কি সামাজিক, কি রাজনৈতিক, কি আধ্যাত্মিক—সকল ক্ষেত্রেই যথার্থ কল্যাণের ভিত্তি একটিই আছে, সেটি—এইটুকু জানা যে, ‘আমি ও আমার ভাই এক।’ সর্বদেশে সর্বজাতির পক্ষেই এ কথা সমভাবে সত্য। আমি বলিতে চাই, প্রাচ্য অপেক্ষা পাশ্চাত্যই এ তত্ত্ব আরও শীঘ্র ধারণা করিতে পারিবে। কারণ এই চিন্তাসূত্রটির প্রণয়নে এবং মুষ্টিমেয় কয়েকজন অনুভূতিসম্পন্ন ব্যক্তি উৎপন্ন করিয়াই প্রাচ্যের সমুদয় ক্ষমতা প্রায় নিঃশেষিত।
আমরা যেন নাম, যশ ও প্রভুত্ব-স্পৃহা বিসর্জন দিয়া কর্মে ব্রতী হই। আমরা যেন কাম, ক্রোধ ও লোভের বন্ধন হইতে মুক্ত হই। তাহা হইলেই আমরা সত্য বস্তু লাভ করিব।
ভগবৎপদাশ্রিত
আপনার বিবেকানন্দ
২০৯*
[মিঃ লেগেটকে লিখিত]
Thousand Island Park, N.Y.
অগষ্ট, ১৮৯৫
প্রিয় মিসেস বুল,
… মিঃ স্টার্ডির (যাঁর কথা সেদিন আপনাকে লিখেছি) কাছ থেকে আর একখানা পত্র পেলাম। এখানি আপনাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। দেখুন, সমস্ত কেমন আগে থেকে তৈরী হয়ে আসছে! এখানি ও মিঃ লেগেটের নিমন্ত্রণপত্র একসঙ্গে দেখলে, আপনার কি এটি দৈব আহ্বান বলে মনে হয় না? আমি ঐরূপ মনে করি। সুতরাং ঐ আহ্বান অনুসরণ করছি। অগষ্টের শেষাশেষি মিঃ লেগেটের সঙ্গে আমি পারি যাব এবং সেখানে থেকে লণ্ডন। … হেল-পরিবারের সঙ্গে দেখা করবার জন্য চিকাগো যেতে হবে। সুতরাং গ্রীনএকার সম্মিলনীতে যোগ দিতে পারলাম না।
আমার গুরুভাইদের ও আমার কাজের জন্য আপনি যতটুকু সাহায্য করতে পারেন, কেবল সেইটুকু সাহায্যই আমি এখন চাই। আমি আমার স্বদেশবাসীর প্রতি কর্তব্য কতকটা করেছি। এখন জগতের জন্য—যার কাজ থেকে এই দেহ পেয়েছি, দেশের জন্য—যে দেশ আমাকে ভাব দিয়েছে, মনুষ্যজাতির জন্য—যাদের মধ্যে আমি নিজেকে একজন বলতে পারি, কিছু করব। যতই বয়স বাড়ছে, ততই ‘মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী’ হিন্দুদের এই মতবাদের তাৎপর্য বুঝতে পাচ্ছি। মুসলমানেরাও তাই বলেন। আল্লা দেবদূতগণকে (Angels) বলেছিলেন আদমকে প্রণাম করতে। ইবলিস্ করেনি, তাই সে শয়তান (Satan) হল। এই পৃথিবী যাবতীয় স্বর্গাপেক্ষা উচ্চ—ইহাই জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষালয়। আর মঙ্গল ও বৃহস্পতি গ্রহের লোকেরা নিশ্চয়ই আমাদের অপেক্ষা নিম্নশ্রেণীর—তারা যখন আমাদের সঙ্গে সংবাদ আদানপ্রদান করতে পারে না। তথাকথিত উচ্চপ্রাণিগণ পরলোকগত অপর এক দেহধারী ব্যক্তি ছাড়া আর কিছুই নয়; ঐ দেহ সূক্ষ্ম হলেও বস্তুতঃ হস্তপদাদিবিশিষ্ট মানবদেহই। তারা এই পৃথিবীতে অপর কোন লোকে বাস করে, একেবারে অদৃশ্যও নয়। তারা চিন্তা করে, আমাদের ন্যায় তাদেরও জ্ঞান ও অন্যান্য সব কিছুই আছে—সুতরাং তারাও মানুষ। দেবগণ—এঞ্জেলগণও তাই। কিন্তু কেবল মানুষই ঈশ্বর হয় এবং অন্যান্য সকলে পুনরায় মানবজন্ম গ্রহণ করে তবে ঈশ্বরত্ব লাভ করতে পারে। ম্যাক্সমূলারের শেষ প্রবন্ধটি আপনার কেমন লাগল? ইতি
বিবেকানন্দ
২১০*
আমেরিকা
অগষ্ট, ১৮৯৫
প্রিয় আলাসিঙ্গা,
এই পত্রখানি তোমার কাছে পৌঁছবার পূর্বেই আমি পারিতে উপস্থিত হব। সুতরাং কলিকাতা ও খেতড়িতে লিখে দিও যে, উপস্থিত যেন সেখান থেকে আমেরিকার ঠিকানায় চিঠি না লেখে। তবে আগামী শীতেই আবার নিউ ইয়র্কে ফিরছি। সুতরাং যদি বিশেষ কিছু প্রয়োজনীয় সংবাদ থাকে, তবে নিউ ইয়র্কে 19 W. 38th St. ঠিকানায় পাঠাবে। এ বছর আমি অনেক কাজ করেছি, আসছে বছর আরও অনেক কিছু করবার আশা রাখি। মিশনরীদের বিষয় নিয়ে মাথা ঘামিও না। তারা চেঁচাবে, এ স্বাভাবিক। অন্ন মারা গেলে কে না চেঁচায়? গত দুই বৎসর মিশনরী ফণ্ডে মস্ত ফাঁক পড়েছে, আর সে-ফাঁকটা বেড়েই চলেছে। যাই হোক, আমি মিশনরীদের সম্পূর্ণ সাফল্য কামনা করি। যতদিন তোমাদের ঈশ্বর ও গুরুর ওপর অনুরাগ থাকবে, আর সত্যের ওপর বিশ্বাস থাকবে, ততদিন হে বৎস, কিছুতেই তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। কিন্তু এর মধ্যে একটি গেলেই বিপদ। তুমি বেশ বলেছ, আমার ভাবগুলি ভারত অপেক্ষা পাশ্চাত্য দেশে বেশী পরিমাণে কার্যে পরিণত হতে চলেছে। আর প্রকৃতপক্ষে ভারত আমার জন্য যা করেছে, আমি ভারতের জন্য তার চেয়ে বেশী করেছি। এক টুকরো রুটি ও তার সঙ্গে ঝুড়িখানেক গালাগাল—এই তো সেখানে পেয়েছি। আমি সত্যে বিশ্বাসী; আমি যেখানেই যাই না কেন, প্রভু আমার জন্য দলে দলে কর্মী প্রেরণ করেন। আর তারা ভারতীয় শিষ্যদের মত নয়, তারা গুরুর জন্য জীবন ত্যাগ করতে প্রস্তুত। সত্যই আমার ঈশ্বর—সমগ্র জগৎ আমার দেশ। আমি ‘কর্তব্যে’ বিশ্বাসী নই, ‘কর্তব্য’ হচ্ছে সংসারীর পক্ষে অভিশাপ, সন্ন্যাসীর জন্য নয়। ‘কর্তব্য’ একটা বাজে কথামাত্র। আমি মুক্ত, আমার বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেছে—এই শরীর কোথায় যায় বা না যায়, আমি কি তা গ্রাহ্য করি? তোমরা আমাকে বরাবর ঠিক ঠিক সাহায্য করে এসেছ—প্রভু তোমাদের তার পুরস্কার দেবেন। আমি ভারত বা আমেরিকা থেকে কখনও প্রশংসা চাইনি, আর এখনও ঐরূপ ফাঁকা জিনিষ খুঁজছি না। আমি ভগবানের সন্তান, আমার কাছে একটা সত্য আছে—জগৎকে শেখাবার জন্য। আর যিনি আমাকে ঐ সত্য দিয়েছেন, তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে সাহসী ব্যক্তিদের মধ্য থেকে আমাকে সহকর্মী সব প্রেরণ করবেন। তোমরা—হিন্দুরা কয়েক বছরের ভেতরই দেখবে, প্রভু পাশ্চাত্য দেশে কি কাণ্ড করেন! তোমরা সেই প্রাচীনকালের য়াহুদী জাতির মত—জাব পাত্রে শোয়া কুকুরের মত—নিজেরাও খাবে না, অপরকেও খেতে দেবে না। তোমাদের ধর্মভাব মোটেই নেই; রান্নাঘর হচ্ছে তোমাদের ঈশ্বর, শাস্ত্র—ভাতের হাঁড়ি। আর তোমাদের শক্তির পরিচয়—রাশি রাশি সন্তান-উৎপাদনে। তোমরা কয়েকটি ছেলে খুব সাহসী, কিন্তু কখনও কখনও আমার মনে হয়, তোমরাও বিশ্বাস হারাচ্ছ। বৎসগণ, কামড়ে পড়ে থাক, আমার সন্তানগণের মধ্যে কেউ যেন কাপুরুষ না থাকে। তোমাদের মধ্যে যে সর্বাপেক্ষা সাহসী, সর্বদা তার সঙ্গ করবে। বড় বড় ব্যাপার কি কখনও সহজে নিষ্পন্ন হয়? সময়, ধৈর্য ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে কাজ হয়। আমি তোমাদের এখন অনেক কথা বলতে পারতাম, যাতে তোমাদের হৃদয় আনন্দে লাফিয়ে ওঠে, কিন্তু তা আমি বলব না। আমি লৌহবৎ দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও হৃদয় চাই, যা কিছুতেই কম্পিত হয় না। দৃঢ়ভাবে লেগে থাক। প্রভু তোমাদের আশীর্বাদ করুন।
