আবার যে-সকল ইংরেজ পুরুষ এবং নারী ভারতবর্ষকে ভালবাসে, তারা হিন্দুদের চেয়েও বেশী ‘হিন্দু’। আপনি শুনে বিস্মিত হবেন যে, এখানে আমি নিখুঁত ভারতীয় পদ্ধতিতে প্রস্তুত প্রচুর তরিতরকারী পাচ্ছি। যখন একজন ইংরেজ একটি জিনিষ ধরে, সে তখন তার গভীরতম দেশে প্রবেশ করে। গতকাল জনৈক অধ্যাপক মিঃ ফ্রেজারের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে—তিনি এখানে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মচারী। তিনি তাঁর অর্ধেক জীবন ভারতে কাটিয়েছেন; প্রাচীন চিন্তা ও জ্ঞানের মধ্যে তিনি এতখানি পুষ্ট হয়েছেন যে, ভারতের বাইরের কোন কিছুর জন্য তিনি মোটেই পরোয়া করেন না। শুনে আশ্চর্য হবেন যে, অনেক চিন্তাশীল ইংরেজ নরনারী মনে করে যে, হিন্দুদের জাতিবিভাগই সামাজিক সমস্যার একমাত্র সমাধান। আপনি হয়তো কল্পনা করতে পারবেন, সেই ধারণা মাথায় নিয়ে তারা সমাজতন্ত্রী ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রীদের কতখানি ঘৃণা করে!! আবার এখানে পুরুষেরা—অতি উচ্চশিক্ষিতেরা—ভারতীয় চিন্তাধারা সম্পর্কে গভীর আগ্রহশীল, সে তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা খুব কম। আমেরিকার চেয়ে এখানে মেয়েদের জীবনের পরিধিও সংকীর্ণতর। এ পর্যন্ত আমার সব কিছুই ভালয় ভালয় হয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী ঘটনাবলী জানাব। গৃহস্বামী, রাণীমাতা, জো জো এবং শিশুদের ভালবাসা।
আপনাদের চিরদিনের
বিবেকানন্দ
২২৪*
রিডিং, ইংলণ্ড
২০ অক্টোবর, ১৮৯৫
প্রিয় জো জো,
এই পত্রে লেগেটদিগকে লণ্ডনে স্বাগত জানাচ্ছি। এক হিসাবে এদেশ আমার মাতৃভূমি, সুতরাং পূর্বেই তোমাদিগকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছি। পরে আগামী মঙ্গলবার ২২ তারিখে সন্ধ্যা সাড়ে আটটায় প্রিন্সেস হলে আমি তোমাদের অভ্যর্থনা গ্রহণ করব।
মঙ্গলবার পর্যন্ত আমি এত ব্যস্ত থাকব যে, এর মধ্যে কোনক্রমেই তোমার সঙ্গে দেখা করে উঠতে পারব না। তারপর যে-কোন দিন দেখা করব। চাই কি মঙ্গলবার দিনও গিয়ে পড়তে পারি।
চিরদিনের ভালবাসা ও আশীর্বাদ জানবে।
তোমাদের
বিবেকানন্দ
১২. পত্রাবলী ২২৫-২৩৪
২২৫*
C/o E. T. Sturdy,রিডিং, ইংলণ্ড
২৪ অক্টোবর,১৮৯৫
প্রিয় আলাসিঙ্গা,
‘ব্রহ্মবাদিনের’ দুটি সংখ্যা পেলাম—বেশ হয়েছে—এইরূপ করে চল। কাগজের প্রচ্ছদপট একটু ভাল করবার চেষ্টা কর, আর সংক্ষিপ্ত সম্পাদকীয় মন্তব্যগুলির ভাষাটা আর একটু হালকা অথচ ভাবগুলি একটু চটকদার করবার চেষ্টা কর। গুরুগম্ভীর ভাষা ও ছাঁদ কেবল প্রধান প্রধান প্রবন্ধগুলির জন্য রেখে দাও। মিঃ স্টার্ডি কয়েকটি প্রবন্ধ লিখবেন। আমি তোমাকে কয়েকখানা কাগজও পাঠাচ্ছি—তার মধ্যে দুখানা যথাক্রমে ধর্মমহাসভা ও মিশনরীগণ সম্বন্ধে। কাগজখানা ইংলিশ চার্চের উন্নতিশীল সম্প্রদায়ের অন্যতম মুখপত্র। আমার অনুমান—সম্পাদকপত্নী আমাকে এগুলি পাঠিয়ে দিয়েছেন, কারণ তাঁর বৈঠকখানায় আমি শীঘ্র বক্তৃতা দেব। সম্পাদকের নাম মিঃ হাউইস—তিনি ইংলিশ চার্চের একজন বিখ্যাত পুরোহিত।
ইতোমধ্যেই এখানে আমার প্রথম বক্তৃতা হয়ে গেছে, আর ‘স্ট্যাণ্ডার্ড’ কাগজের মন্তব্য পড়লেই বুঝতে পারবে, লোকে তা কেমন ভালভাবে নিয়েছে। ‘স্ট্যাণ্ডার্ড’ রক্ষণশীল সম্প্রদায়ের বিশেষ শক্তিশালী কাগজগুলির মধ্যে অন্যতম। আগামী মঙ্গলবার লণ্ডনে গিয়ে ৮০ ওকলি ষ্ট্রীট, (Chelsea, London, S.W.) ঠিকানায় একমাস থাকব। তারপর আমেরিকায় ফিরে গিয়ে আবার আগামী গ্রীষ্মে এখানে আসব। এ পর্যন্ত দেখছ, ইংলণ্ডে সুন্দরভাবে বীজ বপন করা হয়েছে। আমার অনুপস্থিতিতে মিঃ স্টাডি—আমার এক সন্ন্যাসী গুরুভ্রাতা, যিনি শীঘ্রই এখানে আসছেন, তাঁর সঙ্গে মিলে ক্লাসগুলি চালাবেন।
সাহস অবলম্বন কর ও কাজ করে যাও। ধৈর্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করে যাও—এই একমাত্র উপায়। আমি দ্বিতীয়বার আমেরিকা থেকে তোমাদের যে টাকা পাঠিয়েছি, তা সম্ভবতঃ নিরাপদে পৌঁছেছে। ঐ টাকার প্রাপ্তিস্বীকার আমেরিকায় করবে, কারণ এই পত্র তোমাদের নিকট পৌঁছবার পূর্বেই আমি আমেরিকায় ফিরব। তোমাদের অবশ্য আমার 19W. 38th Street, নিউ ইয়র্ক, আমেরিকা—এই ঠিকানাটা মনে আছে। তোমরা অবশ্য কেভার্শ্যাম ইত্যাদি ঠিকানায় মিঃ স্টার্ডিকে পত্র লিখবে এবং তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ পত্রব্যবহার করবে। মান্দ্রাজের সঙ্গে পত্রব্যবহারের প্রতিনিধি হবে তুমি, কলিকাতায় মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত, আমেরিকায় মিস মেরী ফিলিপ্স্, নিউ ইয়র্ক—এইরূপ চলতে থাকুক। এখন কাগজটার দিকে পুরোপুরি মনোযোগ দাও। এটা যাতে দৃঢ়প্রতিষ্ঠিত হয়, তার চেষ্টা কর। মিঃ স্টার্ডি সময়ে সময়ে লিখবেন—আমিও লিখব। এখন আমি আর টাকা পাঠাতে পারব না—ইংলণ্ডে বক্তৃতা দিয়ে পয়সা পাওয়া যায় না, সুতরাং আমাকে এখানে সব টাকা খরচ করতে হয়েছে, এক পয়সাও লাভ হয়নি। ক্রমে ক্রমে এখানে এমন বন্ধু পাব, যারা সাময়িক পত্র প্রভৃতির জন্য টাকা খরচ করবে। কাজ করে চল—ধৈর্য, পবিত্রতা, সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করে যাও—এই ক-টি বিষয় মনে রেখো। লণ্ডনে মেননের সঙ্গে আমার কয়েকবার দেখা হয়েছিল। এখন কাগজখানাকে দাঁড় করবার জন্য সমগ্র শক্তি প্রয়োগ কর। যতদিন পর্যন্ত তুমি সরল ও পবিত্র থাকবে, ততদিন পর্যন্ত কখনও বিফল হবে না; মা তোমায় ত্যাগ করবেন না, তোমার ওপর তাঁর সর্বপ্রকার শুভাশিস বর্ষিত হবে। ইতি
তোমার
বিবেকানন্দ
