যে মহাপুরুষ—হুজুক সাঙ্গ করে দেশে ফিরে যেতে লিখছেন, তাঁকে বলো কুকুরের মত কারুর পা চাটা আমার স্বভাব নহে। যদি সে মরদ হয় তো একটা মঠ বানিয়ে আমায় ডাকতে বলো। নইলে কার ঘরে ফিরে যাব? এ দেশে আমার more (অধিক) ঘর—হিন্দুস্থানে কি আছে? কে ধর্মের আদর করে? কে বিদ্যের আদর করে? ঘরে ফিরে এস!!! ঘর কোথা?
এবারকার মহোৎসব এমনি করবে যে, আর কখনও তেমন হয় নাই। আমি একটা ‘পরমহংস মহাশয়ের জীবনচরিত’ লিখে পাঠাব। সেটা ছাপিয়ে ও তর্জমা করে বিক্রী করবে। বিতরণ করলে লোকে পড়ে না, কিছু দাম লইবে। হুজুকের শেষ !!! … এই তো কলির সন্ধ্যে। আমি মুক্তি চাই না, ভক্তি চাই না; আমি লাখ নরকে যাব, ‘বসন্তবল্লোকহিতং চরন্তঃ’ (বসন্তের ন্যায় লোকের কল্যাণ আচরণ করে)—এই আমার ধর্ম। আমি কুঁড়ে, নিষ্ঠুর, নির্দয়, স্বার্থপর ব্যক্তিদের সহিত কোন সংস্রব রাখিতে চাই না। যাহার ভাগ্যে থাকে, সে এই মহাকার্যে সহায়তা করিতে পারে। … সাবধান, সাবধান! এ-সকল কি ছেলেখেলা, স্বপন-দেখা নাকি? মধো, সাবধান! সুরেশ দত্তর ‘রামকৃষ্ণচরিত’ পড়িলাম, মন্দ হয় নাই। শশী সাণ্ডেলের কোন উপকার যদি তোমাদের দ্বারা হয়, করিবে। বেচারা ভক্ত মানুষ, বড়ই কষ্ট পাচ্ছে। আমি তো দাদা এখানে বসে কোন উপায় দেখি না। কিমধিকমিতি।
দাদা, একবার গর্জে গর্জে মধুপানে লেগে যাও দিকি—মাষ্টার, জি. সি. ঘোষ, অতুল, রামদা, নৃত্যগোপাল, শাঁকচুন্নি! বলি, শাঁকচুন্নির কোন কথাই তো তোমরা লেখ না! সে গেল কোথা? মাকে ভক্তি করছে তেমনি কিনা? নৃত্যগোপাল-দাদার শরীর বেশ ভাল হয়েছে কি না, বাবুরাম যোগেন সেরেছে কিনা—ইত্যাদি আমি সকলের বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খ জানতে চাই। শরৎকে কি সাণ্ডেলকে একটি বিশেষ পত্রে সব খুলে লিখতে বলবে। কালীকৃষ্ণ, ভবনাথ, দাশু, সাতু, হরি চাটুয্যে সকলকে তোমরা ভালবাস কিনা—সব লিখবে। … তোরা এক একটা মানুষ হ দিকি রে বাবা! গঙ্গাধর খেতড়ি থেকে তো পালায় নাই?
বলি, আর খবরের কাগজ পাঠাবার আবশ্যক নাই। তার ঢের মেরে গেছে। তোদের কারও organising power (সংগঠন-শক্তি) নাই দেখিতেছি; বড়ই দুঃখের বিষয়। সকলকে আমার ভালবাসা দিবে, সকলের help (সাহায্য) আমি চাই; কারুর সঙ্গে বিবাদবিসংবাদ খবরদার যাতে না হয়। Neither money pays, nor name, nor fame, nor learning; it is character that can cleave through adamantine walls of difficulties,৪৬ —মনে রেখো। লোকের সঙ্গে যাওয়া-আসা, বিশেষ করিয়া মতামত pooh pooh (দুঃ ছাই) করিবে না, তাতে লোক বড়ই চটে। জায়গায় জায়গায় এক একটা সেণ্টার করিতে হইবে—এ তো বড় সহজ! যেমন তোমরা জায়গায় জায়গায় ফের, অমনি একটি সেণ্টার করবে সেখানে। এই রকম করে কার্য হবে। যেখানে পাঁচজন লোক তাঁকে মানে, সেখানেই এক ডেরা—এমনি করে চল এবং সর্বদা সকল জায়গার সঙ্গে communication (যোগাযোগ) রাখিতে হইবে। ইতি
চিরস্নেহাস্পদ
বিবেকানন্দ
১৫২*
ব্রুকলিন, নিউ ইয়র্ক ষ্টেশন
২৮ ডিসেম্বর, ১৮৯৪
প্রিয় মিসেস বুল,
আমি নিরাপদে নিউ ইয়র্কে পৌঁছেছি; ল্যাণ্ডস্বার্গ ডিপোয় আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে—আমি তখনই ব্রুকলিনের দিকে রওনা হলাম ও সময়মত সেখানে পৌঁছলাম।
সন্ধ্যাকালটা পরমানন্দে কেটে গেল—এথিক্যাল কালচার সোসাইটির (Ethical Culture Society) কতকগুলি ভদ্রলোক আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন।
আসছে রবিবার একটা বক্তৃতা হবে। ডাঃ জেন্স্ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ খুব সহৃদয় ও অমায়িক ব্যবহার করলেন, আর মিঃ হিগিন্সকে পূর্বেরই মত দেখলাম—খুব কাজের লোক। বলতে পারি না কেন, অন্যান্য শহরের চেয়ে এই নিউ ইয়র্ক শহরেই দেখছি—মেয়েদের চেয়ে পুরুষদের ধর্মালোচনায় আগ্রহ বেশী।
আমার ক্ষুরখানা ১৬১ নং বাড়ীতে ফেলে এসেছি, অনুগ্রহপূর্বক সেটা ল্যাণ্ডস্বার্গের নামে পাঠিয়ে দেবেন।
এই সঙ্গে মিঃ হিগিন্স আমার সম্বন্ধে যে পুস্তিকাটি ছাপিয়েছেন, তার এক কপি পাঠালাম—আশা করি, ভবিষ্যতে আরও পাঠাতে পারব।
মিস ফার্মারকে এবং তাঁদের পবিত্র পরিবারের সকলকে আমার ভালবাসা জানাবেন।
সদা বশংবদ
বিবেকানন্দ
১৫৩*
C/o G. W. Hale
৫৪১, ডিয়ারবর্ন এভিনিউ, চিকাগো
১৮৯৪
প্রিয় আলাসিঙ্গা,
এইমাত্র তোমার পত্র পেলাম। ভট্টাচার্যের মাতার দেহত্যাগ-সংবাদে বিশেষ দুঃখিত হলাম। তিনি একজন অসাধারণ মহিলা ছিলেন। প্রভু তাঁর কল্যাণ করুন।
আমি যে খবরের কাগজের অংশগুলি তোমায় পাঠিয়েছিলাম, সেগুলি প্রকাশ করতে বলে আমি ভুল করেছি। এ আমার একটা ভয়ানক অন্যায় হয়ে গেছে। মুহূর্তের জন্য দুর্বলতা আমার হৃদয়কে অধিকার করেছিল, এতে তাই প্রকাশ হচ্ছে।
এ দেশে দু-তিন বছর ধরে বক্তৃতা দিলে টাকা তোলা যেতে পারে। আমি কতকটা চেষ্টা করেছি, আর যদিও সাধারণে খুব আদরের সহিত আমার কথা নিচ্ছে, কিন্তু আমার প্রকৃতিতে এটা একেবারে খাপ খাচ্ছে না, বরং ওতে আমার মনটাকে বেজায় নামিয়ে দিচ্ছে। সুতরাং আমি এই গ্রীষ্মকালেই ইওরোপ হয়ে ভারতে ফিরে যাব—স্থির করেছি; এতে যা খরচ হবে, তার জন্য যথেষ্ট টাকা আছে। তাঁর ইচ্ছে পূর্ণ হোক।
ভারতের খবরের কাগজ ও তাদের সমালোচনা সম্বন্ধে যা লিখেছ, তা পড়লাম। তারা যে এ-রকম লিখবে, এ তাদের পক্ষে খুব স্বাভাবিক। প্রত্যেক দাসজাতির মূল পাপ হচ্ছে ঈর্ষা। আবার এই ঈর্ষাদ্বেষ ও সহযোগিতার অভাবই এই দাসত্বকে চিরস্থায়ী করে রাখে। ভারতের বাইরে না এলে আমার এ মন্তব্যের মর্ম বুঝবে না। পাশ্চাত্য জাতিদের কার্যসিদ্ধির রহস্য হচ্ছে—এই সহযোগিতা। এদের শক্তি অদ্ভুত, আর এর ভিত্তি হচ্ছে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস আর পরস্পরের কার্যের গুণগ্রাহিতা। আর জাতটা যত দুর্বল ও কাপুরুষ হবে, ততই তার ভেতর এই [কাপুরুষতা] পাপটা স্পষ্ট দেখা যাবে। যতই কষ্টকল্পিত হোক, মূলে কতকটা সত্য না থাকলে কোন অপবাদই উঠতে পারে না, আর এখানে আসবার পর মেকলে ও আর আর অনেকে বাঙালী জাতকে যে ভয়ানক গালাগাল দিয়েছেন, তার কারণ কিছু কিছু বুঝতে পারছি। এরা সর্বপেক্ষা কাপুরুষ আর সেই কারণেই এতদূর ঈর্ষাপরায়ণ ও পরনিন্দাপ্রবণ। হে ভ্রাতঃ, এই দাসভাবাপন্ন জাতের নিকট কিছু আশা করা উচিত নয়। ব্যাপারটা স্পষ্টভাবে দেখলে কোন আশার কারণ থাকে না বটে, তথাপি তোমাদের সকলের সামনে খুলেই বলছি—তোমরা কি এই মৃত জড়পিণ্ডটার ভেতর, যাদের ভেতর ভাল হবার আকাঙ্ক্ষাটা পর্যন্ত নষ্ট হয়ে গেছে, যাদের ভবিষ্যৎ উন্নতির জন্য একদম চেষ্টা নেই, যারা তাদের হিতৈষীদের ওপরই আক্রমণ করতে সদা প্রস্তুত, এরূপ মড়ার ভেতর প্রাণসঞ্চার করতে পার? তোমরা কি এমন চিকিৎসকের আসন গ্রহণ করতে পার, যিনি একটা ছেলের গলায় ঔষধ ঢেলে দেবার চেষ্টা করছেন, এদিকে ছেলেটা ক্রমাগত পা ছুঁড়ে লাথি মারছে এবং ঔষধ খাব না বলে চেঁচিয়ে অস্থির করে তুলছে?
