দাস
নরেন্দ্র
০৫. পত্রাবলী ৪১-৫০
৪১
গাজীপুর
১৫ মার্চ, ১৮৯০
অতুলবাবু,২১
আপনার মনের অবস্থা খারাপ জানিয়া বড়ই দুঃখিত হইলাম—যাহাতে আনন্দে থাকেন তাহাই করুন।
যাবজ্জননং তাবন্মরণং
তাবজ্জননীজঠরে শয়নং
ইতি সংসারে স্ফুটতরদোষঃ
কথমিহ মানব তব সন্তোষঃ।২২
দাস
নরেন্দ্র
পুঃ—আমি কল্য এস্থান হইতে চলিলাম—দেখি অদৃষ্ট কোথায় লইয়া যায়।
৪২
ওঁ নমো ভগবতে রামকৃষ্ণায়
গাজীপুর
মার্চ, ১৮৯০
প্রাণাধিকেষু,
এইমাত্র তোমার আর একখানি পত্র পাইলাম—হিজিবিজি বহু কষ্টে বুঝিলাম। পূর্বের পত্রে সমস্ত লিখিয়াছি। তুমি পত্রপাঠ চলিয়া আসিবে। তুমি যে নেপাল হইয়া তিব্বতের পথ বলিয়াছ, তাহা আমি জানি। যে প্রকার তিব্বতে সহজে কাহাকেও যাইতে দেয় না, ঐপ্রকার নেপালেও কাটামুণ্ড রাজধানী ও দুই-এক তীর্থ ছাড়া কাহাকেও কোথাও যাইতে দেয় না। কিন্তু আমার একজন বন্ধু এক্ষণে নেপালের রাজার ও রাজার স্কুলের শিক্ষক—তাঁহার কাছে শুনিয়াছি যে, বৎসর বৎসর যখন নেপাল হইতে চীন দেশে রাজকর যায়, সে সময় লাসা হইয়া যায়। একজন সাধু—যোগাড় করিয়া ঐ রকমে লাসা, চীন এবং মাঞ্চুরিয়ায় (উত্তর চীন)—তারাদেবীর পীঠ পর্যন্ত গিয়াছিল। উক্ত বন্ধু চেষ্টা করিলে আমরাও মান্য ও খাতিরের সহিত তিব্বত, লাসা, চীন সব দেখিতে পারিব। অতএব তুমি অবিলম্বে গাজীপুরে চলিয়া আইস। এথায় আমি বাবাজীর কাছে কিছুদিন থাকিয়া, উক্ত বন্ধুকে চিঠি পত্র লিখিয়া নেপাল হইয়া নিশ্চিত তিব্বতাদি যাইব। কিমধিকমিতি। দিলদারনগর ষ্টেশনে নামিয়া গাজীপুরে আসিতে হয়। দিলদারনগর মোগলসরাই ষ্টেশনের তিন-চার ষ্টেশনের পর। এথায় ভাড়া যোগাড় করিতে পারিলে পাঠাইতাম; অতএব তুমি যোগাড় করিয়া আইস। গগনবাবু—যাঁহার আশ্রয়ে আমি আছি—এত ভদ্র, উদার এবং হৃদয়বান্ ব্যক্তি যে কি লিখিব! তিনি কালীর জ্বর শুনিয়া হৃষীকেশে তৎক্ষণাৎ ভাড়া পাঠাইলেন এবং আমার জন্য আরও অনেক ব্যয় করিয়াছেন। এ অবস্থায় আবার তাঁহাকে কাশ্মীরের ভাড়ার জন্য ভারগ্রস্ত করা সন্ন্যাসীর ধর্ম নহে জানিয়া নিরস্ত হইলাম। তুমি যোগাড় করিয়া পত্রপাঠ চলিয়া আইস। অমরনাথ দেখিবার বাতিক এখন থাক। ইতি
নরেন্দ্র
৪৩
[প্রমদাবাবুকে লিখিত]
ঈশ্বরো জয়তি
গাজীপুর
৩১ মার্চ, ১৮৯০
পূজ্যপাদেষু,
আমি কয়েক দিবস এস্থানে ছিলাম না এবং অদ্যই পুনর্বার চলিয়া যাইব। গঙ্গাধর ভায়াকে এস্থানে আসিতে লিখিয়াছি। যদি আইসেন, তাহা হইলে তৎসহ আপনার সন্নিধানে যাইতেছি। কতকগুলি বিশেষ কারণবশতঃ এস্থানের কিয়দ্দুরে এক গ্রামে গুপ্তভাবে কিছুদিন থাকিব, সে স্থান হইতে পত্র লিখিবার কোন সুবিধা নাই। এইজন্যই আপনার পত্রের উত্তর দিতে পারি নাই। গঙ্গাধর-ভায়া বোধ করি আসিতেছেন, না হইলে আমার পত্রের উত্তর আসিত। অভেদানন্দ-ভায়া কাশীতে প্রিয় ডাক্তারের নিকট আছেন। আর একটি গুরুভাই আমার নিকটে ছিলেন, তিনি অভেদানন্দের নিকট গিয়াছেন। তাঁহার পৌঁছানো সংবাদ পাই নাই। তাঁহারও শরীর ভাল নহে, তজ্জন্য অত্যন্ত চিন্তিত আছি। তাঁহার সহিত আমি অত্যন্ত নিষ্ঠুর ব্যবহার করিয়াছি, অর্থাৎ আমার সঙ্গ ত্যাগ করিবার জন্য তাঁহাকে অত্যন্ত বিরক্ত করিয়াছি। কি করি, আমি বড়ই দুর্বল, বড়ই মায়াসমাচ্ছন্ন—আশীর্বাদ করুন, যেন কঠিন হইতে পারি। আমার মানসিক অবস্থা আপনাকে কি বলিব, মনের মধ্যে নরক দিবারাত্রি জ্বলিতেছে—কিছুই হইল না, এ জন্ম বুঝি বিফলে গোলমাল করিয়া গেল; কি করি, কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। বাবাজী মিষ্ট মিষ্ট বুলি বলেন, আর আটকাইয়া রাখেন। আপনাকে কি বলিব, আমি আপনার চরণে শত শত অপরাধ করিতেছি—অন্তর্যাতনায় ক্ষিপ্ত ব্যক্তির কৃত বলিয়া সে সকল মার্জনা করিবেন। অভেদানন্দের রক্তামাশয় হইয়াছে। কৃপা করিয়া যদি তাঁহার তত্ত্ব লন এবং যিনি এস্থান হইতে গিয়াছেন, তাঁহার সঙ্গে যদি মঠে ফিরিয়া যাইতে চান, পাঠাইয়া দিলে বিশেষ অনুগৃহীত হইব। আমার গুরু ভ্রাতারা আমাকে অতি নির্দয় ও স্বার্থপর বোধ করিতেছেন। কি করি, মনের মধ্যে কে দেখিবে? আমি দিবারাত্রি কি যাতনা ভুগিতেছি, কে জানিবে? আশীর্বাদ করুন, যেন অটল ধৈর্য ও অধ্যবসায় আমার হয়। আমার শতকোটি প্রণাম জানিবেন।
দাস
নরেন্দ্র
পুঃ—প্রিয়বাবু ডাক্তারের বাটী সোনারপুরাতে অভেদানন্দ আছেন। আমার কোমরের বেদনা সেই প্রকারই আছে।
দাস নরেন্দ্র
৪৪
[স্বামী অভেদানন্দকে লিখিত]
ওঁ নমো ভগবতে রামকৃষ্ণায়
গাজীপুর
২ এপ্রিল, ১৮৯০
ভাই কালী,
তোমার, প্রমদাবাবুর ও বাবুরামের হস্তাক্ষর পাইয়াছি। আমি এ স্থানে একরকম মন্দ নাই। তোমার আমাকে দেখিবার ইচ্ছা হইয়াছে, আমারও বড় ঐরূপ হয়, সেই ভয়েই যাইতে পারিতেছি না—তার উপর বাবাজী বারণ করেন। দুই-চারি দিনের বিদায় লইয়া যাইতে চেষ্টা করিব। কিন্তু ভয় এই তাহা হইলে একেবারে, হৃষীকেশী টানে পাহাড়ে টেনে তুলবে—আবার ছাড়ানো বড় কঠিন হইবে, বিশেষ আমার মত দুর্বলের পক্ষে। কোমরের বেদনাটাও কিছুতেই সারে না—cadaverous (জঘন্য)। তবে অভ্যাস পড়ে আসছে। প্রমদাবাবুকে আমার কোটি কোটি প্রণাম দিবে, তিনি আমার শরীর ও মনের বড় উপকারী বন্ধু ও তাঁহার নিকট আমি বিশেষ ঋণী। যাহা হয় হইবে। ইতি
শুভাকাঙ্ক্ষী
নরেন্দ্র
৪৫
[প্রমদাবাবুকে লিখিত]
গাজীপুর
২ এপ্রিল, ১৮৯০
