যতদিন না যুক্তিবিচারের অতীত কোন তত্ত্বলাভ করছ, ততদিন তুমি তোমার যুক্তিবিচার ধরে থাকো, আর ঐ অবস্থায় পৌঁছলে তুমি বুঝবে যে, সেটা যুক্তিবিচারের চেয়ে শ্রেষ্ঠ জিনিষ, কারণ ঐ অবস্থা তোমার যুক্তির বিরোধী হবে না। যুক্তিবিচার বা জ্ঞানের অতীত এই ভূমি হচ্ছে সমাধি, কিন্তু স্নায়বীয় রোগের তাড়নায় মূর্ছাবিশেষকে সমাধি বলে ভুল কর না। অনেকে মিছামিছি সমাধি হয়েছে বলে দাবী করে থাকে, স্বাভাবিক বা সহজ জ্ঞানকে সমাধি-অবস্থা বলে ভ্রম করে থাকে—এ বড় ভয়ানক কথা। বাইরের কোন লক্ষণ দেখে নির্ণয় করবার উপায় নেই—যথার্থ সমাধি হয়েছে কিনা, নিজে নিজেই তা টের পাওয়া যায়। তবে যুক্তিবিচারের সাহায্য নিলে ভুলভ্রান্তি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, সুতরাং একে ব্যতিরেকী পরীক্ষা বলা যেতে পারে; ধর্মলাভ মানে হচ্ছে—যুক্তিতর্কের বাইরে যাওয়া, কিন্তু ঐ ধর্মলাভ করবার পথ একমাত্র যুক্তিবিচারেরই ভিতর দিয়ে। সহজাত জ্ঞান যেন বরফ, যুক্তিবিচার যেন জল, আর অলৌকিক জ্ঞান বা সমাধি যেন বাষ্প—সব চেয়ে সূক্ষ্ম অবস্থা। একটার পর আর একটা আসে। সব জায়গাতেই এই নিত্য পৌর্বাপর্য বা ক্রম রয়েছে—যেমন অজ্ঞান, সংজ্ঞা বা আপেক্ষিক জ্ঞান ও বোধি; জড় পদার্থ, দেহ মন। আর আমরা এই শৃঙ্খলের যে পাবটা (link) প্রথম ধরি, সেইটা থেকেই শিকলটা আরম্ভ হয়েছে—আমাদের কাছে এই রকম বোধ হয়। অর্থাৎ কেউ বলে—দেহ থেকে মনের উৎপত্তি, কেউ বা বলে থাকে—মন থেকে দেহ হয়েছে। উভয় পক্ষেই যুক্তির সমান মূল্য, আর উভয় মতই সত্য। আমাদের ঐ দুটোরই পারে যেতে হবে—এমন জায়গায় যেতে হবে, যেখানে দেহ বা মন কোনটি-ই নেই। এই যে ক্রম—এও মায়া।
ধর্ম যুক্তিবিচারের পারে, ধর্ম অতি-প্রাকৃত। বিশ্বাস-অর্থে কিছু মেনে নেওয়া নয়, বিশ্বাসের অর্থ—সেই চরম পদার্থকে ধারণা করা, বিশ্বাস হৃদয়-কন্দর উদ্ভাসিত করে দেয়। প্রথমে সেই আত্মতত্ত্ব সম্বন্ধে শোন, তারপর বিচার কর—বিচার দ্বারা উক্ত আত্মতত্ত্ব সম্বন্ধে কতদূর জানতে পারা যায় তা দেখ; এর উপর দিয়ে বিচারের বন্যা বয়ে যাক—তারপর বাকী যা থাকে, সেইটুকু গ্রহণ কর। যদি কিছু বাকী না থাকে, তবে ভগবানকে ধন্যবাদ দাও যে, তুমি একটা কুসংস্কারের হাত থেকে বেঁচেছ। আর যখন তুমি স্থির সিদ্ধান্ত করবে যে, কিছুই আত্মাকে উড়িয়ে দিতে পারে না, যখন আত্মা সর্বপ্রকার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, তখন তাকে দৃঢ় ভাবে ধরে থাক এবং সকলকে ঐ আত্মতত্ত্ব শিক্ষা দাও; সত্য কখনও পক্ষপাতী হতে পারে না, এতে সকলেরই কল্যাণ হবে। সবশেষে স্থিরভাবে ও শান্তচিত্তে তাঁর উপর নিদিধ্যাসন কর বা তাঁর ধ্যান কর, তোমার মনকে তাঁর উপর একাগ্র কর, ঐ আত্মার সঙ্গে নিজেকে একভাবাপন্ন করে ফেল। তখন আর বাক্যের কোন প্রয়োজন থাকবে না, তোমার ঐ মৌনভাবই অপরের ভিতর সত্য তত্ত্ব সঞ্চার করবে। বৃথা কথা বলে শক্তিক্ষয় কর না, চুপচাপ ধ্যান কর। আর বহির্জগতের গণ্ডগোল যেন তোমাকে বিক্ষুব্ধ না করে। যখন তোমার মন সর্বোচ্চ অবস্থায় উপনীত হয়, তখন তুমি তা জানতে পার না। চুপচাপ থেকে শক্তিসঞ্চয় কর, আর আধ্যাত্মিকতার বিদ্যুদাধার (dynamo) হয়ে যাও। ভিখারী আবার কি দিতে পারে? রাজাই কেবল দিতে পারে—সেও আবার শুধু তখনই দিতে পারে, যখন সে নিজে কিছু চায় না।
* * *
তোমার যা টাকাকড়ি, তা তোমার নিজের মনে কর না, নিজেকে ভগবানের ভাণ্ডারী বলে মনে কর। ধনের প্রতি আসক্ত হয়ো না। নামযশ টাকাকড়ি সব যাক্, এগুলি সব ভয়ানক বন্ধন। মুক্তির অপূর্ব পরিবেশ অনুভব কর। তুমি তো মুক্ত, মুক্ত, মুক্ত; অবিরত বল, আমি ধন্য, আমি আনন্দময়, আমি মুক্তস্বরূপ, আমি অনন্তস্বরূপ, আমার আত্মাতে আদি নেই, অন্ত নেই; সবই আমার আত্মস্বরূপ।
রবিবার, ২১ জুলাই
(পাতঞ্জল যোগসূত্র)
চিত্ত বা মন যাতে বৃত্তিরূপে বিভক্ত না হয়ে পড়ে, যোগশাস্ত্র তাই শিক্ষা দিয়ে থাকে—‘যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ।’ মনটা বিষয়-সমূহের ছাপ ও অনুভূতির, অর্থাৎ ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার মিশ্রস্বরূপ, সুতরাং তা নিত্য হতে পারে না। মনের একটা সূক্ষ্ম শরীর আছে, সেই শরীর দ্বারা মন স্থূল দেহের উপর কার্য করে থাকে। বেদান্ত বলেন, মনের পশ্চাতে যথার্থ আত্মা আছেন। বেদান্ত অপর দুটিকে—অর্থাৎ দেহ ও মনকে স্বীকার করে থাকেন; আর একটি তৃতীয় পদার্থ স্বীকার করেন—যা অনন্ত, চরমতত্ত্ব-স্বরূপ, বিশ্লেষণের শেষ ফলস্বরূপ, এক অখণ্ড বস্তু—যাকে আর ভাগ করা যেতে পারে না। জন্ম হচ্ছে পুনর্যোজন, মৃত্যু হচ্ছে বিয়োজন, সব কিছু বিশ্লেষণ করতে করতে শেষে আত্মাকে পাওয়া যায়। আত্মাকে আর ভাগ করতে পারা যায় না, সুতরাং আত্মাতে পৌঁছলে নিত্য সনাতন তত্ত্বে পৌঁছান গেল।
প্রত্যেক তরঙ্গের পশ্চাতে সমগ্র সমুদ্রটা রয়েছে—যত কিছু অভিব্যক্তি, সবই তরঙ্গ, তবে কতকগুলি খুব বড় আর কতকগুলি ছোট, এইমাত্র। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঐসব তরঙ্গ স্বরূপতঃ সমুদ্র—সমগ্র সমুদ্র; কিন্তু তরঙ্গ-হিসাবে প্রত্যেকটি অংশ মাত্র। তরঙ্গসমূহ যখন শান্ত হয়ে যায়, তখন সব এক। পতঞ্জলি বলেন,—‘দৃশ্যবিহীন দ্রষ্টা’। যখন মন ক্রিয়াশীল থাকে, তখন আত্মা তার সঙ্গে মিশিয়া থাকেন। অনুভূত পুরাতন বিষয়গুলির দ্রুত পুনরাবৃত্তিকে ‘স্মৃতি’ বলে।
