[মিঃ লেগেটকে লিখিত]
C/o Miss Dutcher
Thousand Island Park, N.Y.
৩১ জুলাই, ১৮৯৫
প্রিয় বন্ধু,
এর পূর্বে আমি আপনাকে একখানা চিঠি লিখেছিলাম; মনে হচ্ছে, সেটি সাবধানে ডাকে দেওয়া হয়নি, তাই আর একখানা লিখছি।
১৪ তারিখের পূর্বে আমি যথাসময়ে গিয়ে পৌঁছব। ১১ তারিখের পূর্বে যে করেই হোক আমাকে নিউ ইয়র্কে যেতে হবে। সুতরাং প্রস্তুত হবার যথেষ্ট সময় হাতে পাওয়া যাবে।
আমি আপনার সঙ্গে পারি-তে যাব, সঙ্গে যাবার প্রধান উদ্দেশ্য আপনাদের বিবাহ দেখা। আপনারা যখন ভ্রমণে বাহির হবেন, তখন আমি লণ্ডন চলে যাব। ব্যস্।
আপনার এবং আপনাদের সকলের প্রতি আমার চিরস্থায়ী ভালবাসা ও আশীর্বাদের পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন।
সতত আপনার পুত্র
বিবেকানন্দ
২০৬*
[মিঃ স্টার্ডিকে লিখিত]
19W. 38th St., নিউ ইয়র্ক
২ অগষ্ট, ১৮৯৫
সুহৃদ্বরেষু,
আপনার প্রীতিপূর্ণ পত্রখানি আজ পাইলাম। আমি জনৈক বন্ধুর সহিত প্রথমে পারি-তে যাইতেছি—১৭ অগষ্ট ইওরোপ যাত্রা করিতেছি। পারি-তে আমার বন্ধুর বিবাহ হওয়া পর্যন্ত (মাত্র এক সপ্তাহ) থাকিব, তারপর লণ্ডনে চলিয়া যাইব।
একটা প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তোলা সম্বন্ধে আপনার পরামর্শটি চমৎকার, এবং আমি ঐভাবেই অগ্রসর হইতে চেষ্টা করিতেছি।
এখানে আমার অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছেন; কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা এই যে, তাঁহাদের অধিকাংশই দরিদ্র। সুতরাং কাজও মন্থরগতিতে চলিতে বাধ্য। অধিকন্তু নিউ ইয়র্কে উল্লেখযোগ্য কিছু গড়িয়া তোলার আগে আরও কয়েক মাস খাটিতে হইবে। কাজেই এই শীতের গোড়ায় আমাকে নিউ ইয়র্কে ফিরিয়া আসিতে হইবে, এবং গ্রীষ্মে পুনরায় লণ্ডনে যাইব। এখন যতদূর মনে হইতেছে, তাহাতে এবারে সপ্তাহ-কয়েক মাত্র লণ্ডনে থাকিতে পারিব। কিন্তু ভগবানের কৃপায় হয়তো ঐ অল্প সময়েই গুরুতর বিষয়ের সূচনা হইতে পারে। কবে লণ্ডনে পৌঁছিব, তাহা আপনাকে তার করিয়া জানাইব।
থিওসফিষ্ট সম্প্রদায়ের জনকয়েক আমার নিউ ইয়র্কের ক্লাসে আসিয়াছিলেন। কিন্তু মানুষ যখনই বেদান্তের মহিমা বুঝিতে পারে, তখনই তাহাদের হিজি-বিজি ধারণাগুলি দূর হইয়া যায়।
আমার বরাবরের অভিজ্ঞতা, যখন মানুষ বেদান্তের মহান্ গৌরব উপলব্ধি করিতে পারে, তখন মন্ত্রতন্ত্রাদি আপনা হইতে দূর হইয়া যায়। যে মুহূর্তে মানুষ একটি উচ্চতর সত্যের আভাস পায়, সেই মুহূর্তে নিম্নতর সত্যটি স্বতই অন্তর্হিত হয়। সংখ্যাধিক্যে কিছুই যায় আসে না। বিশৃঙ্খলা জনতা শত বৎসরেও যাহা করিতে পারে না, মুষ্টিমেয় কয়েকটি সরল সঙ্ঘবদ্ধ এবং উৎসাহী যুবক এক বৎসরে তদপেক্ষা অধিক কাজ করিতে পারে। এক বস্তুর উত্তাপ নিকটবর্তী অন্যান্য বস্তুতে সঞ্চারিত হয়—ইহাই প্রকৃতির নিয়ম। সুতরাং যে পর্যন্ত আমাদের মধ্যে সেই জ্বলন্ত অনুরাগ, সত্যনিষ্ঠা, প্রেম ও সরলতা সঞ্জীবিত থাকিবে, ততক্ষণ আমাদের সাফল্য অবশ্যম্ভাবী। ‘সত্যমেব জয়তে নানৃতম্, সত্যেন পন্থা বিততো দেবযানঃ।’—এই সনাতন সত্য আমার বৈচিত্র্যময় জীবনে বহুবার পরীক্ষিত হইয়াছে। যিনি সৎস্বরূপে আপনার অন্তরে বিরাজিত, তিনিই সর্বক্ষণ আপনার অভ্রান্ত পথপ্রদর্শক হউন; অচিরে মুক্তির আলোকে আপনি স্বয়ং উদ্ভাসিত হইয়া অন্যকে মুক্ত হইতে সাহায্য করুন।
বিবেকানন্দ
২০৭
[স্বামী ব্রহ্মানন্দকে লিখিত]
19W, 38th St., নিউ ইয়র্ক
১৮৯৫
অভিন্নহৃদয়েষু,
… মা-ঠাকুরাণীকে আমার বহুত সাষ্টাঙ্গ প্রণাম জানাইবে।
শিব শিব !
এখন আমি নিউ ইয়র্ক শহরে। এ শহর গরমিকালে ঠিক কলকেতার মত গরম, অজস্র ঘাম বয়ে পড়ছে, হাওয়ার লেশ নাই। দুই মাস উত্তর দিকে গিয়েছিলাম, সেথায় বেশ ঠাণ্ডা। এ পত্রপাঠ জবাব লিখিবে। এ পত্র পৌঁছিবার পূর্বে আমি ইংলণ্ডে চলিলাম। ইতি
ঠিকানা: C/o Akshoy C. Ghosh
Muller, Juan Duff House, Regent St.,
Cambridge, England
২০৮*
[মিঃ স্টার্ডিকে লিখিত]
19W. 38th St., নিউ ইয়র্ক
৯ অগষ্ট, ১৮৯৫
সুহৃদ্বরেষু
… আমার ব্যক্তিগত মতামতের একটু আভাস দেওয়া দরকার। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, মানব সমাজে ধর্মের অপূর্ব উচ্ছ্বাস মধ্যে মধ্যে উত্থিত হইয়া থাকে এবং তেমনি এক উচ্ছ্বাস বর্তমানেও শিক্ষিত সমাজের মধ্যে দেখা দিয়েছে। প্রত্যেক উচ্ছ্বাসবেগ আবার বহু ক্ষুদ্র শাখায় বিভক্ত বলিয়া বোধ হইলেও মূলতঃ তাহারা যে একই তত্ত্ব বা তত্ত্বসমষ্টি হইতে উদ্ভূত, তাহাও তাহাদের পরস্পরের সাদৃশ্য হইতে বুঝিতে পারা যায়। বর্তমান সময়ে যে ধর্মভাব দিন দিন চিন্তাশীল ব্যক্তিমাত্রের মধ্যেই বিশেষ প্রভাব বিস্তার করিতেছে, তাহার একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, যত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মতবাদ উহা হইতে উদ্ভূত হইতেছে, তাহারা সকলেই সেই এক অদ্বৈত-তত্ত্বের অনুভূতি ও অনুসন্ধানেই সচেষ্ট। জাগতিক, নৈতিক এবং আত্মিক সকল ক্ষেত্রেই এই একটি ভাব দেখা যাইতেছে যে, বিভিন্ন মতবাদসমূহ ক্রমেই উদার হইতে উদারতর হইয়া সেই শাশ্বত অদ্বৈত-তত্ত্বের অভিমুখে অগ্রসর হইতেছে। সুতরাং ধরিয়া লইতে পারা যায় যে, বর্তমান যুগের যত ভাবান্দোলন আছে, জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে সেগুলি এক অপূর্ব ঐক্যমূলক দর্শন—অদ্বৈত বেদান্তের প্রতিরূপ; আর মানব আজ পর্যন্ত যত প্রকার একত্ববাদের দর্শন আবিষ্কার করিয়াছে, তন্মধ্যে ইহাই সর্বোত্তম। আবার ইহাও সর্বদা দেখা যায় যে, প্রতিযুগে এই সমস্ত বিভিন্ন মতবাদের সংঘর্ষের ফলে শেষ পর্যন্ত একটি মাত্র মতবাদই টিকিয়া যায় এবং অন্য তরঙ্গগুলি উঠে শুধু উহারই অঙ্গে মিশিয়ে গিয়া উহাকে একটি বিপুল ভাবতরঙ্গে পরিণত করিবার জন্য। তখন সেই প্রবল ভাবস্রোত সমাজের উপর দিয়া অপ্রতিহত বেগে বহিয়া যায়।
