হিন্দু যেন কখনও তাহার ধর্ম ত্যাগ না করে। তবে ধর্মকে উহার নির্দিষ্ট সীমার ভিতর রাখিতে হইবে, আর সমাজকে উন্নতির স্বাধীনতা দিতে হইবে। ভারতের সকল সংস্কারই এই গুরুতর ভ্রমে পড়িয়াছেন যে, পৌরোহিত্যের সর্ববিধ অত্যাচার ও অবনতির জন্য তাঁহারা ধর্মকেই দায়ী করিয়াছেন; সুতরাং তাঁহারা হিন্দুর ধর্মরূপ এই অবিনশ্বর দুর্গকে ভাঙিতে উদ্যত হইলেন। ইহার ফল কি হইল?—নিষ্ফলতা! বুদ্ধ হইতে রামমোহন রায় পর্যন্ত সকলেই এই ভ্রম করিয়াছিলেন যে, জাতিভেদ একটি ধর্মবিধান; সুতরাং তাঁহারা ধর্ম ও জাতি উভয়কেই একসঙ্গে ভাঙিতে চেষ্টা করিয়া বিফল হইয়াছিলেন। এ বিষয়ে পুরোহিতগণ যতই আবোল-তাবোল বলুন না কেন, জাতি একটি অচলায়তনে পরিণত সামাজিক বিধান ছাড়া কিছুই নহে। উহা নিজের কার্য শেষ করিয়া এক্ষণে ভারতগগনকে দুর্গন্ধে আচ্ছন্ন করিয়াছে। ইহা দূর হইতে পারে, কেবল যদি লোকের হারানো সামাজিক স্বাতন্ত্র্যবুদ্ধি ফিরাইয়া আনা যায়। এখানে যে-কেহ জন্মিয়াছে, সেই জানে—সে একজন মানুষ। ভারতে যে-কেহ জন্মায়, সেই জানে—সে সমাজের একজন ক্রীতদাস মাত্র। স্বাধীনতাই উন্নতির একমাত্র সহায়ক। স্বাধীনতা হরণ করিয়া লও, তাহার ফল অবনতি। আধুনিক প্রতিযোগিতা প্রবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কত দ্রুতবেগে জাতিভেদ উঠিয়া যাইতেছে। এখন উহাকে নাশ করিতে হইলে কোন ধর্মের আবশ্যকতা নাই। আর্যাবর্তে ব্রাহ্মণ দোকানদার, জুতাব্যবসায়ী ও শুঁড়ী খুব দেখিতে পাওয়া যায়। ইহার কারণ কেবল প্রতিযোগিতা। বর্তমান গভর্ণমেণ্টের অধীনে কাহারও আর জীবিকার জন্য যে-কোন বৃত্তি আশ্রয় করিতে কোনরূপ বাধা নাই। ইহার ফল প্রবল প্রতিযোগিতা! এইরূপে সহস্র সহস্র ব্যক্তি—জড়ের মত নীচে পড়িয়া না থাকিয়া, যে উচ্চ সম্ভাবনা লইয়া তাহারা জন্মগ্রহণ করিয়াছে, তাহা পাইবার চেষ্টা করিয়া সেই স্তরে উপনীত হইতেছে।
আমি এই দেশে অন্ততঃ শীতকালটা থাকিব, তারপর ইওরোপ যাইব। আমার যাহা কিছু আবশ্যক, ভগবানই সব যোগাইয়া দিবেন, আশা করি। সুতরাং এখন সে বিষয়ে তোমাদের কোন দুশ্চিন্তার কারণ নাই। আমার প্রতি ভালবাসার জন্য তোমাদের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ আমার অসাধ্য।
আমি দিন দিন বুঝিতেছি, প্রভু আমার সঙ্গে সঙ্গে রহিয়াছেন, আর আমি তাঁহার আদেশ অনুসরণ করিবার চেষ্টা করিতেছি। তাঁহার ইচ্ছাই পূর্ণ হইবে। এই পত্রখানি খেতড়ির মহারাজাকে পাঠাইয়া দিও, আর ইহা প্রকাশ করিও না। আমরা জগতের জন্য অনেক মহৎ কার্য করিব, আর উহা নিঃস্বার্থভাবে করিব, নামযশের জন্য নহে।
“ ‘কেন’ প্রশ্নে আমাদের নাহি অধিকার। কাজ কর, করে মর—এই হয় সার॥’ সাহস অবলম্বন কর, আমাদ্বারা ও তোমাদের দ্বারা বড় বড় কাজ হইবে, এই বিশ্বাস রাখো। ভগবান্ বড় বড় কাজ করিবার জন্য আমাদিগকে নির্দিষ্ট করিয়াছেন, আর আমরা তাহা করিব। নিজদিগকে প্রস্তুত করিয়া রাখো; অর্থাৎ পবিত্র, বিশুদ্ধস্বভাব এবং নিঃস্বার্থপ্রেমসম্পন্ন হও। দরিদ্র, দুঃখী, পদদলিতদিগকে ভালবাস; ভগবান্ তোমাদিগকে আশীর্বাদ করিবেন। সময়ে সময়ে রামনাদের রাজা ও আর আর সকল বন্ধুর সহিত সাক্ষাৎ করিবে এবং যাহাতে তাঁহারা ভারতের সাধারণ লোকের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হন, তাহার চেষ্টা করিবে। তাঁহাদিগকে বল, তাঁহারা তাহাদের উন্নতির প্রতিবন্ধকস্বরূপ হইয়া আছেন, আর যদি তাঁহারা উহাদের উন্নতির চেষ্টা না করেন, তবে তাঁহারা মনুষ্য-নামের যোগ্য নহেন। ভয় ত্যাগ কর, প্রভু তোমাদের সঙ্গেই রহিয়াছেন; তিনি নিশ্চয়ই ভারতের লক্ষ লক্ষ অনশনক্লিষ্ট ও অজ্ঞানান্ধ জনগণকে উন্নত করিবেন। এখানকার একজন রেলের কুলি তোমাদের অনেক যুবক এবং অধিকাংশ রাজা-রাজড়া হইতে অধিক শিক্ষিত। আমরাও কেন না উহাদের মত শিক্ষিত হইব? অবশ্যই হইব। অধিকাংশ ভারতীয় নারী যতদূর শিক্ষার উন্নতি কল্পনা করিতে পারে, প্রত্যেকটি মার্কিন নারী তদপেক্ষা অনেক অধিক শিক্ষিতা। আমাদের মহিলাগণকেও কেন না ঐরূপ শিক্ষিতা করিব? অবশ্যই করিতে হইবে।
মনে করিও না, তোমরা দরিদ্র। অর্থই বল নহে; সাধুতাই—পবিত্রতাই বল। আসিয়া দেখ, সমগ্র জগতে ইহাই প্রকৃত বল কি না। ইতি
আশীর্বাদক
বিবেকানন্দ
পুনঃ—ভাল কথা, তোমার কাকার প্রবন্ধের মত অদ্ভুত ব্যাপার আমি আর কখনও দেখি নাই। এ যেন ব্যবসাদারের জিনিষের ফর্দ; সুতরাং উহা ধর্ম মহাসভায় পাঠের যোগ্য বিবেচিত হয় নাই। তাই নরসিংহাচার্য একটা পাশের হলে উহা হইতে কতক কতক অংশ পাঠ করিল; কিন্তু কেহই উহার একটা কথাও বুঝিল না। তাঁহাকে এ বিষয়ে কিছু বলিও না। অনেকটা ভাব খুব অল্প কথার ভিতর প্রকাশ করা একটা বিশেষ শিল্পকলা বলিতে হইবে। এমনি কি, মণিলাল দ্বিবেদীর প্রবন্ধও অনেক কাটছাঁট করিতে হইয়াছিল। প্রায় এক হাজারের অধিক প্রবন্ধ পড়া হইয়াছিল, সুতরাং তাহাদের ওরূপ আবোল-তাবোল বক্তৃতা শুনিবার সময়ই ছিল না। অন্যান্য বক্তাদিগকে সাধারণতঃ যে আধ ঘণ্টা সময় দেওয়া হইয়াছিল, তাহা অপেক্ষা আমাকে অনেকটা অধিক সময় দেওয়া হইয়াছিল, কারণ শ্রোতৃবৃন্দকে ধরিয়া রাখিবার জন্য সর্বাপেক্ষা লোকপ্রিয় বক্তাদিগকে সর্বশেষে রাখা হইত। আর আমার প্রতি ইহাদের কি সহানুভূতি! এবং ইহাদের ধৈর্যই বা কত! ভগবান্ তাহাদিগকে আশীর্বাদ করুন। প্রাতে বেলা দশটা হইতে রাত্রি দশটা পর্যন্ত তাহারা বসিয়া থাকিত, মধ্যে কেবল খাইবার জন্য আধ ঘণ্টা ছুটি—ইতোমধ্যে প্রবন্ধের পর প্রবন্ধ পাঠ হইত, তাহাদের মধ্যে অধিকাংশই বাজে ও অসার, কিন্তু তাহারা তাহাদের প্রিয় বক্তাদের বক্তৃতা শুনিবার অপেক্ষায় এতক্ষণ বসিয়াই থাকিত। সিংহলের ধর্মপালও তাহাদের অন্যতম প্রিয় বক্তা ছিলেন। তিনি বড়ই অমায়িক, আর এই মহাসভার অধিবেশনের সময় আমাদের খুব ঘনিষ্ঠতা হইয়াছিল।
