতি
বিবেকানন্দ
পুনশ্চ—আমার জন্য কিছু নিরামিষ তরকারির ব্যবস্থা রেখ। ভাতের তেমন পক্ষপাতী নই, রুটি হলেও বেশ চলবে। আজকাল যা নিরামিষাশী হয়েছি, বলবার নয়।
২২৯
[স্বামী ব্রহ্মানন্দকে লিখিত]
C/o E. T. Sturdy
কেভার্শ্যাম, রিডিং, ইংলণ্ড
১৮৯৫
অভিন্নহৃদয়েষু,
তোমার ও সান্যালের পত্রে সবিশেষ অবগত হইলাম। তোমার চিঠি লেখার দুইটি দোষ—বিশেষ তোমার। প্রথম—যে-সকল কাজের কথা জিজ্ঞাসা করি, প্রায় তার কোনটিরই জবাব থাকে না; দ্বিতীয়—জবাব লেখায় অত্যন্ত বিলম্ব। তোমরা তো ঘরে বসে আছ ভায়া! আমাকে এ বিদেশে পেটের চেষ্টা করতে হয়, আবার দিনরাত খাটতে হয়; তার উপর লাটিমের মত ঘুরে বেড়ান। … আমি এখন বেশ বুঝতে পারছি যে, আমায় একা কাজ করতে হবে।
শশী সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত বটে; কিন্তু তোমরা খালি শশীর আসা সম্ভব কিনা তাই বিচার করছ। … এ সকল হল মহাবিলাসী বাবুর দেশ; নখের কোণে একটু ময়লা থাকলে তাকে স্পর্শ করে না। শরৎ আসতে না চায় সারদাকে পাঠাবে। অথবা মান্দ্রাজে লিখে কোন লোক পাঠাবে। প্রায় দু-মাস পূর্বে আমি এ-বিষয়ে লিখেছি। তারকদা শেষ পত্রে লিখেন যে, পর মেলে (ডাকে) এ-বিষয়ে সবিশেষ জানাবে। কিন্তু এখনও দেখছি তার কিছুই ঠিকানা হয় নাই। আশা ছিল—আমি থাকতে থাকতেই কেউ আসবে; কিন্তু এখনও তো কিছুই ঠিকানা নাই, এবং দু-বছরে এক-একটা সংবাদ আসে। Business is business—অর্থাৎ কাজকর্ম তৎপর করতে হয়, গড়িমসির কাজ নয়। আসছে সপ্তাহের শেষে আমি আমেরিকায় যাব। অতএব যে আসবে, তার সঙ্গে সাক্ষাতের কোন আশা নাই।
